পারমাণবিক যুদ্ধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষতিকর ব্যবহার একুশ শতকের শেষ নাগাদ মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে দ্য ল্যানসেট কমিশন অন টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ। কমিশনের নতুন মূল্যায়নে ২০২৫ থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত মানবস্বাস্থ্য ও টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ১৭টি বৈশ্বিক হুমকি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে পারমাণবিক সংঘাত ও এআইয়ের অপব্যবহারকে এমন দুটি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোর চরম পরিণতি মানবজাতির বিলুপ্তি পর্যন্ত গড়াতে পারে।
কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, পারমাণবিক সংঘাত ও এআইয়ের ক্ষতিকর ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হলেও এর সম্ভাব্য পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। তাই বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে আগেভাগে ঝুঁকি কমানো, প্রস্তুতি নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পারমাণবিক যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে
পারমাণবিক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি শুধু বিস্ফোরণস্থলের প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ব্যাপক পারমাণবিক সংঘাতের ফলে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও কণিকা ছড়িয়ে সূর্যালোক বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাবে তাপমাত্রা কমে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়া এবং ব্যাপক দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি ‘পারমাণবিক শীত’ নামে পরিচিত।
এর প্রভাব যুদ্ধরত দেশগুলোর সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। খাদ্য উৎপাদন হ্রাস, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, স্বাস্থ্যসেবার সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা একে অন্যকে আরো তীব্র করে তুলতে পারে।
কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পারমাণবিক সংঘাত প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ২১০০ সালের মধ্যে আনুমানিক ১৩ কোটি ৩০ লাখ মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে অসুস্থতা, প্রতিবন্ধিতা ও অকালমৃত্যুর কারণে হারিয়ে যাওয়া সুস্থ জীবনের বিপুল সময়ও রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। এ সংখ্যাগুলো মডেলভিত্তিক অনুমান, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ফলাফল নয়।
এআইয়ের অপব্যবহারে নতুন ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা ও উৎপাদনব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু প্রযুক্তিটির ক্ষতিকর ব্যবহার মানবজাতির জন্য নতুন ধরনের বিপদ সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে কমিশন।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, এআইয়ের সহায়তায় বিপজ্জনক জীবাণু বা জৈব অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারের সম্ভাবনা। এ ধরনের প্রযুক্তি ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়া এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া মহামারির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় এআইনির্ভর ব্যবস্থার ব্যর্থতা, নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সংকটের সময় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এআইয়ের সব ব্যবহারকে বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। যথাযথ নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এ প্রযুক্তি রোগ শনাক্তকরণ, ওষুধ উদ্ভাবন, দুর্যোগের পূর্বাভাস এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এর অপব্যবহার প্রতিরোধে কার্যকর নিয়মকানুন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা।
কমিশনের হিসাবে, এআইয়ের ক্ষতিকর ব্যবহার কমানোর কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে ২১০০ সালের মধ্যে আনুমানিক ১০৪০ কোটি DALYs-এর ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে। এ সংখ্যাটিও একটি মডেলভিত্তিক হিসাব, নিশ্চিতভাবে এ পরিমাণ ক্ষতি ঘটবে—এমন পূর্বাভাস নয়।
১৭টি বড় হুমকি চিহ্নিত
কমিশনের মূল্যায়নে পারমাণবিক সংঘাত ও এআইয়ের ক্ষতিকর ব্যবহারের পাশাপাশি আরও ১৫টি বড় হুমকি চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো— ১. বায়ুদূষণ ২. অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি ৩. শিশুদের অপুষ্টি ৪. জলবায়ু পরিবর্তন ৫. প্রচলিত যুদ্ধ ও সংঘাত ৬. স্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা হ্রাস ৭. অতিরিক্ত মদ্যপান ৮. উচ্চ রক্তচাপ ৯. আয়বৈষম্য ১০. শিক্ষাগত অর্জনের নিম্নমান ১১. প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট মহামারি ১২. স্থূলতা ১৩. মানসিক স্বাস্থ্যসংকট ১৪. ধূমপান ১৫. অস্বাস্থ্যকর বার্ধক্য। কমিশনের মতে, এসব হুমকি শুধু স্বাস্থ্যক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বিপুল সুস্থ জীবনবর্ষ হারানোর আশঙ্কা
জলবায়ু পরিবর্তনকে কমিশন এমন একটি সংকট হিসেবে বিবেচনা করেছে, যা সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি অন্যান্য বিপদের প্রভাবও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাপপ্রবাহ, বন্যা, দাবানল, পানির সংকট ও কৃষি উৎপাদন হ্রাস খাদ্যনিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।
কমিশনের মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পরিবর্তে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা গেলে ২১০০ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৮৯ কোটি সুস্থ জীবনবর্ষের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে। এ হিসাবের মধ্যে তীব্র তাপ ও বায়ুদূষণের মতো পরিমাপযোগ্য প্রত্যক্ষ প্রভাব গুরুত্ব পেয়েছে। বাস্তুচ্যুতি, খরা ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো আরো কিছু প্রভাবের পূর্ণ হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
এখানে ‘সুস্থ জীবনবর্ষ’ বলতে মৃত্যুর সংখ্যা বোঝায় না। অসুস্থতা, প্রতিবন্ধিতা ও অকালমৃত্যুর কারণে মানুষের যে পরিমাণ সুস্থ জীবন হারিয়ে যায়, তার সম্মিলিত পরিমাপকে DALYs বা ‘ডিজঅ্যাবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স’ বলা হয়।
স্বাস্থ্যসহায়তা কমলে চাপে পড়বে দরিদ্র দেশগুলো
স্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়াকেও বড় বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিশন। দরিদ্র ও স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত সক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলো টিকাদান, মাতৃ ও শিশুসেবা, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসহায়তা ব্যাপকভাবে কমে গেলে বা ভেঙে পড়লে ২১০০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি DALYs-এর ক্ষতি হতে পারে বলে কমিশনের মূল্যায়নে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এর প্রায় ৭০ শতাংশ সাব-সাহারান আফ্রিকায় ঘটতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। এটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির হিসাব; নিশ্চিত ক্ষয়ক্ষতির পূর্বাভাস নয়।
স্বাস্থ্যসহায়তা হ্রাসের প্রভাব অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ, চিকিৎসাসেবায় অসম প্রবেশাধিকার এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে আরও তীব্র হতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
সংকটগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত
কমিশনের মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ১৭টি হুমকিকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখলে কার্যকর সমাধান পাওয়া কঠিন। যুদ্ধ খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করতে পারে; জলবায়ু পরিবর্তন অপুষ্টি ও বাস্তুচ্যুতি বাড়াতে পারে; আবার মহামারি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাস স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এ কারণে কমিশন তিনটি প্রধান করণীয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে: সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যুগান্তকারী প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন ঝুঁকি শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা শক্তিশালী করা।
মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বর্তমান সিদ্ধান্তের ওপর
কমিশনের মূল্যায়ন মানবজাতির বিলুপ্তি সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বরং এটি সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ঝুঁকি, তার প্রভাব এবং প্রতিরোধের সুযোগ সম্পর্কে একটি বৈশ্বিক মূল্যায়ন। পারমাণবিক সংঘাত ও এআইয়ের অপব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও সম্ভাব্য পরিণতির ব্যাপকতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধ, এআইয়ের নিরাপদ ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মহামারির প্রস্তুতি, পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ—এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ভবিষ্যৎ ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
মানবজাতির সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু ২১০০ সালে কী ঘটতে পারে, তা নয়; বরং বর্তমান প্রজন্মের রাষ্ট্রনেতা, নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটিই ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য ল্যানসেট কমিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি