রিপোর্টার্স কালেকটিভের অনুসন্ধান
গত বছর ভারতের হায়দারাবাদের তাজ ডেকান হোটেলে ‘ভবিষ্যতে নারীদের ভূমিকা’ নিয়ে কথা বলতে মঞ্চে ওঠেন তৎকালীন নারী ও শিশু উন্নয়নমন্ত্রী স্মৃতি ইরানি। স্মৃতি মঞ্চে ওঠার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই মোদি সরকারের পক্ষ নিয়ে রসিকতার সুরেই ক্ষুব্ধ মন্তব্য করেন।
২০২৩ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকের (গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স) ১২৫টি দেশের মধ্যে ভারতের ১১১তম অবস্থান নিয়ে প্রতিবেদনের বিষয়ে ক্ষোভ জানান তিনি।
‘মানুষ বলে যে এই সূচকটি অসার’- এমন মন্তব্য করে স্মৃতি ইরানি বলেন, ব্যস্ততার কারণে কোনো কোনো দিন খাওয়ার সময় হয় না তার। এমন সব অস্থায়ী অসুবিধাকে পুষ্টিহীনতা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে তুলনা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
স্মৃতি বলেন, ‘আজ ভোর ৪টায় আমি দিল্লির বাসা থেকে বের হয়েছি। কোচির উদ্দেশে সকাল ৫টায় একটি ফ্লাইট ধরেছিলাম। সেখানে একটি আলোচনা সভায় অংশ নেওয়ার পর, আমি আবার ৫টায় ফেরার ফ্লাইট ধরেছিলাম। যখন আমি খেলাম, তখন রাত ১০টা হবে। যদি জরিপ সংস্থা থেকে আজ দিনের যে কোনো সময় আমাকে কল করে জানতে চাইতো, ‘আপনি ক্ষুধার্ত কিনা?’ আমার উত্তর হতো হ্যাঁ।’
রেটিংগুলোর প্রতি বিরক্তি প্রকাশের সময় ভারতের তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী যা উল্লেখ করেননি তা হলো, তার মন্ত্রণালয় বিগত বছরগুলোতে গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সের প্রকাশকদের সঙ্গে ভারতের অবস্থান বাড়ানোর জন্য বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিল।
সরকার চেয়েছিল, প্রকাশকরা দেশের স্কোর নির্ধারণের পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনুক। এর মধ্যে একটি ছিল শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার কমে যাওয়ার বিষয়টিতে কম গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা। সূচকে ভারতের সবচেয়ে ফল খারাপ হয় এটিতে। এমনকি সরকারের স্বীকারোক্তি অনুসারে, এটিই ভারতের সামগ্রিক স্কোরকে নিচে নামানোর জন্য দায়ী। সরকার মনে করছিল, খাদ্যাভ্যাস সূচকটি শিশুদের প্রতি খুব ‘পক্ষপাতমূলক’। এমনকি তারা দাবি করেছিল, অনেক নবজাতকের মৃত্যুর সঙ্গে অপুষ্টির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে বৈশ্বিক সূচককে প্রভাবিত করার জন্য এটি ভারতের একমাত্র প্রচেষ্টা নয়। স্বাধীন সাংবাদিকদের দ্বারা পরিচালিত ওয়েবসাইট ‘রিপোর্টার্স কালেকটিভে’ প্রকাশিত একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ‘সম্পূর্ণ-সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি’ ছিল এমনই। দেশটির সরকার বিভিন্ন বিষয়ে বৈশ্বিক সূচক মনিটর করা ৩০টি সংস্থার কাছে গিয়ে মানদণ্ডের পরিবর্তনের অনুরোধ করে।
এই সূচকগুলোকে একান্তভাবে অনুকূলে আনার জন্য ‘গ্লোবাল ইনডিসেস ফর রিফর্ম অ্যান্ড গ্রোথ (জিআইআরজি)’ নামে একটি সংশ্লিষ্ট ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এটি একটি ধারণা ব্যবস্থাপনা এজেন্সি হিসেবে কাজ করছে। যার সঙ্গে একটি মিডিয়া আউটরিচ সেলও রয়েছে, যাতে ভারতের সম্পর্কে আলোচনা কীভাবে হচ্ছে তা নিয়ন্ত্রণ করা এবং দেশের ভাবমূর্তিকে মানুষের কাছে আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করা যায়।
রিপোর্টার্স কালেকটিভের পর্যালোচিত নথিগুলো থেকে জানা গেছে, কমপক্ষে ১৯টি কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় ও দপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যে, তারা ভারত সম্পর্কে এই বৈশ্বিক সূচকগুলো কী বলছে তা মনিটর করবে। যেমন- দেশের ক্ষুধার মাত্রা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে গণতন্ত্রের অবস্থাও।
বিদেশে ভারতীয় মিশনগুলোও এই সূচকগুলোর প্রকাশকদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পেয়েছে। তারা সরকারের কাছে প্রতিবেদন পাঠাচ্ছে।
মোদি সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে তার নিজস্ব সূচক তৈরি করা। এটি সরকারের জন্য সবচেয়ে সহজ উপায়, যাতে তারা এই বৈশ্বিক সূচকগুলোকে তলানিতে নামিয়ে ফেলতে পারে, যেগুলোর সঙ্গে সরকারের প্রায়ই পদ্ধতিগত সমস্যা থাকে। এসব অর্জন করতে, সরকার গুজরাটভিত্তিক একটি আইটি কোম্পানিকে নিয়োগ করেছে, যা এর আগে বিজেপিকে পূর্ণাঙ্গ সূচক ট্র্যাকিং সফটওয়্যার তৈরি করতে ‘অনলাইন রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস’ দেওয়ার জন্য সংবাদ শিরোনামে এসেছিল। ২০১৯ সালে এই কোম্পানিটি বিতর্কিত বিষয়গুলোকে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিজেপির পক্ষে নেওয়ার জন্য সমালোচনা করেছিল ফেসবুক।