হোম > বিশ্ব

তুরস্কের মুসলিমদের মাঝে উম্মাহ স্পিরিট বেশ প্রবল

ড. মিজানুর রহমান আজহারি

উসমানি খিলাফাহ-এর কেন্দ্রবিন্দু ছিল বর্তমান তুরস্ক। দীর্ঘ ছয়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থায়িত্ব ছিল সর্বশেষ এই খিলাফাহ-এর। ইতিহাসের পাতায় আঁকা খিলাফাহ-এর সেই সোনালী সকাল যেন মুসলিম উম্মাহর জীবনে আবারও নতুন করে উদিত হয়।

দুই মহাদেশের মিলনস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ইস্তাম্বুল শহর ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ। এশিয়া-ইউরোপের মিলনস্থল ইস্তাম্বুল শহরটিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে বসফরাস প্রণালী। এর পশ্চিম অংশ ইউরোপ মহাদেশে এবং পূর্ব অংশ এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত। এই প্রণালীটি কৃষ্ণ সাগর ও মার্মারা সাগরকে সংযুক্ত করেছে। দুই মহাদেশের সংযোগ রক্ষায় বসফরাস প্রণালীর ওপর চমৎকার তিনটি ঝুলন্ত সেতু রয়েছে। যেটি দিয়ে খুব সহজেই এশিয়া সাইড থেকে ইউরোপ সাইডে যাতায়াত করা যায়।

ইস্তাম্বুলের পূর্ব নাম ছিল কন্সটান্টিনোপল। উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ, যিনি সুলতান ফাতিহ নামে বিখ্যাত; তিনি এ শহরকে জয় করে এটিকে ইসলামি খিলাফাহ-এর রাজধানী করেন। ইস্তাম্বুল—পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর নগরীগুলোর একটি।

ইস্তাম্বুলের তোপকাপি প্যালেসে অবস্থিত একটি জাদুঘরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পবিত্র চুল ও দাড়ি মুবারক, চাদর, তরবারি, জুতা, দন্ত মোবারকের অংশ ও পায়ের ছাপ-সহ নবি পরিবারের ব‍্যবহৃত নানা পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত আছে।

১৫১৭ সালে উসমানী সুলতান প্রথম সেলিমের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে মদিনার উসমানী গভর্নর ফখরি পাশার নেতৃত্বে হিজাজ রেলওয়ের একটি বিশেষ ট্রেনে করে কঠোর নিরাপত্তায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পবিত্র স্মৃতিচিহ্নগুলো ইস্তাম্বুলের তোপকাপি প্যালেসে নিয়ে আসা হয়। সেই সময় থেকে আজ অবধি পবিত্র এজিনিসগুলো এই মিউজিয়ামেই সংরক্ষিত রয়েছে।

নবিজির একজন প্রিয় সাহাবি আবু আইয়ুব আল আনসারী (রা.) শুয়ে আছেন ইস্তাম্বুলের আইয়ুব সুলতান মসজিদ-এর পাশে। বিখ্যাত এ সাহাবি তুর্কিদের কাছে আইয়ুব সুলতান হিসেবে প্রসিদ্ধ। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় গিয়ে এই আবু আইয়ুব আল আনসারী (রা.)-এর বাড়ীতেই অবস্থান নিয়েছিলেন।

তুর্কিদের চা পানের ঐতিহ্য বেশ পুরনো। চা পান করতে তারা খুব পছন্দ করে। গড়ে প্রতিদিন ৬-৭টা মিটিং থাকতো আমার। ফলে, তাদের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে কোন কোন দিন ৬ থেকে ৭ বারও চা পান করেছি। তুর্কিরা লাল চা খুব পছন্দ করে এবং স্বচ্ছ কাচের তৈরি ছোট বিশেষ আকৃতির গ্লাসে চা পরিবেশন করে। চা যেন তুর্কি জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য স্পন্দন। চা ছাড়া তুর্কিদের জীবন কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব।

বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়ানো তুর্কি জাতির এক মহান মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য। সমগ্র দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শত শত সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা নিরলসভাবে দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুমুখী সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। বস্তুত, মানবকল্যাণকে তারা কেবল সামাজিক দায়িত্বই মনে করে না, বরং পরম পবিত্র এক ইবাদত হিসেবে কল্পনা করে; যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

তুরস্কের রাস্তাঘাটে, মসজিদে এবং দোকানপাটে বিড়াল চোখে পড়ে। তারা রাস্তার প্রাণীদের জন্য খাবার, পানি এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে রাখে এবং এদেরকে অনেকটা পরিবারের সদস্যের মতোই যত্ন নেয়।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি তুর্কিরা অত্যন্ত সচেতন। শহরগুলোর রাস্তাঘাট, মেট্রো স্টেশন, গণপরিবহন এবং পাবলিক স্পেসগুলো একেবারে ঝকঝকে তকতকে। মসজিদের ওযুখানা এবং ওয়াশরুমগুলো একেবারে সুপার ক্লিন। সাধারণ নাগরিকরাও যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলে না। সবকিছু বেশ সাজানো গোছানো। যতো মসজিদে গিয়েছি, মোজা পরা ছাড়া কাউকে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখিনি।

তুরস্কের মসজিদগুলো এক কথায় দৃষ্টিনন্দন। এক একটা মসজিদ যেন একেকটা উসমানীয় স্থাপত্য শিল্পের ক্লাসিক নিদর্শন। সমাজে মসজিদের যে একটা প্রভাবশালী অবস্থান থাকা প্রয়োজন সেটা বাস্তবিক অর্থেই তুরস্কে দেখা যায়। প্রাচীন দর্শনীয় মসজিদগুলোতে শত শত অমুসলিম একটি নির্ধারিত জায়গায় দাঁড়িয়ে আজান শুনছে, জামাতে নামাজের দৃশ্য দেখছে, সেসব দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করছে যা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।

মিমার সিনান নামে একজন আর্কিটেক্ট উসমানীয় সুলতানদের প্রধান রাজকীয় স্থপতি হিসেবে প্রায় ৫০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তুরস্কের বেশির ভাগ প্রাচীন মসজিদগুলো তারই নকশা করা। তার ডিজাইন করা মসজিদগুলোতে মনোমুগ্ধকর স্থাপত্যশৈলীর এক বিশেষ ছোঁয়া আছে।

উন্নত গ্রানাইট ও মার্বেল পাথরের তৈরি মজবুত দেয়াল, ডোরাকাটা খিলান, সুপ্রশস্ত পাথুরে পিলার, সুদৃশ্য গম্বুজ এবং সুউচ্চ মিনারগুলো উসমানীয় স্থাপত্যকলার এক কালজয়ী নিদর্শন বহন করে।

মসজিদগুলোর গম্বুজের কেন্দ্রবিন্দু থেকে শুরু করে চারপাশ জুড়ে পবিত্র কুরআনের আয়াত ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি মসজিদেই চমৎকার ভেন্টিলেশন সিস্টেমের মাধ্যমে ভেতরে প্রাকৃতিক আলোর চমৎকার প্রবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রায় প্রতিটি ঐতিহাসিক মসজিদের আঙিনায় প্রাচীর বেষ্টিত একটি বিশাল বারান্দা বা চত্বর থাকে। উন্মুক্ত এ প্রাঙ্গণটিকে মসজিদের মূল কাঠামোর সাথে এটাচ করে দেয়া যা মসজিদের স্থাপত্যকে ভিন্ন একটি আর্টিস্টিক রুপ দিয়েছে।

নামাজ শেষে সকল মুসল্লিদের প্রতি দরুদ পাঠের রিমাইন্ডার এবং দরাজ গলায় কুরআন তিলাওয়াতের সুমধুর ধ্বনি মসজিদের ভেতরে এক অভূতপূর্ব মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করে। মুসল্লিরাও মন দিয়ে নীরবে সেই তিলাওয়াত উপভোগ করেন।

তুরস্কে ইসলামী ভাবধারা এবং পাশ্চাত‍্য ভাবধারার একটা সংমিশ্রণ হয়েছে। একদিকে ইউরোপীয় জীবনযাত্রা, নাইটলাইফ এবং আধুনিক ফ্যাশনের প্রদর্শন আর অন্যদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা — দুটোই সমানভাবে বজায় রয়েছে।

তুরস্কের মুসলিমদের মাঝে উম্মাহ স্পিরিট বেশ প্রবল। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যেকোনো সংকটকালীন সময়ে মুসলিমরা বিপদে পড়লে তুর্কি জনগণ এবং তাদের বিভিন্ন সংস্থা সবার আগে সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে। তারা বেশ সাহসী এবং তাদের মাঝে নেতৃত্বের মনোভাব আছে।

মুসলিম দেশগুলো যখন বৈশ্বিক পরিসরে নিজেদের কণ্ঠস্বর জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে না, তখন তুরস্কের সাহসী অবস্থান উম্মাহর মাঝে নতুন জাগরণ ও আস্থার জন্ম দেয়। তুরস্কে দেখার আছে অনেক। শেখার আছে অনেক।

মামদানির ঘনিষ্ঠ কংগ্রেস প্রার্থীকে আটক করল ইসরাইল

সিরিয়ার বিজয় স্মরণ করা হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে

৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণের কবলে বিশ্ব, বাড়ছে সুদের বোঝা

লিবিয়ার পার্লামেন্টের অনুমোদনকে স্বাগত জানালেন এরদোয়ান

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান

ইসরাইলি অ্যাপ ব্যবহার নিষিদ্ধ করল মালয়েশিয়া

হাইতিতে অপহৃত ৪ সেনাকে উদ্ধারে সামরিক অভিযান, এল সালভাদরের প্রেসিডেন্টের হুঁশিয়ারি

হরমুজে ৭ জাহাজে হামলা, ৪টিতে আগুন

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই নতুন করে ইরানে হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে হুথিদের ঠেকাতে সৌদির পাশে ব্রিটেন