২০২২ সালে যখন জ্যানেট কাপিতো মালাউইয়ের লোলো গ্রাম ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন, তখন তার আশা ছিল কিছু টাকা জমিয়ে নিজের দেশে জমি কিনবেন এবং বাড়ি তৈরি করবেন। কিন্তু ২৭ বছর বয়সি তিন সন্তানের এই জননীকে তার আট মাসের সন্তান নিয়ে খালি হাতে দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশি-বিরোধী সহিংসতার জেরে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে এসেছেন। আগামী ৩০ জুনের সময়সীমার আগে মালাউই নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যবহৃত বাসের একটিতে আসার সময় তার সাথে থাকা সামান্য জিনিসপত্রও চুরি হয়ে গেছে।
জ্যানেট কাপিতো আল জাজিরাকে বলেন, ‘বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর আমি ঘরের ভেতরেই থাকতাম এবং কোনো কাজ করতে পারছিলাম না।’
যে বাড়ির ভিত্তিপ্রস্তর তিনি স্থাপন করেছিলেন, তার পাশে দাঁড়িয়ে কাপিতো জানান, তিনি একজন নাইজেরিয়ানের মালিকানাধীন রেস্তোরাঁয় প্রতি মাসে ২ হাজার রান্ড আয় করতেন। হামলার সময় তিনি একটি খোলা মাঠে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সেখানকার ধুলাবালির কারণে তার কণ্ঠস্বর প্রায় বসে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিচয় হওয়া তার মালাউই স্বামীও এখন দেশের পথে রয়েছেন। কোনো টাকা পয়সা না থাকায় কাপিতোকে কামুজু স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর পর ৭০ হাজার মালাউই কোয়াচা দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে রিটানি বা ফেরত আসাদের নিজ নিজ জেলায় পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
রিক্তহস্তে পলায়ন
দক্ষিণ আফ্রিকার অনানুষ্ঠানিক খাতে বছরের পর বছর ধরে কাজ করা হাজার হাজার নাগরিককে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সহজতর করছে মালাউই সরকার। আটকে পড়া মালাউইবাসীদের বাসে করে দেশে ফিরতে সাহায্য করার জন্য শুভাকাঙ্ক্ষীরাও অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৯৩৬ জন মালাউই নাগরিক দেশে ফিরেছেন।
মালাউইয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বিভাগ এক বিবৃতিতে অনুমান করেছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ১০ হাজার মালাউই নাগরিক বিপদের মধ্যে রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে একটি বিস্তৃত প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা সক্রিয় করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১৫ হাজার ১৬২ জন মালাউই নাগরিককে নির্বাসন ও প্রত্যাবাসনের জন্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
ফিরে আসা অনেকেরই বক্তব্য, তারা দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার জন্য চড়া সুদে ঋণ নিয়েছিলেন এবং কোভিড-১৯ লকডাউনের কারণে জীবিকা ব্যাহত হওয়ায় এখনও সেই ঋণ শোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলা তীব্র হওয়ার পর তারা বাড়িঘর ছেড়ে ডারবানের একটি খোলা মাঠে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সবকিছু হারিয়েছেন।
প্রত্যাবর্তনের সংকট
থাইওলো জেলার লোমোলার বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সি থোকোজানি মফোলার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করাটা ছিল বেঁচে থাকার লড়াই। লুচেঞ্জায় মায়ের বাড়ির সামনে প্রতিবেশী ও বন্ধুদের আলিঙ্গনের পর মফোলা আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম যদি আমাকে মরতেই হয়, তবে আমি আমার নিজের দেশেই মরব।’
মফোলা ২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান এবং একটি ছোট কারখানায় ভাজা চিনাবাদাম প্যাকেজিংয়ের কাজ পান। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় বেঁচে থাকা খুব কঠিন, তবে আমি খাবার কিনতে পারতাম, ঘর ভাড়া দিতে পারতাম এবং সন্তানদের সহায়তার জন্য মায়ের কাছে টাকা পাঠাতে পারতাম। আমার শেষ মজুরির টাকা দিয়ে আমি দেশে ফেরার যাতায়াত খরচ মিটিয়েছি।’
তিনি রাস্তায় বিদেশি নাগরিকদের মারধর করতে দেখেছেন এবং বিক্ষোভ কমে গেলেও আর সেখানে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানরত মালাউই সম্প্রদায়ের সূত্রগুলো আল জাজিরাকে জানিয়েছে, নির্বাচনের সময়গুলোতে প্রায়শই বিদেশি-বিরোধী বক্তব্য এবং হামলা বৃদ্ধি পায়। ফিরে আসা কিছু নাগরিক সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বিতাড়িত হয়ে মালাউইয়ে ফিরে আসাকে সামাজিকভাবে লজ্জাজনক মনে করা হয়, কারণ সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক বেকারত্বের হার অনেক বেশি। ফলে দেশে ফেরার পর পুনর্বাসিত হতে তাদের বেশ সংগ্রাম করতে হয়। তবে সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে আগামী সপ্তাহগুলোতে মালাউইকে আরো হাজার হাজার নাগরিককে গ্রহণ করতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রথমে ফিরে আসাদের মধ্যে ছিলেন ৩০ বছর বয়সি দুই সন্তানের জনক ইদ্রিসাহ আকিলেমু। মালাউই পৌঁছানোর পর সরকারি কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান।
আকিলেমু জানান, জোহানেসবার্গে বিদেশিদের লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীদের চালানো এক রাতের অভিযানে তার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি বুঝতে পেরেছিলাম এটি যুদ্ধ ছিল, কোনো বিক্ষোভ নয়। কারণ বিক্ষোভ দিনের বেলায় হয়, কিন্তু এই লোকেরা আমাদের ওপর রাতে হামলা চালাচ্ছিল। আমি এখানে আসতে পেরে কৃতজ্ঞ। আমি কখনো ভাবিনি যে বেঁচে থাকব।’
সবকিছু হারিয়ে ফেলার পর আকিলেমু এখন একটি ছোট ব্যবসা শুরু করার জন্য টাকা জোগাড়ের আশা করছেন। এমনকি তার ব্যাগে থাকা পোশাকগুলোও শুভাকাঙ্ক্ষীদের দান করা, যা তিনি নির্বাসনের অপেক্ষায় একটি কমিউনিটি হলে আশ্রয় নেওয়ার সময় পেয়েছিলেন।
আকিলেমু দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা বুঝি এটা তাদের দেশ, কিন্তু এখন আমাদের অবস্থা দেখুন। আমরা একদম শিশুর মতো খালি হাতে ফিরে এসেছি, কারণ আমরা যা কিছুর জন্য কাজ করেছিলাম তা লুট হয়ে গেছে বা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি খুবই দুঃখজনক।’
সূত্র: আল-জাজিরা
এএম