আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের সাম্প্রতিক উত্তেজনায় তেল সরবরাহে নতুন করে বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বুধবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট নর্থ সি ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। চলতি শতাব্দীতে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও মহামারির মতো নানা ঘটনায় তেলের বাজারে বড় ধরনের উত্থান-পতন দেখা গেছে।
২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পরপরই তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। এপ্রিলের শেষ দিকে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১২৬ দশমিক ৪১ ডলারে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেলচুক্তি ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দাম মার্চের শুরুতে সর্বোচ্চ ১১৯ দশমিক ৪৮ ডলারে পৌঁছায়।
পরবর্তী সময়ে সংঘাত প্রশমনের আশা, চীনের দুর্বল চাহিদা এবং বিভিন্ন দেশের কৌশলগত তেল মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার কারণে জুনে দাম কমে আসে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সংঘাত বন্ধের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রার নিচেও নেমে যায়। তবে আগস্টের শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় ব্রেন্টের দাম আবার ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে এবং ডব্লিউটিআই প্রায় ৯৫ ডলারে অবস্থান করছে।
এর আগে ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পরও তেলের বাজারে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। মার্চে ব্রেন্টের দাম ১৩৯ দশমিক ১৩ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ১৩০ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছায়, যা ২০০৮ সালের রেকর্ডের কাছাকাছি। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা এবং করোনা মহামারির পর চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ২০২২ সালের গ্রীষ্ম পর্যন্ত দাম বেশির ভাগ সময় ১০০ ডলারের ওপরে ছিল। পরে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমে আসে।
২০২০ সালের করোনাভাইরাস মহামারিতে তেলের বাজারে ঘটে যায় আরো নাটকীয় ঘটনা। অফিস-কারখানা বন্ধ এবং বিমান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় তেলের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যায়। একই সময়ে তেল সংরক্ষণের জায়গার সংকট এবং সৌদি আরব ও রাশিয়ার মধ্যে মূল্যযুদ্ধ বাজারকে আরো বিপর্যস্ত করে। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম ঋণাত্মক ৪০ দশমিক ৩২ ডলারে নেমে যায়। অর্থাৎ উৎপাদকদের ক্রেতাদের তেল নেওয়ার জন্য অর্থ দিতে হয়েছিল। একই সময়ে ব্রেন্টের দাম রেকর্ড সর্বনিম্ন ১৫ দশমিক ৯৮ ডলারে নেমে যায়।
২০১২ সালে ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবেও তেলের দাম বেড়েছিল। ইউরোজোনের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তেলের দাম ৯০ ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে দেশটির ওপর একাধিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞাও ছিল। ফলে দাম আবার ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। সিরিয়া সংকটসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত উত্তেজনার কারণে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দাম প্রায় ধারাবাহিকভাবে ১০০ ডলারের ওপরে ছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেল ব্যাপকভাবে বাজারে আসায় ২০১৫ সালের শুরুতে দাম ৫০ ডলারের নিচে নেমে যায়।
২০১১ সালের আরব বসন্তও তেলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছিল। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলে অস্থিরতার কারণে ওই বছরের মার্চে ব্রেন্টের দাম বেড়ে ১২৭ ডলারে পৌঁছায়। তিউনিসিয়া, মিসর ও ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের শাসকদের পতন এবং লিবিয়াসহ অন্যান্য দেশে অস্থিরতা বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
তবে এই শতাব্দীতে তেলের দামের সবচেয়ে বড় উত্থান দেখা যায় ২০০৮ সালে। ওই বছরের শুরুতে প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়ায় ব্রেন্ট। ১১ জুলাই ব্রেন্টের দাম রেকর্ড ১৪৭ দশমিক ৫০ ডলারে ওঠে। একই দিনে ডব্লিউটিআইয়ের দামও সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৪৭ দশমিক ২৭ ডলারে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রে তেলের মজুত কমে যাওয়া, চীনের শক্তিশালী চাহিদা এবং ইরান ও নাইজেরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে অস্থিরতা দাম বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি ডলারের দুর্বলতাও তেলের দাম বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র মন্দা দেখা দিলে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ব্রেন্টের দাম প্রায় ৩৬ ডলারে নেমে আসে। এই শতাব্দীর তেলের বাজারের ইতিহাস দেখায়, আন্তর্জাতিক সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহের সংকট, অর্থনৈতিক মন্দা এবং বৈশ্বিক মহামারির মতো ঘটনা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তেলের দামে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ২০০৮ সালের প্রায় ১৫০ ডলারের রেকর্ড উচ্চতা থেকে ২০২০ সালে ঋণাত্মক দামে পতন এবং ২০২৬ সালে আবার ১০০ ডলারের ওপরে ওঠা সেই অস্থিরতারই ধারাবাহিক চিত্র।