মানবঘটিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে বিশ্বের মহাসাগরগুলো ‘‘তীব্র এবং দ্রুত বর্ধনশীল’’ চাপের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা উল্লেখ করে জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, গত এক দশকের তুলনায় বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ হয়েছে।
বিশ্ব মহাসাগর দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত জাতিসংঘের তৃতীয় 'ওয়ার্ল্ড ওশেন অ্যাসেসমেন্ট' (বিশ্ব মহাসাগর মূল্যায়ন) প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, দূষণ এবং ব্যাপক মাত্রায় শিল্পভিত্তিক মৎস্য শিকারের মতো ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক প্রভাবগুলোর কারণে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে এবং সামগ্রিক মহাসাগরীয় ব্যবস্থা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।
৮৬টি দেশের প্রায় ৬০০ জন বিজ্ঞানীর ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চালানো গবেষণার ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এর আগের প্রতিবেদনটিতে (যা ২০১৮ সাল পর্যন্ত তথ্য কভার করেছিল) সামুদ্রিক পরিবেশের ক্রমাগত অবক্ষয়ের কথা বলা হয়েছিল। তবে এবারের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত কয়েক বছরে ক্ষতির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
বিজ্ঞানীদের মূল তথ্য ও পরিসংখ্যান
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি: ২০১৫ সালের আগে যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর ২ মিলিমিটার করে বাড়ত, ২০২৩ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে প্রতি বছর ৪.৩ মিলিমিটারে দাঁড়িয়েছে।
মহাসাগরের তাপমাত্রা: ১৯৫৫ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে মহাসাগরের তাপমাত্রা এতটা বেড়েছে, তার ১৬% বৃদ্ধি পেয়েছে কেবল ২০১৮ সালের পরবর্তী সময়ে।
অধিক উষ্ণ অঞ্চল: আটলান্টিক মহাসাগর এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে।
অজানা সমুদ্রপৃষ্ঠ: ২০২৫ সাল পর্যন্ত সমুদ্র তলদেশের মাত্র ২৭% মানচিত্রায়ণ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে এখনও আমাদের জ্ঞানের বড় ঘাটতি রয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পরিস্থিতির তীব্রতা তুলে ধরে বলেন:
"আমরা মহাসাগরকে সীমাহীন ভাবার ভুলটি আর করতে পারি না। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় এখন জরুরি বৈশ্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের সমুদ্রের সাথে একটি নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যা বিজ্ঞানভিত্তিক, আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা পরিচালিত এবং যা দেশ, খাত ও প্রজন্মের যৌথ দায়িত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত।"
সুরক্ষার অগ্রগতি বনাম খণ্ডিত শাসন ব্যবস্থা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহাসাগর সুরক্ষায় কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে। বিশেষ করে এই বছর কার্যকর হওয়া ঐতিহাসিক 'হাই সিস ট্রিটি' (উন্মুক্ত সমুদ্র চুক্তি) আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রেখেছে, যা কোনো দেশের সীমানার বাইরে থাকা মহাসাগরের দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চলকে সুরক্ষা দেবে।
তবে এই চুক্তি এবং অন্যান্য ৫৬টি মহাসাগর সুরক্ষা চুক্তি থাকা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক শাসন ব্যবস্থা এখনও আঞ্চলিক ও খাতভিত্তিক উপায়ে "খণ্ডিত" রয়ে গেছে। ফলে এই সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।
পৃথিবীর ৭০ শতাংশেরও বেশি এলাকা জুড়ে থাকা মহাসাগর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মানুষের জন্য খাদ্য, খনিজ ও শক্তির জোগান দিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন অতিরিক্ত তাপের ৯০% এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের ৩০% ইতিমধ্যেই মহাসাগর শোষণ করে নিয়েছে।
প্লাস্টিক দূষণ ও অন্যান্য কারণ
প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর ৫ কোটি ২১ লাখ টন প্লাস্টিক মহাসাগরে গিয়ে পড়ছে। এর ফলে ২৪.৪ ট্রিলিয়ন মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ৪,০০০-এরও বেশি সামুদ্রিক প্রজাতির জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে।
গবেষক দলের যৌথ সমন্বয়কারী রাফায়েল গঞ্জালেজ-কুইরোজ বলেন, একটি সুস্থ ও স্থিতিস্থাপক মহাসাগরের প্রয়োজনীয়তা এখনকার মতো এত জরুরি আর কখনোই ছিল না।
সামুদ্রিক পরিবেশের এই বিপর্যয়ের পেছনে মূল কারণ হিসেবে মানুষের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করা হয়েছে। ২০১৭ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা যেখানে ৭.৭ বিলিয়ন ছিল, ২০২৪ সালের শেষের দিকে তা বেড়ে ৮.২ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ উপকূলের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে বাস করে এবং ১১% মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ মিটারেরও কম উচ্চতার জমিতে বসবাস করছে, যা তাদের চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।
গ্রিনপিস-এর হুঁশিয়ারি
পরিবেশবাদী সংগঠন 'গ্রিনপিস' জানিয়েছে, এই প্রতিবেদনটি বিশ্বনেতাদের জন্য একটি "জরুরি সতর্কবার্তা"। গভীর সমুদ্রে খনি খনন এবং শিল্পভিত্তিক মৎস্য শিকারের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে সমুদ্রকে রক্ষা করার জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
গ্রিনপিস-এর বৈশ্বিক মহাসাগর প্রচারক লুকাস মেউস বলেন, "আমরা সরকারের কাছে এমন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত সামুদ্রিক অভয়ারণ্য গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি যেখানে মানুষের সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৩০% মহাসাগর রক্ষা করার যে প্রতিশ্রুতি সরকারগুলো দিয়েছিল—বিজ্ঞানীদের মতে সমুদ্রকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সেটিই সর্বনিম্ন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।"
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এসআর