সার্বিয়ার রাজনীতিতে আলেকসান্দার ভুচিস ও তার দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) ১৪ বছরের আধিপত্যের অবসান ঘটেছে। রোববারের নির্বাচনে বিরোধী শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর ঐতিহাসিক জয়ের মধ্য দিয়ে দেশটি নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করেছে। সামনে ডিসেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এ পরিস্থিতিতে সার্বিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে কী পরিবর্তন আসতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশটির পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাৎক্ষণিক ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা কম। বরং প্রথমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো সংস্কারে মনোযোগ দিতে পারে নতুন নেতৃত্ব। তবে রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ইউক্রেন ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতই প্রথম চ্যালেঞ্জ
আলেকসান্দার ভুচিসের জাতীয়তাবাদী বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, ক্রোয়েশিয়া, মন্টিনিগ্রো ও কসোভোর সঙ্গে সার্বিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেই এসব সম্পর্কের দ্রুত উন্নতি হবে, এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা।
নোভি সাদভিত্তিক সেন্টার ফর রিজিওনালিজমের পরিচালক আলেকসান্দার পপভ বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের দ্রুত পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম। নতুন সরকারকে প্রথমে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কমানো, বিচারব্যবস্থা, সরকারি কৌঁসুলিদের দপ্তর, পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে।
ভুচিসের শাসনামলে ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে সার্বিয়ার সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হলেও দুই দেশের নেতাদের মধ্যে প্রায়ই তীব্র বাক্যবিনিময় হয়েছে। সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভের সময় ভুচিস অভিযোগ করেছিলেন, ক্রোয়েশিয়া সার্বিয়ায় ‘রঙিন বিপ্লব’ ঘটানোর আয়োজন করছে। মন্টিনিগ্রোর সঙ্গেও সার্বিয়ার সম্পর্ক বিভিন্ন কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে বসনিয়ার অমীমাংসিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সবচেয়ে জটিল
পপভের মতে, সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার সম্পর্কের জটিলতা সহজে কাটবে না। ক্রোয়েশিয়ার ক্ষমতাসীন ক্রোয়েশিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (এইচডিজেড) এবং সার্বিয়ার এসএনএস—দুই দলই জাতীয়তাবাদী ও জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে দুই দেশের রাজনীতিতে প্রায়ই একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যায়।
পপভ বলেন, জাগরেব একদিকে কড়া বক্তব্য দেয়, অন্যদিকে বেলগ্রেডও পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। এভাবে দুই দেশের নেতারা নিজেদের দেশের ভেতরে ও বাইরে শত্রু তৈরির রাজনীতি করেন।
তবে প্রকাশ্য বিরোধের আড়ালে দুই দেশের আলাদা রাজনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। বেলগ্রেড বসনিয়ার সার্ব-অধ্যুষিত রিপাবলিকা স্রপস্কার নেতা মিলোরাদ দোদিককে সমর্থন করে। অন্যদিকে বসনিয়ায় ক্রোয়াটদের জন্য পৃথক একটি রাজনৈতিক সত্তা প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জাগরেব।
পপভের ধারণা, নতুন সরকারে বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেলে বলকান অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পথও সহজ হতে পারে। কারণ, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ছাড়া কোনো দেশের ইইউতে যোগ দেওয়া সম্ভব নয়।
তার মতে, আগের সরকার সার্বিয়ার ইউরোপীয় একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রাতারাতি বদলাবে না
লন্ডনের কিংস কলেজের প্রভাষক ভুক ভুকসানোভিচের মতে, সার্বিয়ার পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে কম পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, ভুচিসের বিদায়ের পরও দেশটির পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করা কাঠামোগুলো বহাল থাকবে।
ভুকসানোভিচ বলেন, মস্কো কখনোই ভুচিসকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি। তবে তাকে এমন একজন হিসেবে দেখেছে, যার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে। অর্থাৎ, ভুচিসের প্রতি রাশিয়ার আস্থা সীমিত হলেও তার রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে মস্কো পরিচিত ছিল।
ভুচিসের বিদায়ের পর সার্বিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব কিছুটা কমতে পারে। ভুচিস-নিয়ন্ত্রিত ট্যাবলয়েড সংবাদমাধ্যমগুলোতে রাশিয়ার প্রতি নিঃশর্ত প্রশংসার প্রবণতাও কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের গোয়েন্দা সহযোগিতার মাত্রা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে এসব পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে সার্বিয়া দ্রুত রাশিয়ার বিরোধী অবস্থান নেবে।
রাশিয়ার কাছ থেকে অগ্রাধিকারমূলক দামে গ্যাস পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে সার্বিয়ার। কসোভোকে ঘিরে বিরোধও এখনো অমীমাংসিত। এ ছাড়া দেশটির জনগণের একটি অংশ পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। এসব কারণে নতুন সরকারের পক্ষে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থেকে দ্রুত সরে আসা কঠিন হবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সার্বিয়া অদূর ভবিষ্যতে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে কিংবা মস্কোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে—এমন সম্ভাবনা কম। ক্রিমিয়া ও দনবাসকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি সার্বিয়া স্বীকৃতি না দেওয়ার যে অবস্থান ধরে রেখেছে, তা বজায় থাকতে পারে।
তবে ইউক্রেনে গোলাবারুদ সরবরাহের বিষয়টি অনিশ্চিত। ভুচিসের আমলে সার্বিয়া থেকে ইউক্রেনে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের ঘটনাকে বিরোধীরা পশ্চিমা বিশ্বের সহনশীলতা অর্জনের জন্য একটি কৌশল হিসেবে দেখেছে। তাদের মতে, ভুচিস একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন পেতে চেয়েছেন।
ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি পর্যালোচনার সম্ভাবনা
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের সঙ্গে ভুচিসের আমলে সার্বিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। দুই দেশের মধ্যে অস্ত্র কেনাবেচা এবং প্রযুক্তি বিনিময়ও হয়েছে। নতুন সরকার এই সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। তবে আগের সরকারের করা বিভিন্ন চুক্তি পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষক বোস্কো ইয়াকসিচের মতে, বিশেষ করে ইসরাইলে সার্বিয়ার গোলাবারুদ রপ্তানি এবং সার্বিয়ায় ইসরাইলের নজরদারিপ্রযুক্তি রপ্তানির চুক্তিগুলো খতিয়ে দেখা হতে পারে।
ইউরোপে নেতানিয়াহুর আরেকজন কর্তৃত্ববাদী ও জাতীয়তাবাদী মিত্রের পতন ঘটল বলেও মনে করেন ইয়াকসিচ। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানের ক্ষমতা হারানোর ঘটনাও ইসরাইলের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা ছিল। তবে সার্বিয়া ও ইসরাইলের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দুই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি ইসরাইলের পরবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের ওপরও নির্ভর করবে।
‘একসঙ্গে অনেক নৌকায় পা’ দেওয়ার নীতি পুনর্বিবেচনা
ইয়াকসিচের মতে, সার্বিয়া এত দিন একসঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার যে নীতি অনুসরণ করেছে, তা দেশটির জন্য লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছে। নতুন নেতৃত্বের সময়ে এ নীতি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
সার্বিয়া একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেছে। একই সঙ্গে চীন ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। নতুন সরকার এই ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি কতটা বজায় রাখবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার ওপর নতুন নেতৃত্ব বেশি গুরুত্ব দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, ভুচিসের পতনের পর সার্বিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারই অগ্রাধিকার পেতে পারে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বিচারব্যবস্থা ও সংবাদমাধ্যমের সংস্কার এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগের মধ্য দিয়েই নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ স্পষ্ট হবে। রাশিয়া, ইসরাইল ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেও তা যে দ্রুত বা আমূল হবে, এমন আভাস এখনো নেই।
এএম