ভারতের আসামের নগাঁও জেলার বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সি হাসান আলীর দিন কাটছে তার বৃদ্ধ বাবা তাহের আলীর চিন্তায়। ৫৮ বছর বয়সি বাবা কীভাবে আসামে একা একা জীবনযাপন করছেন, জানুয়ারির তীব্র শীতে কী করছেন, কোনো ধরনের বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন কিনা— এমন সব চিন্তায় উদ্বিগ্ন হাসান আলী। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য স্ক্র’কে হাসান জানিয়েছেন, গত আট মাসে তার কৃষক বাবা তাহের আলীকে একবার নয় তিনবার ভারত থেকে জোর করে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন নোম্যানস ল্যান্ডে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। পেশায় সবজি বিক্রেতা হাসানকে দুবার বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।
তাহের আলী একজন ‘ঘোষিত বিদেশি’, যিনি রাজ্যের বিদেশি ট্রাইব্যুনালের সামনে নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। যদিও তাহের আলীর পুরো জীবন কেটেছে আসামে। এই আধাবিচারিক ট্রাইব্যুনাল আসামের হাজার হাজার বাসিন্দার নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের কথা না শুনেই একতরফা আদেশের মাধ্যমে তাদের বিষয়ে রায় দিয়েছে। ফলে তাহের আলীর মতো অনেকেই নাগরিকত্ব হারিয়েছেন।
যারা বিদেশি ট্রাইব্যুনালে মামলা করে হেরে গেছেন, তারা উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। কিছু ক্ষেত্রে তাদের রাজ্যের ডিটেনশন বা হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু গত বছরের মে মাস পর্যন্ত তাদের খুব কমই বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। কারণ, ট্রাইব্যুনালের আদেশ কোনোভাবেই প্রমাণ করেনি যে, নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া ব্যক্তিরা বাংলাদেশের নাগরিক।
তবে গত বছরের মে মাস থেকে আসামের ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার বারবার নির্বাসনের আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে গেছে। তারা আইনের তোয়াক্কা না করেই ‘ঘোষিত বিদেশি’দের রাতের অন্ধকারে বন্দুকের নলের মুখে সীমান্ত পেরিয়ে তাদের বাংলাদেশে ‘পুশইন’ বা ফেরত পাঠিয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই জোরপূর্বক বহিষ্কারের জন্য ১৯৫০ সালের একটি আইন প্রয়োগ করেছেন।
নভেম্বর থেকে রাজ্য সরকার ২২ ঘোষিত বিদেশিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি করেছে। এর ফলে এসব পরিবার আদালতে যাওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না।
কিন্তু বাংলাদেশ তাদের প্রবেশ করার অনুমতি দেয়নি। ফলে তাহের আলীর মতো মানুষ ‘পুশ ব্যাক’ এবং ফিরে আসার এক দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকা পড়েছেন।
তাহের আলী একা নন। ‘স্ক্রল’ থেকে জানা যায়, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর থেকে আসামের অন্তত সাত বাসিন্দাকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের ঢুকতে না দিলে পাঁচদিন পর তারা ভারতে ফিরে আসেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে সমস্যার মুখে পড়েন তারা, তা হলো আবারও জোর করে তাদের বের করে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে শেষ দেখা গিয়েছিল ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলা থেকে একটি ফেসবুক ভিডিওতে, যা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে ধারণ করা হয়েছিল। প্রতিবেশী দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে চারজন এখন বাংলাদেশ পুলিশের হেফাজতে আছে। তাহের আলী ছাড়াও অন্তত আরো একজনকে তিনবার বাংলাদেশে জোর করে ঢুকতে বাধ্য করেছে ভারত।
তবে এ বিষয়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) মুখপাত্র এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, এভাবে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর ক্ষেত্রে তারা ১৯৫০ সালের আইন অনুসরণ করছে কি না এবং বহিষ্কারের আগে তাদের জাতীয়তা যাচাই করা হয়েছে কি না। কিন্তু এ দুই সংস্থা এর কোনো উত্তর দেয়নি।
তবে আইনজীবী ও পর্যবেক্ষকরা স্ক্রলকে জানিয়েছেন, আসাম সরকারের নতুন নীতি আন্তর্জাতিক এবং সাংবিধানিক নিয়ম লঙ্ঘন করেছে।
ভারতে নাগরিকত্বের প্রশ্ন নিয়ে গবেষণা করা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেটের ছাত্র অভিষেক সাহা বলেছেন, ভারতের এমন কাজ রাষ্ট্রহীনতার উৎপাদন। ভারত এসব লোককে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়েছে, আর বাংলাদেশ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। এসব লোককে দুই দেশের মধ্যে ‘টেনিস বলের মতো’ এদিক-ওদিক ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।
হাসান আলী বলেন, কেন তার বাবাকে দুদেশের মধ্যে বারবার তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভারত তার বাবাকে বাংলাদেশ থেকে আসা বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করেছে। ওদিকে বাংলাদেশও তাকে দুবার ফিরিয়ে দিয়েছে। তাইলে তাদের দেশ কোনটি; তাদের কি কোনো দেশ আছে?
দিল্লির একজন আইনজীবী উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি বলেছেন, ১৯৫০ সালের আইনটি কেবল সেসব ব্যক্তিকে দ্রুত ‘বহিষ্কারের’ অনুমতি দেয়, যাদের আসামে উপস্থিতি ভারতের সাধারণ জনগণ, এর যেকোনো অংশ বা আসামের যেকোনো তফসিলি উপজাতির স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু বহিষ্কৃত ব্যক্তিরা ভারতের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর ছিলেনÑএমন কোনো প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি।