ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার প্রবণতা বাড়ায় এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে—বহুল আলোচিত এই পর্যবেক্ষণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ক্ষমতা অপরিহার্য। পরিচালনা পর্ষদের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্তৃত্ব প্রয়োজন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সম্পদ বণ্টনের ক্ষমতা প্রয়োজন এবং ব্যবস্থাপকদের নিজ নিজ দল পরিচালনার জন্য যথেষ্ট কর্তৃত্ব প্রয়োজন। কিন্তু ক্ষমতা যখন অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত, নিয়ন্ত্রণহীন কিংবা জবাবদিহিবিহীনভাবে প্রয়োগ করা হয়, তখন তা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের বিচারবোধ, নৈতিকতা, সুশাসন এবং শেষ পর্যন্ত পুরো প্রতিষ্ঠানকেই দুর্বল করে দিতে পারে।
তবে ক্ষমতা পাওয়া মাত্রই সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন—বিষয়টি এমন নয়। বরং নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে অনিয়ম করা সহজ হয়, তা আড়াল করা সম্ভব হয় এবং অন্যদের পক্ষে সেই আচরণকে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একজন ব্যক্তির কর্তৃত্ব যত বাড়ে এবং তাকে ঘিরে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যত দুর্বল হয়, ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও তত বাড়ে।
প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুশাসন-ঝুঁকি হলো একজন ব্যক্তি বা ছোট একটি গোষ্ঠীর হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, প্রভাবশালী শেয়ারহোল্ডার, চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা পরিবারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কোনো সদস্য যখন গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন, তখন প্রাথমিক পর্যায়ে এই কেন্দ্রীকরণকে কার্যকর মনে হতে পারে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়ানো যায় এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত দিকনির্দেশ তৈরি করা সম্ভব হয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই একই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ গুরুতর দুর্বলতা তৈরি করতে পারে। একজন ব্যক্তি অতিরিক্ত ক্ষমতাবান হয়ে উঠলে অন্যরা তার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে অনাগ্রহী হয়ে পড়তে পারেন। পরিচালকেরা প্রধান নির্বাহীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপকেরা নেতাকে এমন কথা বলতে পারেন, যা তিনি শুনতে চান; তার জানা প্রয়োজন এমন কথা নয়। কর্মীরা প্রশ্নবিদ্ধ কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করতে পারেন। ফলে এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, যেখানে কর্তৃত্ব জবাবদিহির চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ক্ষমতা আচরণ পরিবর্তন করতে পারে
ক্ষমতা ধীরে ধীরে একজন ব্যক্তির নিজের এবং অন্যদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে। কোনো সফল নির্বাহী মনে করতে পারেন, অতীতের সাফল্যই প্রমাণ করে যে প্রতিটি পরিস্থিতিতে তার বিচারবোধ অন্যদের চেয়ে উন্নত। আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে অহংকারে রূপ নিতে পারে এবং শক্তিশালী নেতৃত্ব কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বে পরিণত হতে পারে।
একজন ক্ষমতাবান নির্বাহী এমন ধারণাও পোষণ করতে পারেন যে নিয়ম অন্যদের জন্য প্রযোজ্য হলেও তার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। তখন প্রতিষ্ঠানের অর্থ বা সম্পদকে ব্যক্তিগত সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা, স্বার্থের সংঘাত উপেক্ষা করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেনে যথাযথ যাচাই না করা কিংবা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের মতো আচরণের সুযোগ তৈরি হয়।
বিপদ হলো, অনিয়ম সাধারণত বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতি দিয়ে শুরু হয় না। একটি অস্বাভাবিক ব্যয় অনুমোদন, ক্রয়সংক্রান্ত কোনো নিয়ম পাশ কাটানো, কোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে উপেক্ষা করা কিংবা কর্মীদের প্রতিকূল তথ্য গোপন করতে বলা—এ ধরনের ছোট ব্যতিক্রম দিয়েই শুরু হতে পারে।
এসব আচরণ যদি সহ্য করা হয়, তাহলে ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্য আচরণের সীমারেখা বদলে যেতে থাকে। যে কাজটি একসময় ব্যতিক্রম ছিল, পরবর্তী সময়ে সেটিই স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হতে পারে।
নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চ্যালেঞ্জের সুযোগ নষ্ট করে
অতিরিক্ত ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো গঠনমূলক প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জের পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাওয়া। ভালো করপোরেট সুশাসনের জন্য পরিচালকদের অনুমানকে প্রশ্ন করা, ঝুঁকি পরীক্ষা করা এবং সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা প্রয়োজন। একটি সুস্থ পরিচালনা পর্ষদ ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব শুধু অনুমোদন করে না; বরং কঠিন প্রশ্নও করে।
কিন্তু কোনো প্রভাবশালী নির্বাহী যদি তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, পরিচালনা পর্ষদের নিয়োগে প্রভাব বিস্তার করেন কিংবা ভিন্নমত পোষণকারীদের ভয় দেখান, তাহলে স্বাধীন প্রশ্ন করার পরিবেশ বিলীন হতে পারে। বোর্ডের সভা তখন প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে পারে।
এখান থেকেই গ্রুপথিংকের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরিচালকেরা মনে করতে পারেন, প্রভাবশালী নেতাকে চ্যালেঞ্জ করার চেয়ে তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করাই নিরাপদ। শেষ পর্যন্ত সবাই একমত হন—কিন্তু প্রকৃত অর্থে কেউ স্বাধীনভাবে চিন্তা করেন না।
অনেক করপোরেট ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সমস্যা তথ্যের অনুপস্থিতি নয়। প্রয়োজনীয় তথ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই থাকতে পারে; কিন্তু সেই তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে প্রশ্ন করার মতো কেউ হয়তো থাকেন না।
ক্ষমতা ও আর্থিক কারসাজি
অতিরিক্ত ক্ষমতা এবং আর্থিক অনিয়মের সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ, শেয়ারের মূল্য ধরে রাখা কিংবা প্রবৃদ্ধি দেখানোর চাপের মধ্যে থাকা নির্বাহীরা হিসাবের বিভিন্ন অনুমান পরিবর্তন, আয় আগেভাগে দেখানো, ব্যয় পরবর্তী সময়ে দেখানো কিংবা দায় গোপন করার মতো অনিয়মে জড়িয়ে পড়তে পারেন। প্রধান নির্বাহী যদি প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে থাকেন, তাহলে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা ও নিরীক্ষকদের জন্য ব্যবস্থাপনার চাপ প্রতিহত করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এর ফলে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে, যেখানে আর্থিক প্রতিবেদন শেয়ারহোল্ডারদের কাছে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরার পরিবর্তে ব্যবস্থাপনার সুনাম রক্ষার একটি উপকরণে পরিণত হয়। এ কারণেই কার্যকর অডিট কমিটি, স্বাধীন পরিচালক এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ব্যবস্থাপনার ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত কিছু স্তরের প্রশ্ন, পরীক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা
নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে পরিচালনা পর্ষদ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা। বিশেষ করে কোনো সিদ্ধান্তে বড় ধরনের আর্থিক, কৌশলগত কিংবা প্রতিষ্ঠানের সুনামের ঝুঁকি থাকলে পরিচালকদের ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্ন করার মানসিকতা থাকতে হবে।
এর জন্য শুধু আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রকৃত স্বাধীনতা।
কোনো পরিচালককে স্বাধীন পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হলেও তিনি যদি ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্ন করতে অনিচ্ছুক হন, তাহলে তিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য খুব বেশি সুরক্ষা দিতে পারেন না। একইভাবে একটি বোর্ড কাগজে-কলমে দক্ষ ও অভিজ্ঞ হলেও যদি পরিচালকরা ব্যবস্থাপনার দেওয়া তথ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হন কিংবা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, তাহলে বোর্ড কার্যকর থাকে না।
তাই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে মতভেদ গ্রহণযোগ্য। কোনো পরিচালক কঠিন প্রশ্ন করলেই তাকে অবিশ্বস্ত বা নেতৃত্ববিরোধী হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং গঠনমূলক মতভেদই পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম মূল্যবান অবদান হতে পারে।
নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োজন, তবে সাংগঠনিক সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ
অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্বের পৃথকীকরণ, অনুমোদনের সীমা, হুইসেলব্লোয়িং বা অনিয়ম জানানোর ব্যবস্থা এবং নিরীক্ষা ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু শুধু নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি যদি এমন হয় যে ফলাফল যেভাবেই অর্জিত হোক না কেন, শুধু ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে কর্মীরা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর পথ খুঁজে নিতে পারেন। আবার শীর্ষ নির্বাহীরা নিয়মিতভাবে নিজেরাই যদি প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অমান্য করেন, তাহলে কর্মীরা দ্রুত বুঝে যাবেন যে নীতিমালা বাস্তবে বাধ্যতামূলক নয়। তাই সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ হলো নৈতিক নেতৃত্ব, স্বাধীন তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহির সমন্বয়।
এ ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতৃত্বের আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মীরা নেতারা কী বলেন শুধু সেটি দেখেন না; নেতারা বাস্তবে কী করেন, সেটিও দেখেন। নেতৃত্ব যদি নিয়ম ও নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তাহলে তার প্রভাব পুরো প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। বিপরীতে নেতৃত্ব যদি নিয়মকে নিজের জন্য ঐচ্ছিক মনে করে, তাহলে একই সংস্কৃতি নিচের স্তরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সাফল্যের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে ঝুঁকি
বিস্ময়কর হলেও সত্য, সফল প্রতিষ্ঠানও ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কোনো নেতা যদি অসাধারণ প্রবৃদ্ধি বা সাফল্য এনে দেন, তাহলে তার প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। পরিচালনা পর্ষদ এমন একজন ব্যক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে দ্বিধা করতে পারে, যাকে প্রতিষ্ঠানের জন্য অপরিহার্য মনে করা হয়।
ফলে অতীতের সাফল্য ভবিষ্যতের ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠতে পারে। এখানে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু ‘এই ব্যক্তি কি সফল?’—তা নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘এই ব্যক্তির বিচার ভুল হলে কী হবে এবং তাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কার আছে?’ কোনো ব্যক্তি যতই প্রতিভাবান বা সফল হন না কেন, তাকে প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষার জন্য তৈরি সুশাসনব্যবস্থার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা উচিত নয়।
প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখার মূল শিক্ষা হলো, ক্ষমতা প্রয়োজনীয়; কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। নেতৃত্ব প্রয়োজনীয়; কিন্তু নেতৃত্বকে প্রশ্ন করার সুযোগও থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজনীয়; কিন্তু সিদ্ধান্তের স্বাধীন যাচাইও প্রয়োজন।
অতএব, একটি প্রতিষ্ঠানের শক্তি শুধু তার নেতার ক্ষমতার মধ্যে নিহিত নয়। বরং প্রকৃত শক্তি নিহিত এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে, যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহি, নেতৃত্বের সঙ্গে স্বাধীন তদারকি এবং সিদ্ধান্তের সঙ্গে গঠনমূলক প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে। কারণ কোনো ব্যক্তি, তিনি যতই সফল বা প্রভাবশালী হোন না কেন, প্রতিষ্ঠানের সুশাসনব্যবস্থার ঊর্ধ্বে উঠে গেলে সেই ক্ষমতাই একসময় প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
সূত্র: নিউ স্ট্রেইটস টাইমস