নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন
তুর্কমেনিস্তানের দারভাজা এলাকায় ঊষর মরুভূমির মাঝে রয়েছে একটি বিশাল গর্ত। ফুটবল মাঠের আকারের সেই গর্তে দিনরাত জ্বলছে আগুন। দারভাজা গ্যাস ক্র্যাটার নামের এই স্থান ‘নরকের দরজা’ নামে পরিচিত। পর্যটকদের কাছে স্থানটি বেশ জনপ্রিয়।
এই ক্রেটারটি কয়েক দশক ধরে জ্বলছে। বছরের পর বছর ধরে এটি দুঃসাহসী পর্যটকদের জন্য এক অদ্ভুত আকর্ষণ এবং বিজ্ঞানী ও গবেষকদের জন্য এক ধাঁধায় পরিণত হয়েছে।
কিন্তু এই ‘নরকের দরজা’র আগুন নিভে যেতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বছর সংগৃহীত ইনফ্রারেড ইমেজিং ডেটা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রাকৃতিক গ্যাসের এই ক্রেটারের ভেতরের আগুন কমে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের শিখা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ক্যাপটেরিওর বিশ্লেষণ অনুসারে, গত তিন বছরে আগুনের শিখার তাপের তীব্রতা ৭৫ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে।
খবরটি সুখবর হওয়ার কথা ছিল। তুর্কমেনিস্তানের সরকার পরিবেশগত ক্ষতি এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বহুদিন ধরেই এই আগুন নিভিয়ে ফেলার কথা বলে আসছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, ব্যাপারটা অতটাও সহজ নয়।
এর উৎপত্তি রহস্যময়। স্থানীয় লোককথা অনুসারে, ১৯৬০ বা ১৯৭০-এর দশকে সোভিয়েত ভূতাত্ত্বিকেরা কারাকুম মরুভূমিতে তেল অনুসন্ধানের জন্য খনন করার সময় একটি প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডারের সন্ধান পান। মাটি ধসে পড়ে সেখানে একটি বিশাল গর্ত তৈরি হয়। বিষাক্ত ধোঁয়ার নির্গমন কমাতে ভূতাত্ত্বিকেরা সেই ফাটলে আগুন ধরিয়ে দেন।
তারা ভেবেছিলেন আগুন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিভে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশখাবাদ থেকে প্রায় চার ঘণ্টার পথ দূরে অবস্থিত এই স্থান দীর্ঘদিন ধরে রোমাঞ্চপ্রেমীদের আকর্ষণ করে আসছে। দর্শনার্থীরা গর্তটির এত কাছে যেতে পারেন যে, এর ভেতরে জ্বলতে থাকা ছোট ছোট শিখা থেকে আসা উত্তাপের ঝলক তারা অনুভব করেন।
তুর্কমেনিস্তান বলছে, তারা গর্তটি থেকে নির্গত গ্যাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। শিল্পগোষ্ঠী তুর্কমেন এনার্জি ফোরামের একটি প্রকাশনায় বলা হয়, সরকার প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের জন্য ২০২৪ সালে জ্বালামুখের কাছে দুটি কূপ খনন করে। এই কূপকে আগুনের শিখা হ্রাসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা।
কিন্তু পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ক্যাপটেরিও বলছে, তাদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কূপগুলো খননের আগেই আগুনের শিখা ম্লান হতে শুরু করেছিল। আগুন কমে যাওয়ার পেছনে কোনো প্রাকৃতিক কারণ ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
জ্বালামুখটি নিয়ে উদ্বেগের একটি কারণ হলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন। ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনাভিত্তিক একটি অলাভজনক সংস্থা কার্বন ম্যাপারের তথ্য থেকে দেখা যায় যে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জ্বালামুখটি প্রতি ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোগ্রাম মিথেন গ্যাস নির্গমন করেছে। কার্বন ম্যাপারের বিজ্ঞানবিষয়ক পরিচালক ড্যানিয়েল কাসওয়ার্থ বলেন, এই পরিমাণ বেশ উল্লেখযোগ্য, যদিও কোনো কোনো বড় তেল ও গ্যাসক্ষেত্র থেকে নির্গত গ্যাসের তুলনায় অনেক কম।
জ্বালামুখের আগুন মিথেনকে কার্বন ডাই-অক্সাইডে রূপান্তরিত করে। ক্যাপটেরিওর প্রধান নির্বাহী মার্ক ডেভিস বলেন, এটি পৃথিবীর জন্য ভালো, কারণ স্বল্প মেয়াদে জলবায়ু উষ্ণায়নে কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে মিথেন অনেক বেশি ভূমিকা রাখে। নরকের দরজার আগুন মিথেনকে তার অপরিশোধিত রূপে নির্গত হতে বাধা দেয়।
তবে আপাতত, আগুনের শিখা ছোট হলেও পৃথিবীর জন্য তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না-ও হতে পারে। ড. কাসওয়ার্থ বলেন, যেহেতু মিথেন অত্যন্ত দাহ্য, তাই এই আগুন শিগ্গিরই পুরোপুরি নিভে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
আরএ