নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন
আমেরিকা-ইসরাইলের আগ্রাসনের জবাবে ইসরাইলে ও মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থানে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ পথ হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ দেয় দেশটি। এর জেরে প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পারস্য উপসাগরীয় দেশ কাতারের জ্বালানি খাত। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বহু বছর সময় লাগবে দোহার।
বৃহস্পতিবার আমেরিকার সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের পর দোহার বাসিন্দাদের কাছে আটকে পড়া গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার রাশিদা এখন একধরনের তিক্ত রসিকতায় পরিণত হয়েছে। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে জাহাজটি হরমুজ প্রণালির কাছে পারস্য উপসাগরে বৃত্তাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা সামুদ্রিক ট্র্যাকিং অ্যাপে জাহাজটির অবস্থান অনুসরণ করে একে অপরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আজ রাশিদা কোথায়?’
অবিরাম ঘুরতে থাকা এই ট্যাঙ্কারটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অচলাবস্থার এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই সংকটে একদিকে যেমন কাতারের কয়েক বিলিয়ন ডলার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। একইসঙ্গে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ঘাটতি আরো বেড়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক দেশ কাতার। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর তাদের জ্বালানি শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নষ্ট হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় যেসব স্থাপনা অক্ষত রয়েছে, সেগুলোও বন্ধ রাখতে হয়েছে।
প্রতিবেদক কাতারে থাকার সময় এক ডজনের বেশি লোকের সাক্ষাৎকার নেন। তিনি যাদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের বেশিরভাগই নাম প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করেন। কেননা জ্বালানির বিষয়টি কাতারে বরাবরই সংবেদনশীল। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কাতার এনার্জি দেশটির অর্থনীতির মূল ভিত্তি। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি আগামীকাল খুলে গেলেও কাতারের এলএনজি রপ্তানি কয়েক মাস ধরে মারাত্মকভাবে ব্যাহত থাকবে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে বছরের পর বছর সময় লাগবে।
ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর বিকল্প যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শিপিং কোম্পানিগুলো এখন আর হরমুজ প্রণালির পথকে নিরাপদ মনে করছে না, ফলে কাতারের অবশিষ্ট রপ্তানির বড় অংশও আটকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যে কাতারের গ্যাস অবকাঠামোর বড় ক্ষতি হয় মার্চ মাসে, যখন ইরান দেশটির এলএনজি উৎপাদনকেন্দ্র রাস লাফানের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক হামলা চালায়। বেশিরভাগ হামলা প্রতিহত করা হলেও ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও তিনটি ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করে এলএনজি স্থাপনায় আঘাত হানে।
ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিটগুলোর একটিতে কাজ করা সাবেক প্রকৌশলী রশিদ আল-মোহানাদি হামলার রাতটির কথা স্মরণ করেন। দোহার বাইরে নিজের বাড়ি থেকে উত্তর দিকে তিনি রাস লাফানের আকাশে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের ঝলকানি দেখেছিলেন। বিস্ফোরণের অভিঘাত ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে তার বাড়ির জানালা ও দরজা কাঁপিয়ে তোলে। বাইরে বেরিয়ে তিনি দেখেন, দিগন্তজুড়ে ঘন কালো ধোঁয়া। তিনি বলেন, সেই মুহূর্তেই বুঝেছিলাম, কিছু একটা প্রতিরক্ষা ভেদ করে ঢুকে গেছে।
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ইউনিট রাস লাফানের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ জোগান দিত। কাতার এনার্জি জানিয়েছে, পূর্ণ সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৬০০ জাহাজ হরমুজ প্রণালির আশপাশে আটকা পড়ে আছে। এসব জাহাজে রয়েছে এলএনজি, তেল ও জ্বালানি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্য। ইরান পাকিস্তানের পতাকাবাহী জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু নাবিক জাহাজে থাকা কাপড়ের টুকরো জোড়া লাগিয়ে অস্থায়ী পাকিস্তানি পতাকা বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও জাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর জন্য ঝুঁকি থেকেই যাবে। তেহরানের দাবি, তারা এই নৌপথে পানির নিচে বিস্ফোরক পুঁতে রেখেছে। আন্তর্জাতিক মাইন অপসারণকারী ইউনিট বা ইরান কর্তৃপক্ষ বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা না দেওয়া পর্যন্ত শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের নাবিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে চাইবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
তাৎক্ষণিক সংকটের সমাধান হলেও, জ্বালানি শিল্পের অনেকের ধারণা, হরমুজ প্রণালি আর আগের অবস্থায় ফিরবে না। প্রণালিকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বিশাল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর প্রতি সমর্থন বাড়ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি মানচিত্রই বদলে দিতে পারে।