হোম > বিশ্ব > আমেরিকা

আলেকজান্দ্রিয়া থেকে মিশিগানে, আল-সাইয়েদের ছেলেবেলা কেটেছে যেভাবে

আনিসুর রহমান এরশাদ

শৈশবে আবদুল আল-সাইয়েদ ও তার পরিবার। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান। একদিকে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে নতুন দেশে আশ্রয় নেওয়া এক প্রকৌশলী পিতা, অন্যদিকে তার সন্তান—যিনি শিক্ষা, জনসেবা, নৈতিক অবস্থান ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। আবদুল রহমান মোহাম্মদ আল-সাইয়েদের জীবনগাথা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের পরিচয় নির্মাণ, পিতামাতার আদর্শিক প্রভাব, ইসলামী মূল্যবোধের চর্চা এবং গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিক অংশগ্রহণের এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের ক্ষেত্রেও এ জীবন থেকে নেওয়ার মতো অনেক শিক্ষা রয়েছে।

একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণে পরিবার কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আল-সাইয়েদের জীবন। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে সিনেটে নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার নজির স্থাপন করেছেন। তবে তার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের শিক্ষাজীবন, পারিবারিক অভিজ্ঞতা, জনসেবার অঙ্গীকার এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম। ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি তার সিনেটের দায়িত্ব গ্রহণের কথা।

এই সাফল্যের গল্প বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় তার পিতা মোহাম্মদ আল-সাইয়েদের জীবনের দিকে। মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে তার অভিবাসন কেবল ভৌগোলিক স্থানান্তর ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা, শিক্ষা, মর্যাদা এবং একটি উন্নত ভবিষ্যতের সন্ধান।

আলেকজান্দ্রিয়া থেকে মিশিগান: পিতার অভিবাসনের পেছনের ইতিহাস

আবদুল আল-সাইয়েদের পিতা মোহাম্মদ আল-সাইয়েদ ছিলেন একজন প্রকৌশলী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে এসে ডেট্রয়েটের ওয়েইন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশলে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় তার বয়স ছিল বিশের কোঠায়।

তার দেশত্যাগের পেছনে কেবল উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা ছিল না; তৎকালীন মিসরের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সত্তরের দশকের শেষভাগে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলন ঘিরে দমনমূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। আল-সাইয়েদের নিজের লেখা বইয়ের বিবরণ উদ্ধৃত করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, মিসরের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে তার পিতার রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং তরুণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল। শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

মিশিগানকে বেছে নেওয়ার পেছনেও ছিল বিশেষ তাৎপর্য। সেখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগের পাশাপাশি এমন একটি সমাজে বসবাসের প্রত্যাশা ছিল, যেখানে মানুষের নাম, গায়ের রং কিংবা ধর্মীয় পরিচয় তার নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা নির্ধারণ করবে না। আল-সাইয়েদের বইয়ে পিতার যুক্তরাষ্ট্রে আসার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার এই প্রত্যাশার সংযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তার পিতা নিজের জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন দেশে চলে যাননি; বরং আলেকজান্দ্রিয়ার স্মৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক শিকড়কে সঙ্গে নিয়েই নতুন জীবন শুরু করেছিলেন। ডেট্রয়েটের বাজারে গিয়ে মিসরীয় খাবারের উপকরণ সংগ্রহ করার স্মৃতির কথা আবদুল নিজেই ২০১৭ সালে ইয়েমেনি আমেরিকান সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন। তার কাছে সেই বাজার ছিল দূরদেশের আলেকজান্দ্রিয়াকে কাছে ফিরে পাওয়ার একটি জায়গা। অর্থাৎ অভিবাসন তার পিতার কাছে নিজের পরিচয় বিসর্জন দেওয়ার নাম ছিল না; বরং নতুন বাস্তবতায় নিজের শিকড়কে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি প্রচেষ্টা ছিল।

পিতার আদর্শ, সন্তানের তারবিয়াত: পরিবার কীভাবে পরিচয় নির্মাণ করে

আবদুল রহমান আল-সাইয়েদের জন্ম ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের রচেস্টার হিলসে। তার বাবা-মা দুজনই মিসরীয় অভিবাসী। তবে তার শৈশবের পারিবারিক বাস্তবতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে যখন তার বয়স মাত্র তিন বছর। এরপর তিনি ডেট্রয়েটের উপশহরে পিতা মোহাম্মদ আল-সাইয়েদ এবং সৎমা জ্যাকুলিন জনসনের কাছে বড় হন। তার সৎমা ছিলেন মিশিগানের স্থানীয় পরিবারের সন্তান। পেশাগতভাবে তারাও প্রকৌশলবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তাই তার বেড়ে ওঠাকে শুধু একটি অভিবাসী মুসলিম পরিবারের প্রচলিত কাঠামোয় ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। তিনি একই সঙ্গে মিসরীয় মুসলিম ঐতিহ্য এবং মার্কিন সমাজের বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশের অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

খ্রিষ্টান ধর্মীয় ঐতিহ্যসম্পন্ন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার পরিচয়, ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে বসবাস এবং পিতার ইসলামী পরিচয়ের চর্চা—সব মিলিয়ে তার শৈশব ছিল বৈচিত্র্যময়। খ্রিষ্টান ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত তার এক দাদির ধর্মীয় ভূমিকার কথাও মার্কিন সংবাদমাধ্যম ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর উল্লেখ করেছে। তার পিতা আংশিক সময়ের জন্য ইমাম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। এখানেই তার পারিবারিক শিক্ষার একটি বিশেষ দিক রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয় অটুট রাখা এবং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক সহাবস্থান—দুটিকে তিনি শৈশব থেকেই কাছাকাছি দেখেছেন।

২০১৭ সালে ইয়েমেনি আমেরিকান সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আল-সাইয়েদ নিজের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, তার পরিবার ছিল অর্ধেক মিসরীয় ও অর্ধেক শ্বেতাঙ্গ মার্কিন ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গঠিত। এই পরিবেশ তাকে বৈচিত্র্যের দৈনন্দিন সুফল বুঝতে সাহায্য করেছে। তার ভাষায়, পার্থক্যের চেয়ে মানুষ অনেক বড় এবং পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ আরো শক্তিশালীভাবে একত্র হতে পারে।

তিনি আরো বলেছিলেন, তিনি একজন ধর্মচর্চাকারী মুসলিম। ইসলাম তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তবে তার পরিচয়ের একমাত্র অংশ নয়।

এই বক্তব্যের মধ্যে ধর্মীয় আত্মপরিচয় ও নাগরিক পরিচয়ের একটি ভারসাম্যপূর্ণ উপলব্ধি প্রকাশ পায়। তিনি নিজের মুসলিম পরিচয় গোপন করতে চাননি, আবার সেটিকে অন্য নাগরিকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণও মনে করেননি।

এখানে তারবিয়াত বা মূল্যবোধভিত্তিক প্রতিপালনের বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তারবিয়াত বলতে কেবল শিশুকে ধর্মীয় কিছু বিধান শেখানো বোঝায় না; বরং চিন্তাশক্তি, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, আত্মমর্যাদা, জ্ঞানচর্চা এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তোলাও এর অন্তর্ভুক্ত।

আল-সাইয়েদের জীবনে পিতার প্রভাবের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় তার নিজের স্মৃতিচারণে। দ্য নিউ ইয়র্কারকে ২০২৬ সালের আগস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি পিতার পারিবারিক ইতিহাস উল্লেখ করে বলেন, তার দাদি ছিলেন নিরক্ষর গৃহিণী, কিন্তু তার দেখা সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষদের একজন। তার দাদা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন এবং মাছের বাজারে সবজি বিক্রি করতেন। সেই সাধারণ পারিবারিক পটভূমি থেকে তার পিতা উচ্চশিক্ষা ও প্রকৌশলবিদ্যায় প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন।

পিতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে আল-সাইয়েদ বলেন, তার বাবা যেন তাকে অধ্যয়ন ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে অস্তিত্বে নিয়ে এসেছেন। এই বক্তব্য শুধু পিতার আর্থিক ত্যাগের স্বীকৃতি নয়; বরং একটি সন্তানের জীবনে পিতার শিক্ষা, শ্রম, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার গভীর প্রভাবের স্বীকারোক্তি।

এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা প্রয়োজন। তার পিতা প্রতিদিন কীভাবে ধর্মীয় পাঠ দিতেন, কোন কোন নির্দিষ্ট পাঠ্য অনুসরণ করতেন কিংবা কী ধরনের নিয়মিত পারিবারিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু রেখেছিলেন—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রকাশিত তথ্য পর্যাপ্ত নয়। তাই তার জীবনকে ভিত্তি করে নির্দিষ্ট কোনো ঘরোয়া তারবিয়াতি রুটিনের দাবি করা ঠিক হবে না। তবে পিতার ধর্মীয় পরিচয়, ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সন্তানের ওপর তার গভীর প্রভাবের তথ্যগুলো সুস্পষ্ট।

শিক্ষা, মেধা ও আত্মপরিচয়ের বিকাশ

আবদুল আল-সাইয়েদের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি ব্লুমফিল্ড হিলস অ্যান্ডোভার হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। ফুটবল, কুস্তি ও ল্যাক্রোস—তিনটি খেলায় নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ তিনি শুধু বইয়ের শিক্ষায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না; দল পরিচালনা, শৃঙ্খলা, প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন।

২০০৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে। সেখানে জীববিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান—দুটি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ২০০৭ সালে সর্বোচ্চ সম্মানজনক ফলাফল নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। একই বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সমাবর্তনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান।

তার বক্তব্যের বিষয় ছিল অন্তর্ভুক্তি, সমতা এবং ধর্মীয় বিভাজন অতিক্রম করে মানুষের পারস্পরিক সংযোগ। অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তার বক্তব্যে মুগ্ধ হন। ক্লিনটন তাকে বলেন, সভ্যতার সংঘাত অবশ্যম্ভাবী এবং ধর্মীয় বিভাজন অতিক্রম করে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ সম্ভব নয়—এমন ধারণায় বিশ্বাসী পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের তার বক্তব্য শোনা উচিত ছিল।

বক্তব্য শেষে ক্লিনটন তাকে রাজনীতিতে আসার পরামর্শ দেন। কিন্তু আল-সাইয়েদ তখন রাজনীতিতে নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারেননি। তার মনে হয়েছিল, দীর্ঘ আরবি নাম, বাদামি গায়ের রং ও মুসলিম পরিচয়ের কারণে প্রচলিত মার্কিন রাজনীতিতে তার মতো মানুষের জায়গা পাওয়া কঠিন।

পরবর্তী সময়ে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রোডস বৃত্তি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা করেন এবং ডক্টর অব ফিলোসফি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় এমডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার শিক্ষা ও পেশাগত জীবন প্রমাণ করে, ধর্মীয় আত্মপরিচয় এবং আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চা পরস্পরের বিরোধী নয়।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের প্রকাশিত জীবনীতে তার পিতামাতার সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মিসরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরোধিতার কথাও উঠে এসেছে। তাদের কাছ থেকে তিনি সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন।

এখানে তার পিতার পাশাপাশি মাতার ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। বাবা-মা দুজনের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তার চিন্তার বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। যদিও শৈশবে তিনি প্রধানত পিতা ও সৎমায়ের কাছে বড় হয়েছেন।

ধর্মীয় পরিচয় আড়াল নয়, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম পরিচয় নিয়ে জীবনযাপন সব সময় সহজ ছিল না। বিশেষ করে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর আরব ও মুসলিম বংশোদ্ভূত অনেক মার্কিন নাগরিক বৈষম্য ও সন্দেহের মুখোমুখি হন।

আল-সাইয়েদও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদে প্রকাশিত তার জীবনীতে বলা হয়েছে, স্কুলজীবনে আরব-আমেরিকান পরিচয়ের কারণে তাকে বিদ্রূপ ও বৈরিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। প্রতিপক্ষ দলের এক খেলোয়াড়ের কাছ থেকে বারবার অপমানজনক মন্তব্য শুনে একপর্যায়ে তিনি মারামারিতেও জড়িয়ে পড়েন। পরে তার কোচ তাকে বলেছিলেন, জীবনের বাকি সময় তিনি আল-সাইয়েদ হিসেবেই পরিচিত থাকবেন; এই পরিচয়কে অজুহাত বানাবেন, নাকি প্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করবেন, সেই সিদ্ধান্ত তার নিজের। কোচের এই কথাটি তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত হন। সংগঠনটির নেতৃত্বেও দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। তার কাছে ধর্মীয় পরিচয় ছিল আত্মমর্যাদার বিষয়, আবার অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রেও কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না।

এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি মনে করেন, গণতন্ত্রের কাজ হলো মতপার্থক্যকে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পথ তৈরি করা। ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করাও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব।

চিকিৎসক থেকে জনস্বাস্থ্য প্রশাসক: ব্যক্তির চিকিৎসা থেকে সমাজের পরিবর্তন

চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর আল-সাইয়েদ ব্যক্তিগত চিকিৎসাচর্চার পরিবর্তে জনস্বাস্থ্যকে কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, মানুষের অসুস্থতার পেছনে শুধু জীবাণু বা ব্যক্তিগত শারীরিক সমস্যা কাজ করে না; দারিদ্র্য, পরিবেশদূষণ, নিরাপদ পানির অভাব, খাদ্যব্যবস্থা এবং চিকিৎসাসেবায় অসম প্রবেশাধিকারের মতো সামাজিক বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৫ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ও স্বাস্থ্য কমিশনারের দায়িত্ব পান। শহরটি তখন দেউলিয়াত্ব-পরবর্তী পুনর্গঠন এবং জনসেবা ব্যবস্থার নানা সংকট মোকাবিলা করছিল।

তার নেতৃত্বে স্বাস্থ্য বিভাগ পুনর্গঠন, শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা এবং জনস্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে তিনি ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তার কর্মজীবনের এই অভিজ্ঞতা তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধিতে পৌঁছে দেয়—মানুষের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষার জন্য শুধু চিকিৎসাব্যবস্থা নয়, রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক কাঠামোরও পরিবর্তন প্রয়োজন।

পরাজয় থেকে প্রত্যাবর্তন: রাজনীতিতে প্রবেশের সংগ্রাম

২০০৭ সালে বিল ক্লিনটনের পরামর্শের পর প্রায় এক দশক পেরিয়ে যায়। ২০১৭ সালে আল-সাইয়েদ মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন। ২০১৮ সালের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে তিনি গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হন।

তবে এই পরাজয় তার রাজনৈতিক পথচলা থামাতে পারেনি। স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য নিশ্চিত করা, করপোরেট অর্থের রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় নিয়ে তিনি কাজ চালিয়ে যান।

২০২৬ সালের সিনেট নির্বাচনে তার প্রচারণার মূল বক্তব্য ছিল, রাজনীতি যেন সাধারণ মানুষের প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম হয়; অর্থশালী করপোরেশন ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার না হয়।

প্রাথমিক নির্বাচনে কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন অর্জন করেন তিনি। এরপর সাধারণ নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন।

তার এই বিজয় শুধু মুসলিম পরিচয়ের কারণে ঐতিহাসিক নয়; বরং দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্যসেবা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রগতিশীল কর্মসূচি এবং তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনের সমন্বিত ফল।

৪ নভেম্বর ২০২৬-এ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তার বিজয় নিশ্চিত করে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার নজির স্থাপিত হয়।

পিতার স্বপ্ন ও জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক

আল-সাইয়েদের জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সত্ত্বেও তিনি মিসরীয় শিকড়কে অস্বীকার করেননি। তার পিতার জন্মভূমি আলেকজান্দ্রিয়ার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ও স্মৃতি ধরে রেখেছেন।

২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে তার নির্বাচনী বিজয় নিয়ে মিসরে প্রতিক্রিয়ার কথা উঠে এসেছে। দেশটির কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ তাঁর সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তবে মিসরের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তার বিজয় নিয়ে উল্লেখযোগ্য প্রচার দেখা যায়নি।

এর পেছনে তার মিসরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনামূলক অবস্থানও একটি কারণ। তিনি মিসরের সামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্যের মর্মার্থ হলো, জন্মভূমিকে ভালোবাসার অর্থ সেখানকার অন্যায়, দমন-পীড়ন কিংবা স্বৈরশাসনকে সমর্থন করা নয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশপ্রেম এবং ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি আনুগত্য এক বিষয় নয়। একজন নাগরিক নিজের দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা রেখেও রাষ্ট্রের অন্যায়, দুর্নীতি ও নিপীড়নের সমালোচনা করতে পারেন।

পিতার অভিবাসনের ইতিহাসের সঙ্গেও এই উপলব্ধির সম্পর্ক রয়েছে। তার বাবা যে রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা ছেলের কাছে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মূল্যকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে বলে তার পারিবারিক স্মৃতিচারণ থেকে বোঝা যায়।

সন্তান গড়তে শুধু অর্থ নয়, প্রয়োজন আদর্শ ও পরিবেশ

আবদুল আল-সাইয়েদের জীবন থেকে বাংলাদেশের পরিবার ও অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের পাশাপাশি আদর্শিক দিকনির্দেশনা, শিক্ষার পরিবেশ ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশে সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়ানো, ভালো ফলাফল করানো, উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং প্রতিষ্ঠিত পেশায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে অভিভাবকদের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু এসবের পাশাপাশি সন্তান কী ধরনের মানুষ হয়ে উঠছে, তার নৈতিক অবস্থান কতটা দৃঢ় হচ্ছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস তৈরি হচ্ছে কি না এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে উঠছে কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক পরিবারে সন্তানকে ভালো ফলাফল ও ভালো চাকরির জন্য প্রস্তুত করা হয়, কিন্তু তাকে সামাজিক সমস্যা বুঝতে, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করতে, মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে কিংবা নেতৃত্ব দিতে শেখানো হয় না। অথচ একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও বিবেকের সমন্বয় থাকা জরুরি।

আল-সাইয়েদের পিতা নিজে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। তার সন্তান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার জায়গায় পৌঁছেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, পরিবারে স্বাধীন চিন্তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নাগরিক অধিকার সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের অভিভাবকদের সন্তানদের শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নয়, জীবনের বড় প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়ার জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। তারা যেন জানতে পারে, রাষ্ট্র কেন প্রয়োজন, নাগরিকের অধিকার কী, সরকারের দায়িত্ব কী, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কোথায় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার পদ্ধতি কী।

ইসলামী তারবিয়াত: পরিচয়ের দৃঢ়তা, চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবিকতা

আল-সাইয়েদের জীবনকে ইসলামী তারবিয়াতের আলোকে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসে।

প্রথমত, আত্মপরিচয়ের দৃঢ়তা। ভিন্ন সংস্কৃতির সমাজে বসবাস করলেও নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে হীনম্মন্যতার বিষয় মনে না করা।

দ্বিতীয়ত, জ্ঞানার্জনের ব্যাপকতা। ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করার পাশাপাশি জীববিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রপরিচালনা সম্পর্কে উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করা।

তৃতীয়ত, মানবিক দায়িত্ববোধ। ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক সাফল্যের বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে কাজ করা।

চতুর্থত, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা। নিজের বিশ্বাসে অবিচল থেকেও ভিন্ন ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক গড়ে তোলা।

পঞ্চমত, অন্যায়ের সমালোচনা করার নৈতিক সাহস। জন্মভূমি, পরিবার কিংবা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেই তাদের সব কর্মকাণ্ড সমর্থন করতে হবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা।

ইসলামের শিক্ষা অনুসারে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সত্যের পক্ষে অবস্থান ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে নিজের, পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও ন্যায়বিচারের সাক্ষ্য দিতে বলা হয়েছে। সূরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতে কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে, সেই নির্দেশনা রয়েছে।

এই মূল্যবোধগুলো সন্তানদের মধ্যে গড়ে তুলতে পারলে তারা শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের বাহক হবে না; বরং ন্যায়পরায়ণ, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সন্তানকে কী শেখাবেন?

আল-সাইয়েদের পিতার দেশত্যাগ এবং তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। পরিবার সন্তানকে শুধু ক্ষমতাবান হওয়ার স্বপ্ন দেখাবে না; ক্ষমতার কাছে সত্য বলার সাহসও শেখাবে।

আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃত্ববাদী শাসন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং নাগরিক অধিকার সংকোচনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব সমাজে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান গ্রহণের মানসিকতা।

তবে এর অর্থ বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা উসকে দেওয়া নয়। বরং আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সন্তানকে কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ সমর্থক হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে ন্যায়-অন্যায় বিচার করতে শেখানো প্রয়োজন। তাকে বোঝাতে হবে, রাষ্ট্র জনগণের; সরকার জনগণের সেবক; আর নাগরিকের দায়িত্ব শুধু ভোট দেওয়া নয়, রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন থাকা ও জবাবদিহি দাবি করাও।

সাফল্যের গল্পের বাইরেও রয়েছে কিছু বাস্তবতা

আল-সাইয়েদের জীবনকে আদর্শায়িত করতে গিয়ে তার জীবনের জটিলতাগুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়। তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটেছিল শৈশবে। তার বেড়ে ওঠায় সৎমায়েরও ভূমিকা ছিল। তার রাজনৈতিক যাত্রায় পরাজয় এসেছে, বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং তার অবস্থান নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে।

তার পরিবার ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে নিজের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মায়ের অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা সম্পৃক্ততা নেই।

পিতার শিকড়, সন্তানের ডানা

মোহাম্মদ আল-সাইয়েদ আলেকজান্দ্রিয়া থেকে মিশিগানে এসেছিলেন উচ্চশিক্ষা, স্বাধীনতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রত্যাশায়। তিনি হয়তো কল্পনাও করেননি, তার সন্তান একদিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের সদস্য নির্বাচিত হবেন এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করবেন। তবে এই অর্জনকে কেবল একজন পিতার স্বপ্নপূরণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে সন্তানের নিজস্ব মেধা, অধ্যবসায়, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম। রয়েছে তার সৎমায়ের অবদান, মায়ের পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাও।

এই জীবনগাথার সবচেয়ে সুন্দর তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই—সন্তানকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে, কিন্তু তার ডানা ছেঁটে দেওয়া যাবে না। তাকে ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখাতে হবে, কিন্তু প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থেকেও বঞ্চিত করা যাবে না। তাকে দেশপ্রেম শেখাতে হবে, কিন্তু রাষ্ট্রের অন্যায়কে সমর্থন করতে শেখানো যাবে না। তাকে সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে হবে, কিন্তু সেই সাফল্যের সঙ্গে মানুষের কল্যাণের সম্পর্কও বুঝিয়ে দিতে হবে। পিতা সন্তানের হাতে আদর্শের প্রদীপ তুলে দিতে পারেন; কিন্তু সেই আলো নিয়ে কত দূর এগোবেন, তা নির্ধারণ করে সন্তানের নিজের সাধনা ও কর্ম।

আবদুল আল-সাইয়েদের জীবন তাই বাংলাদেশের অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। আমাদের এমন প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে, যারা নিজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে আত্মবিশ্বাসী, জ্ঞানে সমৃদ্ধ, চিন্তায় মুক্ত, নৈতিকতায় দৃঢ় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী হবে। শুধু প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী নয়, প্রয়োজন বিবেকবান মানুষ; শুধু ক্ষমতাবান নেতা নয়, প্রয়োজন জনকল্যাণে নিবেদিত নেতৃত্ব। এমন সন্তানই একদিন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিহাসে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

হিন্দুত্ববাদের ‘দ্ব্যর্থহীন নিন্দা’ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেসম্যানের

ইরান যুদ্ধের দায়ে হেগসেথকে বলির পাঁঠা বানাচ্ছেন রিপাবলিকানরা

মার্কিন নির্বাচনে বিজয়ী হিজাবি নারীদের পরিচয় জানা গেল

মুসলিমদের অধিকার রক্ষায় যে পদক্ষেপের কথা জানালেন আবদুল আল-সাইয়েদ

ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর টেসলা-স্পেসএক্সের শেয়ারে পতন, বিপুল সম্পদ হারালেন মাস্ক

ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথকে অভিশংসনের উদ্যোগ, আগামী সপ্তাহে ভোট

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে নজরদারি ও তদন্ত বাড়ানোর প্রস্তুতি ডেমোক্র্যাটদের

প্যারাগুয়েতে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ, পদত্যাগপত্র নিচ্ছে না পার্লামেন্ট

পিট হেগসেথ ও মার্কো রুবিওর পদত্যাগের গুঞ্জন নাকচ

বিল ক্লিনটনের প্রশংসা পাওয়ার ১৯ বছর পর রেকর্ড গড়লেন সেই তরুণ