হোম > বিশ্ব > আফ্রিকা

ভাষার টানাপোড়েনে কেনিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা

আমার দেশ অনলাইন

প্রতীকী ছবি

লোনা চেপকেমোই ২০২৩ সালে যখন একটি টেকনিক্যাল কলেজের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তখন তিনি এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যা স্কুলজীবনে কখনো পাননি। তিনি শিক্ষকের কথা পুরোপুরি বুঝতে পারছিলেন। ২০০৮ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়ার পর চেপকেমোই তার শেষ পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। তার পরিবারের পক্ষে তাকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠানোর সামর্থ্য ছিল না। ফলে ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন তার কাছে বছরের পর বছর ধরে অধরা ছিল।

পরবর্তীতে স্থানীয় একজন সংসদ সদস্যের বৃত্তি তাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ এনে দেয়। তবে ৩৩ বছর বয়সি পাঁচ সন্তানের এই জননীকে শিক্ষার আলোয় ফিরে আসার চেয়েও বেশি অবাক করেছিল ক্লাসের পাঠদানের ধরন। সেখানে তাদের মাতৃভাষা 'কালেনজিন' ভাষায় পাঠদান করা হচ্ছিল।

চেপকেমোই আলজাজিরাকে বলেন, ‘কলেজে আসার পর আমার মনে হয়েছে আমি নিজের বাড়িতে আছি। কারণ সেখানে শিক্ষার মাধ্যম ছিল আমার মাতৃভাষা কালেনজিন এবং এর সঙ্গে কিছুটা সোয়াহিলি ও ইংরেজি মেশানো ছিল। স্কুলের মতো ছিল না, যেখানে শিক্ষকেরা শুধু ইংরেজিতে পড়াতেন এবং পরীক্ষাগুলোও কঠোরভাবে শুধু ইংরেজিতে হতো। এখানকার ভাষা ছিল মাননসই এবং এটি আমাকে খুশি করেছিল কারণ আমি মূল বিষয়টি খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলাম।’

চেপকেমোইয়ের এই অভিজ্ঞতা আসলে একটি বৈশ্বিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (জিইএম) রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী এমন ভাষায় শিক্ষা পায় না যা তারা ভালো বোঝে। কিছু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এই হার প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

পরিচিত ভাষার মাধ্যমে দ্বিতীয় সুযোগ

কেনিয়ার শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শুরুর বছরগুলোতে, সাধারণত ৩ গ্রেড পর্যন্ত মাতৃভাষায় পাঠদানের বিধান রয়েছে। এরপর ৪ গ্রেড থেকে ইংরেজি শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে এবং পাশাপাশি কিসোয়াহিলি ভাষাও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে বাস্তবে অঞ্চল, শিক্ষকের দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীর পটভূমির ওপর ভিত্তি করে শ্রেণিকক্ষে ভাষার পরিবর্তন ঘটে।

পুরো আফ্রিকা মহাদেশ জুড়েই স্কুলের ভাষার ক্ষেত্রে এখনো ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার ব্যবস্থা রয়ে গেছে। সেখানে শিশুরা বাড়িতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায় কথা বলে বড় হলেও শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ বা পর্তুগিজ ভাষার আধিপত্য চলে।

ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং-এর কাজ দেখায়, অনেক দেশে বহুভাষিক শ্রেণিকক্ষ এখন একটি সাধারণ নিয়ম। সংস্থাটি ধারাবাহিকভাবেই যুক্তি দিয়ে আসছে যে শিশুরা যে ভাষা বোঝে, সেই ভাষায় তারা সবচেয়ে ভালো শেখে। তারা মাতৃভাষা-ভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষাকে সাক্ষরতা এবং শিক্ষার ফলাফল উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে বর্ণনা করেছে।

শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতায় ইংরেজি

পরিচিত ভাষার মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে চেপকেমোই একা ছিলেন না। তার স্বামী ফিলেমন টোনুই একই প্রতিষ্ঠানে বিল্ডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন বিষয়ে ভর্তি হন। টোনুই মাধ্যমিক পাস করলেও পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে চূড়ান্ত পরীক্ষার ফি দিতে পারেননি। ফলে তার কোনো সনদপত্র ছিল না।

টোনুইয়ের জন্য ইংরেজির পাশাপাশি কালেনজিন ও কিসোয়াহিলি ভাষার ব্যবহার বড় পার্থক্য তৈরি করেছিল। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারত না। আমার মনে হয় শিক্ষার প্রতিটি স্তরে যদি মাতৃভাষায় পাঠদান করা হতো, তবে অনেক মানুষ শিক্ষায় ভালো করত।’

একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা ২৮ বছর বয়সি রাজমিস্ত্রি ইসমাইল কিপলাঙ্গাতও সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন। তিনি জানান, প্রশিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের বোঝার মতো ভাষায় শেখানোর জন্য সচেতনভাবে চেষ্টা করতেন। কিপলাঙ্গাত বলেন, ‘আমাদের কলেজটি এমন একটি শহরে ছিল যেখানে অনেক সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করত। প্রশিক্ষকেরা সব ভাষা না বুঝলেও, সবাই যেন বিষয়টি বুঝতে পারে তা নিশ্চিত করতে তারা অন্তত তিনটি ভাষায় কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করতেন। অন্য উপজাতির শিক্ষার্থীরাও এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করত এবং বলত যে তারা নিজেদেরকে ক্লাসের অংশ মনে করে, বাদ পড়ে গেছে বলে মনে করে না।’

গ্র্যাজুয়েশনের তিন বছর পর রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করা কিপলাঙ্গাত তার সফলতার পেছনে এই পদ্ধতিকেই কৃতিত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা যদি স্কুলের সেই ক্লান্তিকর ইংরেজি ক্লাসের মতোই হতো, তবে আমি রাজমিস্ত্রি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারতাম না এবং জীবিকা নির্বাহ করতে পারতাম না।’

বোঝাপড়া সুযোগের টানাপোড়েন

আফ্রিকার অন্য অনেক দেশের মতো কেনিয়ার শিক্ষাব্যবস্থাও একটি কাঠামোগত টানাপোড়েনের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা পরিচিত ভাষায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর হলেও উচ্চশিক্ষা, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি অপরিহার্য রয়ে গেছে।

কিপলাঙ্গাত জানান, তিনি এখন প্রতিদিন ইংরেজি চর্চা করেন, কারণ তিনি আরো পড়াশোনা করতে চান এবং বিদেশে কাজ করতে চান।

কেনিয়া অ্যাসোসিয়েশন অফ টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউশনের জাতীয় চেয়ারম্যান শ্যাডরাক টোনুইয়ের মতে, চ্যালেঞ্জটি ভাষার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়া নয়, বরং বহুভাষিক শ্রেণিকক্ষে সেগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখা।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘সাধারণত প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্দেশনা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে শিক্ষার নমনীয়তা বোঝার প্রয়োজনে নিম্ন স্তরে শিক্ষার্থী বুঝতে পারবে এমন ভাষার ওপর জোর দেওয়া এবং ব্যবহার করা যেতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন ভাষাগত পটভূমির শিক্ষার্থীরা আসে, তাই একটিমাত্র স্থানীয় ভাষার ওপর নির্ভর করা অবাস্তব। একই সাথে শ্রমবাজারে ইংরেজির দক্ষতার প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি জোর দেন।

এই চ্যালেঞ্জটি কেবল কেনিয়ার একার নয়। শিক্ষাব্যবস্থাগুলো প্রায়শই শিক্ষকের প্রস্তুতি, স্থানীয় ভাষায় শিক্ষার উপকরণ তৈরি এবং ইংরেজির ভূমিকা নিয়ে অভিভাবক ও নিয়োগকর্তাদের প্রতিযোগী প্রত্যাশা সামাল দিতে হিমশিম খায়।

‘আমাদের কেন অন্য ভাষায় শিখতে হবে?’

চেপকেমোইয়ের কাছে অবশ্য নীতিমালার চেয়ে বাস্তব প্রয়োগটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার বেশিরভাগ গ্রাহক কালেনজিন ভাষায় কথা বলেন, আর কিসোয়াহিলি ভাষা তাকে আরো বড় গ্রাহক মহলের সাথে যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়।

তিনি বলেন, ‘যদিও আমরা কলেজে এমন শিক্ষক পেয়ে ভাগ্যবান ছিলাম যারা বিষয়টি বুঝিয়ে দিতেন, তবে আমাদের ক্লাসে অন্য সম্প্রদায়ের সহপাঠীও ছিল যারা কালেনজিন বলতে পারত না। শিক্ষকেরা তখন তাদের কিসোয়াহিলি ভাষায় বিষয়টি বুঝিয়ে দিতেন।’

তবে কিপলাঙ্গাতের কাছে এই বিতর্কের মূল কথা হলো কেবলই বুঝতে পারা। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আমি নিজেকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করি, ইউরোপ, এশিয়া বা আমেরিকার কেউ একজন যে ভাষায় বড় হয়েছে সেই ভাষায় কেন শিখতে পারে, আর আমাদের কেন তাদের ভাষায় প্রতিযোগিতা করার প্রত্যাশা করা হয়?’

সূত্র: আল-জাজিরা

এএম

লিবিয়া উপকূলে ভেসে এলো ১৫ অভিবাসীর লাশ

কীভাবে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হলো সুদানের জংলেই অঞ্চল

ইথিওপিয়ায় বাস খাদে পড়ে ২৮ জনের মৃত্যু

সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ২৩

মিশরে মরুভূমির বুকে ছুটছে বিশ্বের দীর্ঘতম চালকবিহীন মনোরেল

অ্যাঙ্গোলায় অবৈধ সোনার খনিতে ধস, নিহত ২৮

ডিআর কঙ্গোতে ইবোলা রোগীর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে: ডব্লিউএইচও

ফিলিপাইনে নির্মাণাধীন ৯ তলা ভবন ধস, নিখোঁজ ২১

সেই ‘এল ফাশেরের কসাইকে’ যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরালো আরএসএফ

ইবোলা ভাইরাস নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা জারি