আলজাজিরা এক্সপ্লেইনার
ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ দেওয়ার ফলে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। অনেক দেশ বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট এড়াতে তাদের কৌশলগত তেল মজুত ব্যবহার শুরু করেছে।
গত ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলা পর তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়েছে। প্রণালির বিস্তৃত এই জলসীমা দিয়ে উপসাগর থেকে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী প্রায় ২০ শতাংশ জাহাজ চলাচল করে। এছাড়া এই প্রণালি উপসাগরীয় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত সমুদ্রে যাওয়ার একমাত্র জলপথ।
প্রণালিটির বন্ধের প্রভাবে গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের বেশি হয়েছে, যেখানে যুদ্ধের আগে এর দাম ছিল প্রায় ৬৫ ডলার।
এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ১১ মার্চ ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) ৩২টি সদস্য দেশ তাদের কৌশলগত জরুরি মজুত থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে, যা সংস্থাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মজুত ছাড়।
এটি ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর সদস্য দেশগুলোর পক্ষ থেকে ১৮২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার তুলনায় অনেক বেশি।
কৌশলগত তেল মজুত কী?
কৌশলগত তেল মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) হলো অপরিশোধিত তেলের একটি জরুরি মজুত, যা একটি দেশের সরকার তাদের নিজস্ব স্থাপনায় সংরক্ষণ করে।
যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক সংকটের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে এই তেল মজুত ব্যবহার করা হয়। সাধারণত সরকার বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে তেল কিনে তাদের মজুত পূর্ণ রাখে।
আইইএর (ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি) তথ্য অনুযায়ী, তাদের সদস্য দেশগুলো বর্তমানে ১.২ বিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল সরকারি জরুরি তেলের মজুত ধরে রেখেছে। এর পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছে আরও প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে, যা সরকারের নির্দেশে প্রয়োজনে জনসাধারণের চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এছাড়া চীনের মতো আইইএর বাইরের দেশগুলোর কাছেও এমন তেল মজুত রয়েছে।
কোন দেশের কতটুকু কৌশলগত তেল মজুত আছে? বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সামালাতে কি তা যথেষ্ট?
চীন
বেইজিং আইইএ (ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি)-এর সদস্য নয়, তবে দেশটির কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কৌশলগত তেল মজুদ রয়েছে।
চীনের মিনিস্ট্রি অব ইকোলজি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট-এর মতে, বেইজিং ২০০৪ সালে রাষ্ট্রীয় কৌশলগত তেল মজুদ কর্মসূচি শুরু করে, যাতে তেল সরবরাহের ঝুঁকি মোকাবিলা করা যায়।
২০০৭ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই মজুদ কেন্দ্রগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে প্রায় ৩০ দিনের আমদানির সমপরিমাণ কৌশলগত তেল মজুদ রাখা যায়, যা প্রায় ১০ মিলিয়ন টনের সমান।
এই কৌশলগত তেল মজুদগুলো প্রধানত চীনের পূর্ব ও দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে অবস্থিত, যেমন শানডং, ঝেজিয়াং এবং হাইনান।
চীন তাদের অপরিশোধিত তেলের মজুদের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে না, তাই দেশটির কাছে ঠিক কত তেল মজুদ আছে তা স্পষ্ট নয়। তবে জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সা-এর মতে, ২০২৫ সালে ‘চীনের স্থলভিত্তিক অপরিশোধিত তেলের মজুদ (ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণ বাদ দিয়ে) বাড়ছে এবং বছরের শেষে তা রেকর্ড ১.১৩ বিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছায়।’
যুক্তরাষ্ট্র (ইউএস)
আইইএ (ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি)-এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ কৌশলগত তেল মজুদ রয়েছে, যেখানে প্রায় ৪১৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সংরক্ষিত আছে। এই মজুদ ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি দ্বারা পরিচালিত হয়। তারা নিশ্চিত করেছে যে, আইইএ-এর সঙ্গে সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ বছর তাদের এসপিআর (স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ) থেকে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়বে।
শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা করেছে যে তারা ইতোমধ্যে এসপিআর থেকে ৪৫.২ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল তেল কোম্পানিগুলোর কাছে ঋণ হিসেবে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৫ সালে তাদের এসপিআর গঠন করে, যখন আরব তেল নিষেধাজ্ঞার কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং তা মার্কিন অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।
রয়টার্স সংবাদ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এই মজুদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০০ দিনের নিট অপরিশোধিত তেল আমদানির চাহিদা পূরণ করতে পারে।
জাপান
আইইএ (ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি)-এর সদস্য জাপানেরও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৌশলগত তেল মজুদ রয়েছে।
জাপানি গণমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া-এর মতে, ২০২৫ সালের শেষে দেশটির জরুরি তেল মজুদ ছিল প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন ব্যারেল, যা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের প্রায় ২৫৪ দিনের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এর মধ্যে ১৪৬ দিনের সমপরিমাণ তেল সরকারের মালিকানাধীন, ১০১ দিনের মজুদ বেসরকারি খাতের এবং বাকি অংশ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে সংরক্ষিত।
১৯৭৩ সালের বৈশ্বিক তেল সংকটের পর ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক বিপর্যয় প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে জাপান ১৯৭৮ সালে তাদের জাতীয় তেল মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বর্তমানে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক।
যুক্তরাজ্য (ইউকে)
২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউকে ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি সিকিউরিটি অ্যান্ড নেট জিরো-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের কাছে কৌশলগত মজুদ হিসেবে প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ৩০ মিলিয়ন ব্যারেল পরিশোধিত তেলজাত পণ্য রয়েছে। এই মজুদ প্রায় ৯০ দিন পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য বলে ধারণা করা হয়।
দেশটি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের পর ১৯৭৪ সালে এই মজুদ গড়ে তোলে এবং আইইএ-এর বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্যও এটি করা হয়। সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোকে কমপক্ষে ৯০ দিনের নিট আমদানির সমপরিমাণ তেল মজুদ রাখতে হয়।
দক্ষিণ ওয়েলসের মিলফোর্ড হ্যাভেন এবং উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডের হাম্বার যুক্তরাজ্যের এই মজুদের প্রধান অবস্থান।
ইরান যুদ্ধজনিত তেল সংকট মোকাবিলায় মজুদ থেকে তেল ছাড়ার ক্ষেত্রে আইইএ-এর ৩২টি দেশের মধ্যে যুক্তরাজ্যও রয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্য সরকার ১৩.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়বে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)
জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন এবং ইতালিসহ ইইউ-এর সদস্য দেশগুলো—যারা সবাই আইইএ-এর সদস্য—তাদেরও কৌশলগত তেল মজুদ রয়েছে।
জার্মানি
জার্মানির অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, দেশটির কাছে ১১০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ৬৭ মিলিয়ন ব্যারেল পরিশোধিত তেলজাত পণ্য রয়েছে।
ফ্রান্স
ফ্রান্স ২০২৪ সালের শেষে প্রায় ১২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল মজুদের কথা জানিয়েছে, যা সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য। এর মধ্যে প্রায় ৯৭ মিলিয়ন ব্যারেল SAGESS নামের সরকার-নির্ধারিত সংস্থার কাছে রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, ৫০ শতাংশ গ্যাসঅয়েল, ৯ শতাংশ গ্যাসোলিন, ৭.৮ শতাংশ জেট ফুয়েল এবং কিছু হিটিং অয়েল রয়েছে। এছাড়া আরও ৩৯ মিলিয়ন ব্যারেল দেশের তেল অপারেটরদের কাছে সংরক্ষিত আছে।
স্পেন
১৬ মার্চ স্পেন ৯০ দিনের মধ্যে প্রায় ১১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুদ থেকে ছাড় দেওয়ার অনুমোদন দেয়, হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট সরবরাহ সংকট মোকাবিলার জন্য—এনার্জি মন্ত্রী সারা আগেসেন সাংবাদিকদের জানান। এটি আইইএ উদ্যোগে দেশটির অবদান। স্পেনের মোট কৌশলগত তেল মজুদ প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ব্যারেল।
ইতালি
ইতালি ২০২৪ সালে আইন অনুযায়ী প্রায় ৭৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুদ রেখেছিল, যা দেশটির গড় নিট তেল আমদানির প্রায় ৯০ দিনের সমপরিমাণ।
এমএমআর