বিবিসির বিশ্লেষণ
স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে অন্য স্থানে পুনর্বাসনের পর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজা দখল করে তা আমেরিকান ‘মালিকানায়’ নেওয়ার যে পরিকল্পনা ডোনাল্ড ট্রাম্প করেছেন, তা সফল হবে না। এ কাজে আরব দেশগুলোর যে সম্মতি ও সহযোগিতা প্রয়োজন, তারা ইতোমধ্যেই তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
গাজার ফিলিস্তিনিদের যে দুটি দেশে ট্রাম্প পুনর্বাসন করতে চাচ্ছেন, সেই জর্ডান ও মিসর আগেই এ পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে এ পুনর্বাসনে মোট ব্যয়ের অর্থ পাওয়ার জন্য যে সৌদি আরবকে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তারাও বলছে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছাড়া এ সমস্যায় কোনো সমঝোতায় যাবে না তারা। অন্যদিকে আমেরিকা ও ইসরাইলের পশ্চিমা মিত্ররাও এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে।
হয়তো গাজার কোনো কোনো ফিলিস্তিনি বাসিন্দা অন্যত্র বসতি স্থাপনে প্রলুব্ধ হতে পারে। কিন্তু ১০ লাখ লোক বের হয়ে গেলেও গাজায় ১২ লাখ ফিলিস্তিনির বাস থাকবে।
হয়তো ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুসারে গাজার স্থানীয় বাসিন্দাদের আমেরিকা জোর করে উচ্ছেদ করবে। এমনটি হলে তা হবে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিষয়ে ঝুলে থাকার আশার সমাপ্তি। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান অনুসারে শতাব্দীপ্রাচীন এ সংঘাত থামাতে ইসরাইলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে।
ইসরাইলের বর্তমান ক্ষমতাসীন নেতানিয়াহু সরকার কঠোরভাবে এর বিরোধী। বছরের পর বছর তাদের অসহযোগিতার কারণেই দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ঝুলে আছে। তবে ১৯৯০ দশকের শুরু থেকেই আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক ভিত্তি ছিল দুই রাষ্ট্র নীতি।
ট্রাম্পের নতুন এ পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইনেরও লঙ্ঘন। এর ফলে বিশ্বের সামনে আমেরিকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। ইউক্রেনে রাশিয়ার এবং তাইওয়ানে চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার পালেও হাওয়া লাগবে।
তবে ট্রাম্পের গাজা দখলের ইচ্ছা পূরণ না হলেও এর প্রতিক্রিয়া হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। আগের মতো হেলাফেলা করে কথা বলতে পারেন না তিনি।
ট্রাম্পের মন্তব্যের জেরে গাজায় ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যেই আরবদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ট্রাম্পের মন্তব্যে ইসরাইল উৎসাহিত হয়ে যুদ্ধচুক্তি লঙ্ঘন করতে পারে। গাজার ভবিষ্যৎ সরকারের অনুপস্থিতি বর্তমান চুক্তির একটি দুর্বলতা। নতুন করে ট্রাম্প ইসরাইলকে আরেকটি হাতিয়ার তুলে দিলেন। ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি উভয়ের মনে তা প্রভাব ফেলেছে।
উগ্র যায়নবাদী ইহুদিরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ট্রাম্পের মন্তব্য থেকে উৎসাহ পাবে। ফলে ভূমধ্যসাগর থেকে জর্ডান নদী পর্যন্ত এবং তারও বাইরে ‘ঈশ্বর প্রদত্ত ভূমির’ দখল নিতে তারা চেষ্টা করবে। মধ্যম ধারার ইহুদিরাও এ পরিকল্পনাকে স্বাগত জানাবে।
হামাসসহ ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠনগুলো ট্রাম্পকে জবাব দিতে শক্তি প্রদর্শনেরও পরিকল্পনা করতে পারে। এতে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা নতুন করে দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে পারেন।
তবে ট্রাম্প গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে যে পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেছেন, তিনিও যে তার বাস্তবায়ন চান তা হয়তো না। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তার বিবৃতিগুলো যেন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর ক্রেতার সঙ্গে দর কষাকষির মতো। হয়তো তিনি এক কথা বলে তার অন্য কোনো পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চান। নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য তার আকাঙ্ক্ষার কথা আগেই জানিয়েছিলেন তিনি।