বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে ব্রাজিল। ইউরোপিয়ান দলগুলোর আধিপত্য ভেঙে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যেই এবার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে। ব্রাজিলের ২৪ বছরের অপেক্ষা ঘোচানোর মিশনে এখন সবচেয়ে বড় ভরসা এই অভিজ্ঞ কোচ।
সবশেষ ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল সেলেসাওরা। তার আগে ১৯৭০ সালে পেলের হাতে জুলে রিমে ট্রফি ওঠার পরও তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল ঠিক ২৪ বছর, ১৯৯৪ বিশ্বকাপ পর্যন্ত। এবারও সেই একই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটানোর আশায় ব্রাজিল।
৬৬ বছর বয়সী আনচেলত্তির জন্যও বিশ্বকাপ এখন এক অপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। সম্প্রতি গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বিশ্বকাপ জয়ের নেশায় আমি আচ্ছন্ন নই। তবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দলকে কোচিং করানোর মুহূর্তটা আমি উপভোগ করছি।”
সাইডলাইনে শান্ত স্বভাব ও কৌশলগত বাস্তববাদিতার জন্য পরিচিত আনচেলত্তিকে বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে সফল কোচদের একজন ধরা হয়। তিনি পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন—দুবার এসি মিলানের হয়ে এবং তিনবার রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে। এছাড়া ইতালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনে লিগ শিরোপাও জিতেছেন।
গত বছর রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর ব্রাজিলের দায়িত্ব নেন তিনি। ২০০২ সালের পর পাঁচটি বিশ্বকাপে চারবার কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। একমাত্র ২০১৪ সালে সেমিফাইনালে উঠলেও স্বাগতিক হয়ে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক লজ্জায় ডুবে যায় দলটি।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায়ের পর দায়িত্ব ছাড়েন তিতে। এরপর ফার্নান্দো দিনিজ মাত্র ছয় ম্যাচ দায়িত্বে ছিলেন। পরে ডরিভাল জুনিয়রও কোপা আমেরিকায় ব্যর্থতার পর ছাঁটাই হন।
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ব্রাজিলকে শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছে দিলেও আনচেলত্তির দল ১০ দলের দক্ষিণ আমেরিকান গ্রুপে পঞ্চম হয়ে শেষ করে, আর্জেন্টিনার চেয়ে ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে।
নতুন কোচের অধীনে প্রীতি ম্যাচে তিন জয়, এক ড্র ও দুই হার পেয়েছে ব্রাজিল। জাপান ও ফ্রান্সের কাছে হারলেও আনচেলত্তি বিভিন্ন ফরমেশন পরীক্ষা করে দেখছেন।
তবে পুরো দল পাল্টে দেননি তিনি। ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে যারা খেলেছিলেন, তাদের মধ্যে আটজন এখনও দলে আছেন। যদিও চোটের কারণে নেই এদের মিলিতাও, রদ্রিগো ও এস্তেভাও। চেলসির জোয়াও পেদ্রোকেও রাখা হয়নি।
২৬ সদস্যের স্কোয়াডে ১০ জনের বয়সই ত্রিশের ওপরে, দলের গড় বয়স প্রায় ২৯। সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত অবশ্য নেইমারকে দলে রাখা। ৩৪ বছর বয়সী সাবেক বার্সেলোনা ও পিএসজি তারকা ২০২৩ সালের পর জাতীয় দলের হয়ে খেলেননি চোটের কারণে। বর্তমানে সান্তোসে খেলা এই ফরোয়ার্ডকে ঘিরে তাই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে আক্রমণের নেতৃত্বে থাকবেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এছাড়া ম্যাথেউস কুনিয়া ও রাফিনিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। মাঝমাঠে আছেন কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারায়েস। ডিফেন্সে আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস ও পিএসজির মারকিনিয়োস চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল খেলে সরাসরি যোগ দেবেন দলে।
খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৮২ বিশ্বকাপ জেতা ইতালি দলে চোটের কারণে থাকতে পারেননি আনচেলত্তি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে স্কোয়াডে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি। ১৯৯০ বিশ্বকাপে খেলেছিলেন, যেখানে ইতালি সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হারে।
আর ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের কাছে ফাইনালে হারার সময় তিনি ছিলেন ইতালির সহকারী কোচ।
আনচেলত্তির মতে, “ব্রাজিলে জাতীয় দলের গুরুত্ব অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে আলাদা। ইউরোপিয়ানদের মধ্যে জাতীয় দলের জার্সির প্রতি এতটা ভালোবাসা দেখা যায় না।”
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের গ্রুপে রয়েছে হাইতি, স্কটল্যান্ড ও মরক্কো। ১৩ জুন নিউ জার্সিতে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে তাদের অভিযান।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে নকআউট পর্বে তুলনামূলক সহজ পথ পেতে পারে ব্রাজিল। তবে ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউটে কোনো ইউরোপিয়ান দলকে হারাতে পারেনি তারা—এটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গা।
তবু ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) ইতোমধ্যেই আনচেলত্তির ওপর আস্থা রেখে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত নতুন চুক্তি করেছে।
সিবিএফ সভাপতি সামির জাউদ বলেন, “আমাদের হাতে বিশ্বের সবচেয়ে সফল কোচ আছেন। তাকে কাজে লাগিয়ে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের জন্য ইতিবাচক উত্তরাধিকার রেখে যেতে চাই।”