হোম > বিশ্ব > আমেরিকা

এল-সাইদের ধর্মবিশ্বাসে আক্রমণ রিপাবলিকানদের, উত্তপ্ত টাউন হল

সিএনএন

যুক্তরাষ্ট্রে মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড ইস্যুটি উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইদকে ইসলামি সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বার্থের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন রিপাবলিকানরা। অন্যদিকে, এল-সাইদের দাবি, তাকে অন্যায়ভাবে সেই ‘দ্বৈত আনুগত্যের’ অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, যে অভিযোগের মুখে একসময় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ও বারাক ওবামাকেও পড়তে হয়েছিল।

এ সপ্তাহান্তে এল-সাইদ মুসলিম ব্রাদারহুডের নিন্দা করেন। ১৯২৮ সালে মিসরে প্রতিষ্ঠিত এই ইসলামপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলনকে নিয়ে প্রথমে এক ভোটারের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সময় এবং পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। এর আগে রিপাবলিকানরা সংগঠনটির সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্ক এবং এ বিষয়ে তার অতীতের মন্তব্যগুলো সামনে আনার চেষ্টা করছিলেন।

রোববার মিশিগানের ফ্লিন্টে একটি নির্বাচনী সমাবেশের পর সাংবাদিকদের এল-সাইদ বলেন, ‘তারা কেন এটিকে তাদের প্রচারের শেষ যুক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়, সে বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘তারা মানুষের মধ্যে একধরনের পরোক্ষ দ্বৈত আনুগত্যের ধারণা তৈরি করতে চায়। আমাদের রাজনীতিতে এই ধারণার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে—কেউ হয়তো একটু ভিন্নভাবে প্রার্থনা করেন, তাই তার দ্বৈত আনুগত্য রয়েছে। জন এফ. কেনেডি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় তার সঙ্গেও একই কাজ করা হয়েছিল। তিনি ক্যাথলিক হওয়ায় তার নাকি দ্বৈত আনুগত্য রয়েছে—এমন ধারণা ছড়ানো হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামার ক্ষেত্রেও একই কাজ করা হয়েছিল, শুধু তার বাবা মুসলিম বংশোদ্ভূত ছিলেন বলে, যদিও তার বাবা খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী ছিলেন।’

এল-সাইদ আরো বলেন, ‘এটি নতুন কিছু নয়। মানুষের জীবনের প্রকৃত সমস্যাগুলো নিয়ে বলার মতো কোনো বক্তব্য না থাকলে তারা এ কাজই করে।’

এল-সাইদকে লক্ষ্য করে রিপাবলিকানদের আক্রমণ

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিনেট লড়াইগুলোর একটির শেষ কয়েক সপ্তাহে রিপাবলিকানরা ক্রমেই এল-সাইদের মুসলিম ধর্মবিশ্বাসকে সামনে আনছেন। শুক্রবার রাতে এক নির্বাচনী সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এল-সাইদকে ‘মোহাম্মদ’ বলে উল্লেখ করেন এবং মিথ্যাভাবে দাবি করেন, ডেমোক্র্যাট এই সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা একজন ‘জিহাদি’। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের নির্বাচনী সমাবেশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যে এ ধরনের মন্তব্য নিয়মিত হয়ে উঠেছে।

এল-সাইদের রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য মাইক রজার্স রোববার বলেন, তিনি ‘কখনো তাকে সন্ত্রাসী বলেননি’। তিনি আরো বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের হয়ে কথা বলি না।’

তবে রজার্সের অভিযোগ, এল-সায়েদ মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করেছেন। মুসলিম ব্রাদারহুড একটি ইসলামপন্থি আন্দোলন, যার বিভিন্ন শাখা বিশ্বের নানা দেশে রয়েছে। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মিসরে, যেখানে একসময় তারা উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করেছে। সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে সহিংস পদ্ধতি ব্যবহারের বিরোধিতা করে। তবে অতীতে সংগঠনটির কয়েকটি শাখার সঙ্গে হামলার সম্পর্ক থাকার অভিযোগ উঠেছে।

গত নভেম্বরে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। এর মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুডের নির্দিষ্ট কিছু শাখা বা উপবিভাগকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন কিংবা বিশেষভাবে চিহ্নিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাংবাদিক ডানা বাশকে রজার্স বলেন, ‘আপনারা জানেন, তিনি নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরতে চান। বিষয়টি তা নয়। এটি আপনি কীভাবে চিন্তা করেন, তা নিয়ে; আপনি কীভাবে প্রার্থনা করেন, তা নিয়ে নয়। এটি আপনার মতাদর্শ এবং সেটি কতটা বিপজ্জনক, তা নিয়ে।’

টাউন হলের সভায় এল-সাইদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়

এল-সাইদকে মুসলিম ব্রাদারহুড ও ইসলামি চরমপন্থার সঙ্গে যুক্ত করার রিপাবলিকানদের চেষ্টা এ সপ্তাহান্তে মিশিগানের ক্যারো শহরে একটি টাউন হল সভায় প্রকাশ্য রূপ নেয়। সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি বারবার এল-সাইদের কাছে মুসলিম ব্রাদারহুড সম্পর্কে জানতে চান। তার বক্তব্য ছিল, প্রার্থীকে এখনো সংগঠনটির প্রত্যাখ্যান করতে শোনা যায়নি।

জনতার মধ্য থেকে ওই ব্যক্তি চিৎকার করে বলেন, ‘আবদুল, আপনি কি মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করবেন?’ আন্দোলনটির সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করার পর এল-সাইদ ওই ব্যক্তির সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ওই ব্যক্তি পরোক্ষভাবে ধরে নিয়েছেন যে তার ‘দ্বৈত আনুগত্য’ রয়েছে।

এল-সাইদ বলেন, ‘আপনি ধরে নিচ্ছেন… আমি মুসলিম বলেই কোনোভাবে এমন কিছুর প্রতি আমার আনুগত্য থাকবে, যা আমাদের সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’ পরে তিনি আরো বলেন, ‘আমার কাছে ওই সংবিধানই পথনির্দেশক আলো।’ বাক্যবিনিময়ের পর ওই ব্যক্তি সভাস্থল ছেড়ে চলে যান। এ সময় উপস্থিত জনতা এল-সায়েদের পক্ষে উল্লাস করে।

পরিবারের অতীত নিয়ে প্রশ্ন

এল-সাইদকে লক্ষ্য করে রিপাবলিকানদের আক্রমণের মধ্যে তার সৎবোনের পুরোনো কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট নতুন করে সামনে এসেছে। এর মধ্যে ২০১২ সালের একটি পোস্টও রয়েছে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, সত্তরের দশকের শুরুর দিকে কলেজে পড়ার সময় মুসলিম ব্রাদারহুডে তার মায়ের সক্রিয়তা নিয়ে মায়ের সঙ্গে তার ‘অসাধারণ একটি আলোচনা’ হয়েছে।

এল-সাইদ বলেছেন, সত্তরের দশকে মিসরে তার মা কী করতেন, তা তিনি জানেন না। তার ব্যাখ্যা, মা-বাবার বিচ্ছেদের সময় তার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। এরপর বহু বছর তিনি মায়ের সঙ্গে দেখা করেননি। মিশিগানে মূলত তার বাবা ও সৎমায়ের কাছেই তিনি বড় হয়েছেন।

২০১২ সালে এল-সাইদ তৎকালীন মিসরীয় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে সমর্থন করে একটি খোলা চিঠিতেও স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই বছরের শুরুতে মিসরের কর্তৃত্ববাদী সরকার উৎখাতের পর মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থনে মুরসি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এর এক বছর আগে তিনি ‘হাফিংটন পোস্টে’ একটি মতামত নিবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে মিসরের তরুণ আরব বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মিসরে গণতন্ত্রকে সমর্থন করলে দেশটি মুসলিম ব্রাদারহুডের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে—এমন উদ্বেগকে গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

সম্প্রতি এক বিতর্কে রজার্স উল্লেখ করেন, এল-সাইদের মা ইসলামিক আমেরিকান রিলিফ এজেন্সিতে কাজ করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ২০০৪ সালে সংস্থাটিকে সন্ত্রাসবাদে সহায়তাকারী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল।

এল-সাইদ প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি আমার মাকে আক্রমণ করছেন?’ রজার্স বলেন, ‘আমি ওই সংস্থার বিরুদ্ধে কথা বলছিলাম, যার বিরুদ্ধে আল-কায়েদার কাছে অর্থ পাঠানোর অভিযোগে মামলা হয়েছিল। দেখুন, তিনি আপনার মা। আমার মা একটি ছোট বাণিজ্য চেম্বারে কাজ করতেন। এ বিষয়ে আমি যেকোনো দিন আমার মাকে সামনে আনতে পারি।’

জবাবে এল-সাইদ বলেন, তিনি একজন ‘বাবা ও চিকিৎসক’। তিনি চান, ‘রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব দূর হোক, মানুষের পকেটে অর্থ থাকুক এবং সবার জন্য মেডিকেয়ার চালু হোক।’ তার অভিযোগ, রজার্স ‘নিজের কর্মকাণ্ডের রেকর্ড ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়কে সামনে আনতে চান’।

সন্ত্রাসী নজরদারি তালিকায় আত্মীয়ের নাম ওঠার বিষয়েও বক্তব্য

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এল-সাইদ তার স্ত্রীর বোন মারিয়াম জুকাকুকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সন্ত্রাসী নজরদারি ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও কথা বলেছেন। ২০১৬ সালে একটি দলগত মামলার অংশ হিসেবে জুকাকু এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

জুকাকুকে কেন ওই তালিকায় রাখা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। তিনি একসময় ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়িতে শিক্ষাদান করেন এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর সন্ত্রাসী নজরদারি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। স্ত্রীর বোনের নাম ওই তালিকায় থাকার বিষয়ে ফক্স নিউজের প্রশ্নের জবাবে এল-সাইদ বলেন, ‘তিনি কোনো অন্যায় করেননি। তাকে ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, এরপর তিনি মামলা করেন এবং তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়ে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখানে এমন একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে মানুষকে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগেই দোষী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, তাদের নাম ভিন্ন ধরনের। মাইক রজার্সের মতো লোকেরা যে কাঠামো তৈরি করেছেন, তার কারণেই এমনটা হচ্ছে।’

(এরিক ব্র্যাডনার এর প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন জেফ জেলেনি ও আলিনা ফায়াজ।)

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশা কি অতিরিক্ত বেশি

যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলে ভর্তিতে জাতিগত বৈষম্যের মামলা শুনবে সুপ্রিম কোর্ট

ট্রাম্পের পর ইসরাইলের প্রতি বৈরী মার্কিন নেতৃত্বের শঙ্কায় নেতানিয়াহু

ট্রাম্পকে নিয়ে উদ্বেগ-হতাশায় অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক: জরিপ

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ‘নো কিংস’ সমাবেশ, মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগাম ভোটের আহ্বান

বাসায় তল্লাশি ও মালামাল জব্দের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর

ক্লিনটন-ওবামার বিরুদ্ধে অনেক তথ্য আছে, চাইলেই বড় পদক্ষেপ নিতে পারি: ট্রাম্প

ছড়িয়ে পড়ছে ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল, ৬ হাজার বাড়ি খালি করার নির্দেশ

যে কারণে রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করলেন ট্রাম্প

পাঁচ দিনের মাথায় হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির পদ ছাড়ছেন কেটি জাকারিয়া