নেপালের বন্যাকবলিত রাসুয়া জেলার ১৬ বছর বয়সি সামির তামাং যখন স্কুলে পৌঁছান, তখন ভোতেকোশি নদী ভয়ংকর রূপ নিয়ে চারপাশে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যে বন্যার পানিতে ভেসে যায় তার বাড়ি। নিখোঁজ হয়ে যায় তার দুই বোনও।
লাহারেপাউয়ার শিবালয়া বেসিক স্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা সামির বলেন, ‘আমার ছোট বোনের হাতে আঘাত ছিল। সে স্কুলে যেতে পারছিল না। তাই তাকে দেখাশোনা করতে আমার বড় বোনও বাড়িতে থেকে যায়।’
বন্যা আঘাত হানার সময় সামির স্কুলেই ছিলেন। তার ১৩ বছর বয়সী বোন প্রিয়া এবং ৭ বছর বয়সী বোন পার্বতী তখন বাড়িতে ছিল। বন্যার খবর পাওয়ার পর জীবন বাঁচাতে স্কুল থেকে ছুটে বেরিয়ে যান নীলকণ্ঠ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী। কিন্তু এরপর থেকে তাঁর দুই বোনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম একান্তিপুর।
সামির বলেন, ‘এখন আমি কী করব, বুঝতে পারছি না। আমার বোনেরা আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। এক মুহূর্তে বন্যা তাদের আমার কাছ থেকে কেড়ে নিল।’
বন্যায় সামিরদের বাড়িটিও ভেসে গেছে। তার বাবা সূর্য প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তাঁর মা ছেসাং বর্তমানে কুয়েতে কর্মরত।
সামিরের মতো রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার শত শত শিশু এখন বিভিন্ন ত্রাণ ও আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছে। ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যার পর এসব শিশু সেখানে আশ্রয় নিয়েছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে বরফ ও পাথরের ধস থেকে ২৬ আগস্ট আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে দেশটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন শহর ও গ্রাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হিমালয় সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত ভোতেকোশি নদী বন্যার পানি নিচের দিকে বহন করে নিয়ে যায়। এতে বাড়িঘর, যানবাহন, সড়ক ও সেতু ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই দুর্যোগে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর বন্যায় রাসুয়া, নুয়াকোট ও আশপাশের এলাকার হাজারো শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের অনেকে বাবা-মা ও স্বজন হারিয়েছে, আবার অনেক শিশু পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২৫০ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এখনো নিখোঁজ বা যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন। আর ইউনিসেফ জানিয়েছে, বন্যায় প্রায় ১৭ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্বজন হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের অনেকেই বাবা-মাকে হারিয়েছে। অনেকের আর ফিরে যাওয়ার মতো বাড়িও নেই।
তাদেরই একজন রাসুয়ার কালিকা গ্রামীণ পৌরসভার কালিকা হিমালয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাঞ্জু তামাং। ভয়াবহ বন্যায় তিনি তাঁর মা, ভাই ও ভাগনেকে হারিয়েছেন।
পাঁচ বছর আগে বাবা বুদ্ধিমানকে হারিয়েছিলেন রাঞ্জু। এবার বন্যায় মারা গেছেন তাঁর মা শুভমায়াও। বন্যার সময় শুভমায়া এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন।
তবে শুধু তাঁর মায়েরই নয়, বড় ভাই সূর্যমান, ভাগনে জ্ঞান বাহাদুর, খালা থারমেন্দো, মামা জ্ঞান বাহাদুর এবং মামার এক বছর বয়সী ছেলে প্রবীনেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
স্কুলে হঠাৎ বন্যা, প্রাণ বাঁচাতে বনে ছুটল শিশুরা
রাসুয়ার খালতে এলাকার ১৪ বছর বয়সী আকাশ তামাংও বন্যার ভয়াবহতার প্রত্যক্ষদর্শী। ত্রিশূলী নদীর পানি বাড়তে শুরু করার আগে তিনি উত্তরগয়া পাবলিক স্কুলে পৌঁছেছিলেন।
স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল আকাশ। হঠাৎ বিকট শব্দে বন্যার পানি এগিয়ে আসতে দেখে স্কুলজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় হুড়োহুড়ি ও ছোটাছুটি।
আকাশ বলেন, ‘আমরা বনের দিকে দৌড়ে গিয়েছিলাম। তা না হলে কীভাবে বেঁচে থাকতাম!’
বর্তমানে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা আকাশ জানান, অন্য একটি স্কুলে পড়া তাঁর ভাইবোনরাও বন্যা থেকে রক্ষা পায়নি। ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর থেকে তাঁর ৮ বছর বয়সী ভাই অশ্বিন এবং ১১ বছর বয়সী বোন অনিশা নিখোঁজ। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যার কারণে ২৫০ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এখনো যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন। এর মধ্যে ২৩০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১৩ জন নিখোঁজ বা যোগাযোগের বাইরে এবং ১৭ জন বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।
এ ছাড়া যোগাযোগের বাইরে থাকা ১৯ শিক্ষকের মধ্যে ১০ জন বন্যায় ভেসে গেছেন এবং একজন শিক্ষকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা বীর বাহাদুর ধামি জানান, দুর্যোগকবলিত এলাকায় ২৩টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে নুয়াকোটে ৮টি, রাসুয়ায় ৭টি এবং বাকি স্কুলগুলো ধাদিংসহ অন্যান্য জেলায় অবস্থিত।
সূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া, দ্য কাঠমুন্ডু পোস্ট
এমএমআর