বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে ১৯৫২ সালে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। ইসরাইলের প্রথম প্রেসিডেন্ট খাইম ভাইৎসম্যানের মৃত্যুর পর দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের সরকার আইনস্টাইনকে এই দায়িত্ব পালনের আমন্ত্রণ জানায়।
খাইম ভাইৎসম্যান ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বায়োকেমিস্ট এবং জায়নবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। অ্যাসিটোন উৎপাদন সংক্রান্ত তার গবেষণা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে বিজ্ঞানী হিসেবে তার অবদানের পাশাপাশি রাজনৈতিক জীবনও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জায়নবাদী আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার কারণে ১৯৪৯ সালে তিনি ইসরাইলের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালে ৭৭ বছর বয়সে তার মৃত্যু হলে নতুন প্রেসিডেন্ট খোঁজা শুরু হয়।
সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত আব্বা ইবন আইনস্টাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ডেভিড বেন-গুরিয়নের পক্ষ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে তাকে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, ভৌগোলিকভাবে ছোট হলেও ইসরাইল ইহুদি জনগণের প্রাচীন ও আধুনিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে এবং দেশটির জন্য আইনস্টাইনের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আইনস্টাইন তখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বসবাস করতেন এবং প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে জানানো হয়েছিল, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা বন্ধ করতে হবে না। তবে ইসরাইলে গিয়ে বসবাস করতে হবে।
প্রস্তাব পেয়ে আইনস্টাইন গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন। জবাবে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন, ইসরাইলের সরকারের প্রস্তাবে তিনি গভীরভাবে অভিভূত হয়েছেন, কিন্তু তা গ্রহণ করতে না পারায় দুঃখ ও লজ্জাবোধ করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সারা জীবন তিনি বস্তুনিষ্ঠ সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তার নেই। তাই তিনি নিজেকে এত উচ্চ পদের দায়িত্ব পালনের জন্য যোগ্য মনে করেন না।
আইনস্টাইন আরো লিখেছিলেন, বিশ্বে নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পর থেকে ইহুদি জনগণের সঙ্গে সম্পর্কই তার সবচেয়ে শক্তিশালী মানবিক বন্ধনে পরিণত হয়েছিল। ফলে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করা তার জন্য সহজ ছিল না।
গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, আইনস্টাইনের প্রত্যাখ্যানের পেছনে ব্যক্তিগত অনীহার পাশাপাশি বাস্তব রাজনৈতিক বিবেচনাও ছিল। আইনস্টাইন নিজেকে প্রশাসক বা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কখনো কল্পনা করেননি। অন্যদিকে, ডেভিড বেন-গুরিয়নও আইনস্টাইনের স্বাধীনচেতা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও ইসরাইল এবং জায়নবাদী আন্দোলনের প্রতি আইনস্টাইনের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা ছিল দীর্ঘদিনের। তিনি খাইম ভাইৎসম্যানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং জায়নবাদের এমন একটি ধারাকে সমর্থন করতেন, যা ফিলিস্তিনে আরব ও ইহুদিদের সমঅধিকারভিত্তিক সহাবস্থানের পক্ষে ছিল।
১৯৪৭ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে লেখা এক চিঠিতে আইনস্টাইন জানান, তিনি জায়নবাদী আদর্শকে সমর্থন করেছিলেন কারণ এর মাধ্যমে ঐতিহাসিক একটি অন্যায়ের সংশোধনের সম্ভাবনা দেখেছিলেন। পরের বছর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সেই অর্জনে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তবে ইসরাইলের কিছু চরমপন্থি রাজনৈতিক শক্তির কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও করেছিলেন আইনস্টাইন। ১৯৪৮ সালে মেনাখেম বেগিনের নেতৃত্বাধীন হারুত পার্টির বিরুদ্ধে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি খোলা চিঠিতে তিনি অন্য কয়েকজন ইহুদি বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে স্বাক্ষর করেন। সেখানে দলটির রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা হয় এবং নাৎসি ও ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা টানা হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, আইনস্টাইনকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নবগঠিত ইসরাইল রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। বিশ্বজুড়ে সম্মানিত একজন বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে তার নাম দেশটির ভাবমূর্তি শক্তিশালী করতে পারত। যদিও ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট পদ মূলত আনুষ্ঠানিক, তবুও তা রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।
শেষ পর্যন্ত আইনস্টাইন প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। তার পরিবর্তে ১৯৫২ সালে ইতিহাসবিদ আইজ্যাক বেন-জেভি ইসরাইলের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত আইনস্টাইন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে না গিয়ে গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডেই নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা