হোম > বিশ্ব

একের পর এক ৯ নারীর লাশ, একই কায়দায় হত্যা

বিবিসি বাংলা

ছবি: সংগৃহীত।

দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের পূর্বাঞ্চলীয় শহর এখুরুলেনিতে একের পর এক নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত ওই এলাকায় একই ধরনের পরিস্থিতিতে নয়জন নারীর লাশ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

সর্বশেষ নিহতদের একজন ৩৮ বছর বয়সী দিনেও মোটাপানে। দুই সন্তানের এই মাকে গত রোববার দেখা গিয়েছিল। পরে এখুরুলেনির একটি আবাসিক এলাকা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল এবং লাশটির কিছু অংশ পুড়ে গিয়েছিল।

দিনেওর লাশ শনাক্ত করার তার ভাগনি নকওয়ান্ডা মাতশিকিজা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা কী করতে যাচ্ছি, আমার কোনো ধারণা নেই। কিন্তু কিছু একটা পরিবর্তন হতেই হবে।’

তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের জন্য, অন্য সব নারীর জন্যও—আর কতগুলো লাশ পাওয়া গেলে কিছু একটা করা হবে?’

দিনেওর মেয়েকে একসময় তার মায়ের মৃত্যুর নির্মম ঘটনা জানাতে হবে—এ কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নকওয়ান্ডা। তিনি বলেন, ‘আপনি কীভাবে বোঝাবেন যে তার অভিভাবককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, একটি মাঠে ফেলে রাখা হয়েছে এবং আবর্জনার মতো ফেলে দেওয়া হয়েছে?’

তার ভাষায়, এমন ঘটনা মেনে নেওয়া বা তা থেকে কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব নয়।

দিনেওর মৃত্যুর আগে একই এলাকায় আরও কয়েকজন নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। জুলাই থেকে পাওয়া নয়টি লাশের মধ্যে পাঁচটিই এখুরুলেনির কেম্পটন পার্ক এলাকায় পাওয়া গেছে বলে স্থানীয় অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৩২ বছর বয়সী দোকানকর্মী ইতুমেলেং। তাকে সর্বশেষ জীবিত দেখার ১৭ দিন পর জুলাইয়ে একটি সেতুর ওপর তার লাশ পাওয়া যায়। গুরুতর আঘাতের চিহ্ন থাকা ওই নারীর শরীরে তখন আংশিক পোশাক ছিল।

ইতুমেলেংয়ের ভাই থেম্বা কেকানাও বলেন, ‘আমরা শোকে ভেঙে পড়েছি। আমার বোনের ছোট মেয়ের দিকে তাকালে আমার চোখে পানি চলে আসে। আমি জানি, তার এই কষ্ট আমি কখনোই দূর করতে পারব না।’

তিনি বলেন, কোনো পরিবারেরই তাদের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়।

এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে এখন পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রথম লাশ উদ্ধারের দুই দিন পর তাকে আটক করা হয়। তবে ইতুমেলেং, দিনেওসহ এখুরুলেনিতে নিহত অন্য নারীদের ঘটনায় আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

নিহতদের বেশিরভাগই ২০ ও ৩০-এর কোঠার তরুণী। তাদের অনেকের শরীরেই মৃত্যুর আগে ভয়াবহ নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

তবে পুলিশ এখনো নিশ্চিত নয় যে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো সিরিয়াল কিলার রয়েছে কি না। তদন্তকারীদের ভাষ্য, ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র নাও থাকতে পারে।

তারপরও ধারাবাহিক এসব ঘটনায় দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার দীর্ঘদিনের সংকট নতুন করে সামনে এসেছে। দেশটিতে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার হার বিশ্বের অন্যতম বেশি।

দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ প্রতি তিন মাসে অপরাধের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ৫ হাজার ৪২৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। সরকারি পরিসংখ্যানে ভুক্তভোগীদের লিঙ্গভিত্তিক আলাদা হিসাব দেওয়া হয় না। তবে দেশটির মানবাধিকার কমিশনের হিসাবে, ওই তিন মাসে ৫৬৯ জন নারী নিহত হয়েছেন—গড়ে প্রতিদিন প্রায় ছয়জন। একই সময়ে ১ হাজার ৫২ জন নারী হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় আগে থেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা অনেক নারী আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে সরকারের ওপরও চাপ বাড়ছে।

গত বছরের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। সে সময় সমাজ উন্নয়নমন্ত্রী নকুজোলা সিসি তোলাশে বলেছিলেন, জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে সংকট মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা বাড়বে। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটিতে বিক্ষোভ হয়, যার মধ্যে ‘উইমেন্স শাট ডাউন’ কর্মসূচিও ছিল।

এবার আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, নারীদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে নারীকে লিঙ্গের কারণে হত্যার ঘটনাকে পৃথক অপরাধ হিসেবে আইনে স্বীকৃতি দেওয়া। সংগঠনটির দেশীয় পরিচালক শেনিলা মোহাম্মদের মতে, এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে ‘নারী-হত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে সমস্যাটির প্রকৃত ব্যাপকতা পরিমাপ ও মোকাবিলায় আরও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।

অ্যামনেস্টির দাবি, আফ্রিকার গ্যাবন ও মরক্কোসহ ৩৩টি দেশে নারী-হত্যা নির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি পেয়েছে।

এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এখুরুলেনির হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্তে কোনো দিক অযত্নে রাখা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, একটি জাতি হিসেবে নারী ও মেয়েদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

লিঙ্গ ও সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক কর্মী লেবোগাং রামোফোকো মনে করেন, নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা আরও গভীর একটি সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। তার মতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের প্রতি সহিংসতার পেছনে উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্যের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারও রয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এর অর্থ কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষরা স্বভাবগতভাবে সহিংস—এমন দাবি করা নয়; বরং দীর্ঘদিনের সহিংস সামাজিক ব্যবস্থার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

কেম্পটন পার্ক এলাকায় সচেতনতা তৈরিতে কাজ করা লুমকা মাকহুবেলা গার্ল২উম্যান ফাউন্ডেশনের সদস্যরা এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন।

সংগঠনটির সদস্যদের একজন বলেন, ‘আমরা শোকাহত, আমরা ভীত। পুলিশ যদি আর আমাদের সুরক্ষা দিতে না পারে, তাহলে সরকারের এগিয়ে এসে কিছু করা উচিত।’

তার কথায়, শুধু আরও সতর্ক থাকতে বললে হবে না; মানুষের বসবাসের এলাকাগুলোকে নিরাপদ করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

এলাকার নারীদের মধ্যেও আতঙ্ক স্পষ্ট। ৩২ বছর বয়সী থুলিসিলে সিবান্দে বলেন, দোকানে যাওয়ার সময়ও তাকে চারপাশে তাকাতে হয়। তার ভাষায়, ভয় এতটাই বেড়েছে যে সেটি একধরনের মানসিক আঘাতে পরিণত হয়েছে।

৬০ বছর বয়সী থেম্বি মাবেনা নিহত দিনেও মোটাপানের একই এলাকায় বসবাস করতেন। তিনি বলেন, দিনেও প্রতিদিন সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। এখন তিনি উদ্বিগ্ন। তার পরিচিত অনেক শিশু ও তরুণী একা দোকানে যেতেও ভয় পায়।

২০ বছর বয়সী লেরাতো মজিজির কথায়, পরিস্থিতির ভয়াবহতা যেন এক বাক্যেই ধরা পড়ে—‘দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীরা আর নিরাপদ নন।’

এমএমআর

বাব আল-মান্দেবে তীব্র সংঘর্ষ, সাত হুথি সদস্য নিহতের দাবি ইয়েমেন সরকারের

রিয়াদ বিমানবন্দরের কাছে বিস্ফোরণ, সৌদির বিভিন্ন স্থানে সতর্কতা জারি

কেফিয়েহ পরে আবেগঘন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট, দিলেন ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান

আবারো বিদ্যুৎহীন কিউবা, অন্ধকারে লাখো মানুষ

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় বাইরের কোনো শক্তি নাক গলাতে পারবে না: ইরান

সংলাপ-কূটনীতিই শান্তির পথ, আরাগচিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পরীক্ষার হলে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার, ধরা পড়ার পর আইআইটি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

১৮ জনকে মালদায় এনে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা

সৌদিকে এফ-৩৫ দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি ইসরাইলের

ইস্তাম্বুলে ইরানি ব্যাংকের লাইসেন্স বাতিল করল তুরস্ক