যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ শুক্রবার নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হচ্ছে। কয়েক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পেন্টাগনকে মহড়াটি ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার’ নির্দেশ দেন। এরপরই চলমান মহড়া মাঝপথে বন্ধের সিদ্ধান্ত আসে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮ হাজার সেনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ১১ মিত্র দেশের সেনারা এবারের মহড়ায় অংশ নিচ্ছিলেন। ট্রাম্প এই মহড়াকে উত্তর কোরিয়ার প্রতি ‘অনুপযুক্ত ও শত্রুতামূলক’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল বলে মন্তব্য করেছেন।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত মিত্রদেরও বিস্মিত করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন এটিকে দুই দেশের পারস্পরিক সমঝোতার ফল হিসেবে তুলে ধরলেও স্বীকার করেছেন, মহড়া কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের কথা দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা আগে থেকে জানতেন না।
মহড়া কেন গুরুত্বপূর্ণ
দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সামরিক মহড়াকে দুই দেশের সামরিক জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। একই সঙ্গে এটি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারেরও প্রকাশ।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষক জো বি-ইউনের মতে, ট্রাম্পের একতরফা ও আকস্মিক সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার আস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
এখন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন প্রায় ২৭ হাজার মার্কিন সেনার সংখ্যাও কমাতে পারে। এমনকি মিত্রদেশটির সঙ্গে পরামর্শ না করেই উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার দীর্ঘদিনের নীতিতেও পরিবর্তন আনতে পারে ওয়াশিংটন।
নিরাপত্তার সঙ্গে বাণিজ্যও জড়াচ্ছে
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, ট্রাম্প প্রশাসন নিরাপত্তা ও বাণিজ্যকে ক্রমেই একই কাঠামোর মধ্যে দেখছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়া অংশ না নেওয়ায় ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য নিয়েও তার অসন্তোষ রয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা রাখার জন্য দেশটির বছরে এক বিলিয়ন ডলারের ব্যয় যথেষ্ট নয়। এ ছাড়া ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দক্ষিণ কোরিয়া গড়িমসি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরামর্শ দিচ্ছেন।
সেজং ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট চেয়ং সিয়ং-চ্যাং মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট বজায় রেখেই দক্ষিণ কোরিয়াকে নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জনের উদ্যোগ নিতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অধিকাংশ মানুষ দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী হিসেবে দেখতে চাইলেও সরকার এত দিন বলে আসছে, এর প্রয়োজন নেই। বরং এতে মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কমে গেলে এই অবস্থান বদলাতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার হুমকি কমেনি
মহড়া শুরুর কয়েক দিন আগে উত্তর কোরিয়া জাপানের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। বৃহস্পতিবারও দেশটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
পিয়ংইয়ং সতর্ক করে বলেছে, হুমকির মুখে পড়লে তারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অধিকার রাখে।
কোরীয় যুদ্ধের পর দুই কোরিয়ার মধ্যে কোনো শান্তিচুক্তি হয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের অবসানও ঘটেনি। উত্তর কোরিয়ার আদর্শে দক্ষিণের সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে ২০২৪ সালে কিম জং আন সেই নীতি পরিত্যাগ করেন।
এর পরও দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে পিয়ংইয়ংয়ের হুমকি অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা
ট্রাম্প এরই মধ্যে বলেছেন, বছরের শেষ দিকে কিম জং আনের সঙ্গে তার বৈঠক হতে পারে। তিনি কিমের সঙ্গে তার ‘দারুণ সম্পর্কের’ কথাও বলেছেন।
বুধবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘সে আমাকে পছন্দ করে।’
তবে কিমের বোন ও উত্তর কোরিয়ার প্রভাবশালী নেতা কিম ইয়ো জং বলেছেন, সম্প্রতি তার ভাই ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন—এমন দাবি সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।
তিনি আরো বলেছেন, উত্তর কোরিয়া কখনোই তার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করবে না।
তার দাবি, এসব অস্ত্র আঞ্চলিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা জোরদার করে।
সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তকেও গুরুত্ব দেয়নি পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে কিম ইয়ো জংয়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, মহড়া কমানো উত্তর কোরিয়ার আগ্রহ বা মন্তব্য পাওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়।
অতীতেও মহড়া বন্ধ করেছিলেন ট্রাম্প
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়া নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত দেখা গিয়েছিল।
২০১৮ সালে ট্রাম্প ও কিম জং উনের প্রথম বৈঠকের পর দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া স্থগিতের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। পরের বছর দ্বিতীয় বৈঠকে কোনো চুক্তি ছাড়াই বেরিয়ে আসেন তিনি। কিম তার পুরো পারমাণবিক স্থাপনা পরিত্যাগ করতে রাজি না হওয়ায় ওই আলোচনা ব্যর্থ হয়।
পরে ২০১৯ সালে পানমুনজমে সংক্ষিপ্ত একটি বৈঠক ছাড়া দুই নেতা আর কোনো অর্থবহ আলোচনায় বসেননি।
এদিকে শীর্ষ বৈঠকের পর উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির বড় চাপ সামলাতে হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াকে। পিয়ংইয়ং দক্ষিণ কোরিয়ার লিয়াজোঁ কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেয় এবং দুই দেশের সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধের ঘোষণা দেয়।
কিমের হাতে এখন বাড়তি সুবিধা?
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক মহড়া কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত উত্তর কোরিয়াকে আরো দাবির সুযোগ করে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি চীনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছাড়। কারণ বেইজিংও যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার এসব সামরিক মহড়াকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে।
ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, উত্তর কোরিয়া কোনো হুমকি নয়। তবে দেশটি সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো থামায়নি। তারা ছয়বার পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পারমাণবিক অস্ত্র বহনের সক্ষমতাও অর্জন করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার অংশগ্রহণও তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। দেশটি রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ কামানের গোলা ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে এবং ধারণা করা হয়, অন্তত ১৩ হাজার সেনা পাঠিয়েছে।
যুদ্ধে অনেক সেনা হতাহত হলেও উত্তর কোরিয়ার সেনারা ড্রোন পরিচালনা ও ব্যবহারে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
জো বি-ইউনের মতে, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণ কোরিয়ার এককভাবে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক জোট দেশটির জন্য এখন ‘জীবন-মরণের বিষয়’।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম