হোম > বিশ্ব > আমেরিকা

চীনের তীব্র সমালোচক ট্রাম্প কেন শি জিনপিংকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিচ্ছেন

আমার দেশ অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনীতির শুরুতে চীনকে মার্কিন অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তার অভিযোগ ছিল, চীনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়েছে। চীনের বিরুদ্ধে সেই কঠোর অবস্থানই একসময় তার রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল।

তবে সময়ের সঙ্গে চীন ও দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি ট্রাম্পের অবস্থানে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। একসময় যে নেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করতেন, এখন তার সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলছেন ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার শি জিনপিংকে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে আতিথেয়তা দেওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছেন তিনি।

চলতি মাসে ট্রাম্প শি সম্পর্কে বলেন, তিনি ‘দারুণ ভদ্রলোক’ এবং তাদের মধ্যে ‘খুব ভালো সম্পর্ক’ রয়েছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভালো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

চীনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়েও সম্প্রতি ট্রাম্পকে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থানে দেখা গেছে। ইরানকে চীন স্যাটেলাইট ছবি দিয়েছে—এমন প্রতিবেদন নিয়েও ট্রাম্প বলেন, তার ধারণা শি ‘যুক্তিসংগত আচরণ’ করেছেন। আবার ২০২০ সালে চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন ভোটারদের তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুললেও এবার প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেছেন তিনি।

শুল্কযুদ্ধ থেকে সম্পর্ক মেরামত

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা যখন আরো তীব্র হচ্ছে, তখনই ট্রাম্পের এই নীতির পরিবর্তন সামনে এসেছে। উৎপাদন খাতের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিতে চীন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিতেও পড়ছে।

চীনের আচরণ পরিবর্তনে কঠোর চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প এখন অনেকটা কূটনৈতিক আতিথেয়তার পথ বেছে নিয়েছেন বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।

গত মে মাসে ট্রাম্প বেইজিং সফর করেন। চলতি বছর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতার আরো দুইবার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শির সফরকে ঘিরে হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে হেলিপ্যাড প্রস্তুত করা হয়েছে। এমনকি চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর জন্য হোয়াইট হাউসের বলরুম প্রস্তুত না থাকায় ট্রাম্প হতাশা প্রকাশ করেছেন।

অথচ গত বছর চীনের বিরুদ্ধে একের পর এক উচ্চহারে শুল্ক আরোপ এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন ট্রাম্প। শেষ পর্যন্ত সেই কৌশল প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজের ওপর চীনের বড় নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বাণিজ্য আলোচনায় সেই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাময়িক বাণিজ্য সমঝোতায় যেতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাইকেল কোভরিগের মতে, উচ্চহারে শুল্ক ও রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চীনকে চাপ দেওয়ার প্রাথমিক চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই ট্রাম্প তার কৌশল বদলেছেন। তার ভাষায়, দুই নেতা প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন এবং এতে শি জিনপিংয়ের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।

মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব, চীনের সুযোগ

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নীতির আরেকটি দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা জোটগুলোর ওপর চাপ তৈরি হওয়া। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে বিভিন্ন বক্তব্যে কটাক্ষ করেছেন ট্রাম্প। ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গেও তার সম্পর্ক কখনো ঘনিষ্ঠ, কখনো উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র কানাডার সঙ্গেও বাণিজ্যিক বিরোধ তীব্র হয়েছে।

কোভরিগের মতে, এর ফলে চীনের ‘বিভাজন কৌশল’ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তার দাবি, পশ্চিমা দেশগুলোর অনেক নেতা এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন, যাতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সৃষ্ট অন্যান্য সমস্যায় মনোযোগ দিতে পারেন।

অবশ্য শির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে ট্রাম্প কিছু প্রতীকী সাফল্য দেখাতে পারেন। জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকে তার সঙ্গে শির তিনবার বৈঠক হয়েছিল। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে দুই দেশের নেতাদের পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় সফরের নজির তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির নেতাদের মধ্যে যোগাযোগের ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয়।

শুল্কেও থামেনি চীনের উৎপাদন

মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, শুল্ক এড়াতে চীন ভিয়েতনামের মতো তৃতীয় দেশ হয়ে কিছু পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর পথ ব্যবহার করছে।

অন্যদিকে, চীনের উৎপাদন খাত ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের কারণে বড় ধরনের ধাক্কা খায়নি। বরং নতুন বাজার তৈরি করে চীন বিশ্বের অন্যান্য দেশে রপ্তানি বাড়িয়েছে। গত বছর দেশটির বৈশ্বিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। কম দামের বৈদ্যুতিক গাড়ি দিয়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো জার্মানি, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি শিল্পের ওপরও চাপ তৈরি করেছে।

বাণিজ্যবিরতির সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয় দেশই নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। উন্নত কম্পিউটার চিপের সীমিত প্রবেশাধিকার থাকা সত্ত্বেও চীন সামরিক ও এআই সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বিরল খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে।

এআই খাতেও যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এগিয়ে যেতে চায়। ট্রাম্প সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেওয়া মানে চীনকে সুবিধা দেওয়া। তার ভাষায়, এআই হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি।

তবে চীনা এআই প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন এআই মডেল ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। এআই যদি ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়, তাহলে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবু মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেছেন, এআইয়ের ক্ষেত্রে পুরো চীনকে ‘খারাপ পক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করা ন্যায্য হবে না। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প এ বিষয়টি তুলবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দেন।

এবার কী দেবে শির সফর?

সাধারণত কোনো রাষ্ট্রীয় সফরের সঙ্গে বাণিজ্য, নিরাপত্তা বা কূটনীতিতে নির্দিষ্ট কিছু অর্জন বা সমঝোতা যুক্ত থাকে। তবে বৃহস্পতিবারের শি জিনপিংয়ের সফর থেকে ঠিক কী ফল পাওয়া যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইভান মেডেইরোসের মতে, এবারের সফরের সবচেয়ে বড় ফলাফল হয়তো দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কই হতে পারে। তিনি মনে করেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার এই পদ্ধতি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরো জোরালো অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

ফলে ট্রাম্পের চীননীতি এখন এক ভিন্ন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় চীনের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য ও শুল্ক আরোপকে অগ্রাধিকার দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক, আলোচনা ও রাষ্ট্রীয় আতিথেয়তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে এই পরিবর্তিত কৌশল দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতায় কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করবে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

সূত্র: এনডিটিভি

এআরবি

গ্রিনল্যান্ডে বাড়বে মার্কিন সেনা, স্থাপন হবে সামরিক ঘাঁটি

ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য ব্রিটেনের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি

১৪ গুণ বেশি কার্বন ছড়ায় ব্যক্তিগত জেট, ব্যবহারকারী ২ লাখ ৫৬ হাজার

ভারতীয় পণ্যে ১০০ শতাংশ মার্কিন শুল্কারোপের শঙ্কা, ঘুম হারাম রপ্তানিকারকদের

আমেরিকান জনগণের সমর্থন হারিয়েছে ইসরাইল, এরপর কি রাজনীতিবিদদের পালা

নিরাপত্তা পরীক্ষায় বাস্তব ৩ প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে ঢুকে পড়ল গুগলের জেমিনাই

এইচ-১বি ভিসায় ১ লাখ ডলার ফি-সংক্রান্ত আদেশের মেয়াদ বাড়ালেন ট্রাম্প

তৃতীয় দেশে অভিবাসী পাঠানোর ট্রাম্পের নীতি আটকে দিল মার্কিন আদালত

সিএনএনসহ ৩ সংবাদমাধ্যমকে নিষিদ্ধ করলেন ট্রাম্প

রোবট দিয়ে সৌর পার্ক, ক্যালিফোর্নিয়ার স্টার্টআপে গুগল-বিল গেটসের বিনিয়োগ