শত শত বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল, তখন লোহার গেটের ঝনঝন শব্দ ঢোলের বাদ্যের মতো বাজছিল। কয়েক ঘণ্টা আগেও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে যে ব্যারিকেড দাঁড়িয়ে ছিল, তা মুহূর্তেই ধসে পড়ে। সে সময়টা শত জনতার কাদাযুক্ত পদধ্বতিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের করিডোর। কেউ ভাঙচুর করছিল জানালা, কেউবা জিনিসপত্র, কেউ তুলে নিচ্ছে বিছানা-বালিশ; কেউ নিত্যপণ্য বা জুতার মতো সামগ্রী। এ যেন লুটপাটের রাজত্ব চলছিল।
বিলাসবহুল পণ্যে ঠাসা যে বাড়িটি এক সময় ছিল সাধারণ জনগণের নাগালের বাইরে, অপ্রবেশযোগ্য, দুর্ভেদ্য- সেই বাড়িটিই চলে যায় জনগণের দখলে। বিষয়টি সাময়িক হলেও তখনকার জন্য সেটাই ছিল যথোপযুক্ত। আর এ পুরো ঘটনাটি ঘটেছে নেপালে; সময়টি ছিল ৮ সেপ্টেম্বর। এর আগে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশে একই চিত্র দেখা গেছে।
ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত তিন কোটি জনসংখ্যার দেশ নেপাল। দেশটি এখন তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছে এক ভিন্ন পথে, প্রথাগত গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ঐতিহ্যের বাইরে।
দক্ষিণ এশিয়ায় একের পর এক সরকার পতন এবং তরুণদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ আন্দোলন, অর্থাৎ অভ্যুত্থান একটি বিস্তৃত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, আর তা হলো বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল কী জেন-জি বিপ্লবের গ্রাউন্ড জিরো বা সূতিকাগার? এর উত্তর এখন খুঁজে বেড়াচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
ইলিনয়ের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড বলেছেন, জেন-জিদের এমন বিপ্লব অবশ্য খুবই আশ্চর্যজনক। এ অঞ্চলে নতুন এক অস্থিরতার রাজনীতির সূচনা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার প্রায় ১০ হাজার নেপালি তরুণ, যার মধ্যে অনেকেই প্রবাসীÑতারা শারীরিক বা নির্বাচনি ব্যালটের মাধ্যমে নয়, বরং ভিডিও গেইমিং অ্যাপ ডিসকর্ডের একটি অনলাইন জরিপের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। দেশটিতে সরকারের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে জেন-জির নেতৃত্বে রাস্তায় নামে সাধারণ মানুষ। তিনদিনের বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিলে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন। আহত হন এক হাজার ৩০০-এরও বেশি। আন্দোলনের শুরুতে জেন-জিদের অনেকটা ব্যঙ্গ ও কটাক্ষ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা। এক পর্যায়ে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিয়েই ঘোষণা দেয়Ñআগামী মার্চ মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা তরুণ সমাজকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলেছে। স্ট্যানিল্যান্ড বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি একটি নাটকীয় পরিবর্তন। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এর চিত্র একেবারেই ভিন্ন। এখানে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন হয়, রাজনৈতিক সংঘাতের মূল কারণ ভিন্ন হয়; কিন্তু বিপ্লবের মাধ্যমে সরকার পতন হয়নিÑযার সংস্কৃতি এখন শুরু হয়েছে।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপাল- প্রতিটি প্রতিবাদ-আন্দোলনের কারণ ভিন্ন হলেও এর মূল ছিল অভিন্ন আর তা হলো রাষ্ট্রনায়কদের কাছ থেকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও তা ভঙ্গ করা।
নেপাল অভ্যুত্থানের কারণ ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা। কিন্তু এর পেছনের কারণ ছিল অনেক সুগভীর- বৈষম্য, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি। নেপাল এমন একটি দেশ যেখানে প্রবাসী নেপালিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখত।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন ছিল। সেখানে বৈষম্যমূলক চাকরি কোটার বিরুদ্ধে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন প্রচারের মাধ্যমে এটি শুরু হয়েছিল। কিন্তু শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের দমন-পীড়নের ফলে নিহত হন শত শত বেসামরিক নাগরিক। ফলে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান।
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্য ও জ্বালানির ঘাটতি, আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির কারণে জন্ম নেয় ‘আরাগালায়া’আন্দোলন। বিক্ষোভরত তরুণরা দখলে নেন প্রেসিডেন্ট ভবন, সপরিবারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান রাজাপাকসে।
জেন-জিদের সম্পর্কে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিকবিষয়ক অধ্যাপক রুমেলা সেন বলেছেন, এরা শুধু ক্ষুব্ধ নয়, বরং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আন্তরিক।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানী জীবন শর্মা বলেন, এই আন্দোলনগুলো একে অপরকে দেখছে, শিখছে এবং অনুপ্রাণিত করছে। এ বিষয়ে একমত প্রকাশ করেছেন স্ট্যানিল্যান্ডও। তবে এখন প্রশ্ন হলো, এই বিক্ষোভগুলো পরবর্তী সময়ে কোথায় ছড়িয়ে পড়বে?