নিউইয়র্কের ৯/১১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়ামে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সংরক্ষণ করা হয়েছে। মাটির প্রায় ৭০ ফুট নিচে রাখা হয়েছে পুড়ে যাওয়া ফায়ার ট্রাক, বিকৃত ইস্পাতের বিম, দমকলকর্মীদের হেলমেট, নিহতদের ঘড়ি এবং ছিনতাই হওয়া বিমানের যাত্রীদের শেষ বার্তা। দর্শনার্থীরা বিভিন্ন কোণ থেকে টুইন টাওয়ারে বিমান আঘাত হানার দৃশ্য এবং হামলার শিকার ব্যক্তিদের শেষ কথাও শুনতে পারেন।
হামলার ২৫তম বার্ষিকীর আগে জাদুঘরটি ঘুরে দেখেছেন মিডল আইয়ের সাংবাদিক আজাদ ইসা। জাদুঘরটি ঘুরে দেখার পর তার প্রশ্ন, ৯/১১-এর ইতিহাস কতটা সম্পূর্ণভাবে এখানে তুলে ধরা হয়েছে? প্রায় তিন ঘণ্টা জাদুঘরে কাটিয়েও তিনি কাঙ্ক্ষিত কোনো নতুন বা বিস্ময়কর তথ্য পাননি। বরং বারবার একই ভয়াবহ দৃশ্য দেখানোর মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সেই দিনের আতঙ্কের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
২০১৪ সালে চালু হওয়া জাদুঘরটির প্রদর্শনী এলাকা প্রায় এক লাখ ১০ হাজার বর্গফুট। এখানে ৮৩ হাজারের বেশি নিদর্শন রয়েছে। আল-কায়েদা, ওসামা বিন লাদেন, ১৯৯৩ সালের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হামলা এবং ২০০১ সালের হামলার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রাখা হয়েছে। তবে লেখকের মতে, হামলার পেছনের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশেষ করে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে আল-কায়েদার উত্থানের সঙ্গে সেই যুদ্ধের সম্পর্ক খুব সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। লেখকের অভিযোগ, এতে ৯/১১-এর ঘটনাকে প্রধানত ধর্মীয় উগ্রবাদের ফল হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আড়ালে থেকে গেছে।
ইতিহাস ও বর্তমান সময় সম্পর্কে অত্যন্ত অসম্পূর্ণ এবং প্রশ্নবিদ্ধ একটি ধারণা নিয়েই এখান থেকে ফিরতে হবে দর্শণার্থীদের।
‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ অনুপস্থিত
জাদুঘরের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে ৯/১১-পরবর্তী দুই দশকের তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেরর’-এর প্রায় অনুপস্থিতি। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ, ব্যাপক প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি, গুয়ানতানামো বে ও আবু গারিবে নির্যাতন, সিআইএ-র গোপন কারাগার এবং যুক্তরাষ্ট্রে নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাপক বিস্তার—এসবের খুব সামান্যই জাদুঘরের বয়ানে রয়েছে।
লেখকের মতে, ৯/১১-এর পর মুসলিমদের ওপর নজরদারি ও অভিবাসনকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করার ঘটনাগুলোও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। এমনকি জাদুঘরের নিরাপত্তাব্যবস্থাকেই তিনি ৯/১১-পরবর্তী নিরাপত্তা সংস্কৃতির একটি প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
আজাদ ইসা আরো প্রশ্ন তোলেন, ৯/১১-এ নিহতদের নাম, ছবি ও ব্যক্তিগত গল্প যতটা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে, পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে নিহত আফগান ও ইরাকিদের ততটা মানবিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। তার দৃষ্টিতে, এই অসম বয়ান ৯/১১-এর স্মৃতিকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আটকে ফেলেছে।
স্মৃতি ও শূন্যতা
জাদুঘর থেকে বেরিয়ে লেখক ৯/১১ স্মৃতিসৌধের দুটি বিশাল জলাধারের কাছে যান। ‘রিফ্লেক্টিং অ্যাবসেন্স’ নামের এই স্মৃতিসৌধে পানির ধারা একটি গভীর শূন্যতার দিকে নেমে যায়। স্থপতি মাইকেল আরাডের ধারণায় এটি ছিল বিচ্ছেদ ও চিরস্থায়ী অনুপস্থিতির প্রতীক।
স্মৃতিসৌধ দর্শনার্থীদের সেই শূন্যতাকে ভুলতে নিষেধ করে; কিন্তু জাদুঘরের পুনঃপুন ভয়াবহ দৃশ্য প্রদর্শন যেন মানুষকে সেই শূন্যতার আরো গভীরে টেনে নেয়।
তার মতে, ৯/১১-এর স্মৃতি সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত যুদ্ধ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী মানবিক বিপর্যয়কেও একইভাবে আলোচনায় আনা প্রয়োজন। অন্যথায় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুচ্চারিত থেকে যায়।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
আরএ