আটলান্টার আকাশে তখন বিদায়ের মেঘের আনাগোনা। লন্ডনের আকাশে ঝড়ের আভাস! মাত্র সাত মিনিটেই পিছিয়ে পড়া ইংল্যান্ড শিবিরে শঙ্কার কালো মেঘ। হারলেই আরেকটি ট্র্যাজেডি, আরেকটি বেদনার গল্প এবং চার বছরের দীর্ঘ আক্ষেপে ডুবে যাওয়া। স্কোরবোর্ডে পিছিয়ে ইংল্যান্ড, গ্যালারিতে উদ্বেগের ছায়া, প্রতিপক্ষের চোখে জয়ের উজ্জ্বল স্বপ্ন। ঠিক তখনই এক অভিজ্ঞ সেনাপতির মতো সামনে এসে দাঁড়ালেন হ্যারি কেইন। এক গোল ফিরিয়ে আনল বিশ্বাস, আরেক গোল নিশ্চিত করল জয়। ইংল্যান্ডের ভাগ্যও ঘুরে গেল তার পায়ের স্পর্শে। শেষ ১৫ মিনিট এবং দুটি গোলের গল্প খোদাই হয়ে গেল ইতিহাসের পাতায়। বিশ্বকাপের এই আসরে যতবার ইংল্যান্ডের হৃৎস্পন্দন বেড়েছে, ততবারই যেন শান্ত হাতে হাল ধরেছেন কেইন। তিনি কেবল গোলই করেননি, বিপদের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তে আশার মশাল হাতে অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে দিয়েছেন ‘থ্রি লায়নস’ শিবিরে।
বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি শিল্পের মতো ফুটবল খেলছেন, কিলিয়ান এমবাপ্পে গতির ঝড়ে উড়িয়ে দিচ্ছেন প্রতিপক্ষকে, আর্লিং হালান্ড শক্তির প্রদর্শনী করছেন অবলীলায়। কিন্তু এই তারকাখচিত মঞ্চে আলোচনার আড়ালে থেকেও নিজের কাজ নিখুঁতভাবে করে যাচ্ছেন হ্যারি কেইন। ইংল্যান্ডের পথচলার দিকে তাকালে দেখা যায়, থ্রি লায়ন্সের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে আছেন ‘দ্য ক্যাপ্টেন’। গোলের হিসাব তাকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে রেখেছে বিশ্বের সেরা ফিনিশারদের কাতারে। ৫ গোল করে হালান্ডের সঙ্গে আছেন একই কাতারে। একটি করে বেশি গোল মেসি ও এমবাপ্পের। তবে তার সবচেয়ে বড় অর্জন সংখ্যায় নয়, সময়জ্ঞানেই। কারণ, তার গোলগুলো আসে তখনই, যখন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়।
কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচটি তারই প্রতিচ্ছবি। প্রথম গোলটি ছিল আশার আলো, দ্বিতীয়টি মুক্তির নিশ্বাস। দুই গোলে শুধু ম্যাচ জেতেননি, সতীর্থদের কাঁধ থেকেও নামিয়ে দিয়েছেন চাপের পাহাড়। একজন অধিনায়ক কীভাবে নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে পুরো দলকে জাগিয়ে তুলতে পারেন, কেইন যেন তার জীবন্ত উদাহরণ। গ্রুপ পর্ব থেকেই রয়েছেন দুর্দান্ত ছন্দে। প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছেন, গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, আর সুযোগ পেলেই নির্দয় ফিনিশিংয়ে বল পাঠিয়েছেন জালে। বক্সের ভেতরে তার অবস্থানজ্ঞান যেন দাবার গ্র্যান্ডমাস্টারের পরবর্তী চাল অনুমান করার মতো সূক্ষ্ম। একটি হাফ চান্সও তার কাছে ফুল চান্স হয়ে ওঠে। কেইনের গল্প কেবল গোলের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। আধুনিক ফুটবলে একজন স্ট্রাইকারের দায়িত্ব এখন অনেক বিস্তৃত। কখনো মাঝমাঠে নেমে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা, কখনো উইঙ্গারদের জন্য জায়গা তৈরি করা, আবার কখনো নিজেই আক্রমণের সূচনা করা—সব ভূমিকাতেই সমান সাবলীল তিনি। ইংল্যান্ডের প্রতিটি আক্রমণের সূক্ষ্ম সুতা যেন এসে মিশেছে তার পায়ের সঙ্গে।
পানামার বিপক্ষে গোল করে কেইন ভেঙেছেন গ্যারি লিনেকারের দীর্ঘদিনের রেকর্ড। এখন তিনি ইংল্যান্ডের ইতিহাসে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা। আর কঙ্গোর বিপক্ষে জোড়া গোল করে বড় টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে নিজের গোলসংখ্যা আরো বাড়িয়েছেন। ইউরো ২০২০-এর পর থেকে বিশ্বকাপ ও ইউরোর নকআউট মিলিয়ে ১১ ম্যাচে তার ১০ গোল। এই সময়ে কোনো ইউরোপীয় ফুটবলারের নেই এমন সাফল্য। সংখ্যার বাইরেও কেইনের আরেকটি পরিচয় আছে। তিনি আধুনিক ফুটবলের পূর্ণাঙ্গ স্ট্রাইকার। সময়ের সেরা স্ট্রাইকার তকমা পেলেও মাঠে উড়ে বেড়ান মৌমাছির মতো। কখনো মাঝমাঠে নেমে খেলা গড়েন, কখনো উইঙ্গারদের জন্য জায়গা তৈরি করেন, আবার সুযোগ পেলে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে প্রতিপক্ষকে ভেঙেচুরে দেন। ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ যেন তার চিন্তাশক্তির সম্প্রসারণ।
ক্লাব ফুটবলে তিনি প্রায় সবকিছুই অর্জন করেছেন। গোলের পর গোল করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে একটি ট্রফি এখনো অধরা। ইউরোর ফাইনালের হতাশা, আগের বিশ্বকাপের অপূর্ণতা–সবকিছু যেন তার ভেতরে জমা করেছে আরো গভীর ক্ষুধা, আরো নির্মম এক জয়ের তৃষ্ণা। ১৯৬৬ সালের পর আর বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁতে পারেনি ইংল্যান্ড। প্রায় ছয় দশকের সেই দীর্ঘ অপেক্ষা যেন আজও ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে এক অপূর্ণ কবিতার মতো ঝুলে আছে। সেই অসমাপ্ত কবিতার শেষ লাইনটি লিখে দেওয়ার দায়িত্বভার আজ বহন করছেন এক নীরব অধিনায়ক। তিনি প্রচারের আলো খোঁজেন না, ক্যামেরার লেন্সও তাকে অতটা খুঁজে নেয় না। তাকে পাওয়া যায় দলের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে, যখন আশার আলো নিভু নিভু হয়ে জ্বলতে থাকে বিদায়ের গল্পে। সেই গল্প নতুন করে লেখাই যেন কেইনের কাজ।
কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ শেষে কোচ টমাস টুখেলের চোখেও ধরা পড়েছে সেই বিরল গুণ। নিজের অধিনায়ককে তিনি শুধু গোলদাতা হিসেবে দেখেন না, দেখেন দলের চালিকাশক্তি হিসেবে। টুখেলের ভাষায়, ‘হ্যারি আমাদের অধিনায়ক, আমাদের নেতা। অবিশ্বাস্য ফিনিশিং দিয়ে সে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে, আজও সেটাই করেছে। দ্বিতীয় গোলটি ছিল অসাধারণ।’ বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকারদের প্রসঙ্গে তিনি মেসি, এমবাপ্পে, হালান্ড ও কেইনকে এক কাতারেই রাখলেন, ‘ওরা সবাই হাঙরের মতো। সুযোগ পেলেই গোল করতে চলে আসে।’
শুধু টুখেলই নন, সতীর্থরাও জানেন, সংকটের মুহূর্তে কেইনের ওপর ভরসা করা যায়। জুড বেলিংহাম আগেই তাকে ‘ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ফুটবলার’ বলে অভিহিত করেছেন। আর ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে জয়সূচক গোলের সময় অ্যান্থনি গর্ডন বলেছিলেন, ‘শট নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝেছিলাম, বলটা জালেই যাবে।’ সতীর্থদের এই বিশ্বাসই কেইনকে করেছে আস্থাভাজন। এই বিশ্বাসই একজন অধিনায়কের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, প্রতিটি শিরোপাজয়ী দলের একজন করে মুখ থাকে; যে মুখটি সংকটকে আলিঙ্গন করে এনে দেয় হাসিমুখ। ইংল্যান্ডের জন্য সেই মুখটি কি তবে কেইন? আপাতত উত্তরটি লেখা হচ্ছে উত্তর আমেরিকার সবুজ ঘাসে। আর প্রতিটি গোলের সঙ্গে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি সত্য—ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্বপ্নের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ; হ্যারি কেইন।