মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক জয় প্রযুক্তি শিল্পের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের বেশকিছু ভোটাভুটিতে ডেটা সেন্টারের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন ভোটাররা। এমনকি যেসব ক্ষেত্রে সরাসরি ডেটা সেন্টার নিয়ে ভোট হয়নি, সেখানেও ভোটাররা এমন সব রাজনীতিবিদদের নির্বাচিত করেছেন, টেক্সাসের নবনির্বাচিত গভর্নর জিনা হিনোজোসাসসহ যারা ডেটা সেন্টার সীমিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। খবর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের এ ফল প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিস্তারের জন্য বিপুল বিনিয়োগে যেসব প্রতিষ্ঠান ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে, তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাধার মুখে পড়তে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে জনমত বাড়ছে। পরিবেশের ওপর প্রভাব, পানির ব্যবহার এবং প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা বজায় রাখার প্রবণতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
টেকক্রাঞ্চের ‘ইকুইটি’ পডকাস্টের সাম্প্রতিক এক পর্বে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল প্রযুক্তি শিল্পে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেন সংবাদমাধ্যমটির সাংবাদিক শন ও’কেন, কার্স্টেন কোরোসেক ও অ্যান্থনি হা। আলোচনায় উঠে আসে, রিপাবলিকান পার্টিকে প্রায় ৫০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েও ইলন মাস্ক রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাশিত সুবিধা পাননি। বরং তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর থাকা অঙ্গরাজ্য টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে।
পডকাস্টে শন ও’কেন বলেন, ডেটা সেন্টার নির্মাণে অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী ইলন মাস্ক রিপাবলিকানদের সবচেয়ে বড় দাতাদের একজন। অথচ বিপুল অর্থ অনুদান দেওয়ার পরও তার প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণ সীমিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন গভর্নরের অবস্থান প্রযুক্তি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের পক্ষে বা বিপক্ষে বেশকিছু স্থানীয় ভোটাভুটি হয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রস্তাবে ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিধিনিষেধ আরোপ বা সাময়িক স্থগিতাদেশের কথা ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব বিধিনিষেধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কোম্পানিগুলোর জন্য কঠিন হতে পারে।
পডকাস্টে অ্যান্থনি হা বলেন, ডেটা সেন্টার নিয়ে ভোটাভুটি সব এলাকায় না হলেও এ ইস্যুতে দেশজুড়ে এক ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি দলীয় বিভাজন ছাড়িয়ে রিপাবলিকান, স্বতন্ত্র ও ডেমোক্র্যাট—সব ধরনের ভোটারের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। তবে ডেমোক্র্যাটরা এই জনমতকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে বেশি সফল হয়েছেন। এআইবিরোধী এবং বিশেষ করে ডেটা সেন্টারবিরোধী মনোভাব এবারের নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে বলে মনে করে তিনি।
তিনি আরো বলেন, আগামী দুই বছর এবং এর পরেও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও ডেটা সেন্টার নির্মাণকারী কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় জনগণ এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হতে পারে। ২০২৮ সালের নির্বাচনেও বিষয়টি কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে কোম্পানিগুলোর ভাবার কারণ রয়েছে।
ডেটা সেন্টারবিরোধী মনোভাবের পেছনে প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় কোম্পানিগুলোর গোপনীয়তা বজায় রাখার প্রবণতাকে দায়ী করেছেন কার্স্টেন কোরোসেক। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নির্বাচিত বা নিয়োগপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে গোপনীয়তা চুক্তি (এনডিএ) করে প্রকল্পের অনুমোদন নিয়েছে। প্রকল্পের আকার, পরিবেশের ওপর প্রভাব কিংবা পানির ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্যও অনেক সময় প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকটপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তার মতে, এসব কারণে শুধু ডেমোক্র্যাট নয়, রিপাবলিকান ও স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যেও ডেটা সেন্টার নিয়ে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। তবে ডেটা সেন্টারবিরোধী অবস্থানই ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনি জয়ের একমাত্র কারণ ছিল না।
এদিকে, জনমতের চাপের মুখে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নীতিতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পডকাস্ট আলোচনায় কোরোসেক বলেন, ওপেনএআই সম্প্রতি কম্পিউট ক্যাম্পাস পলিসি ব্লুপ্রিন্ট প্রকাশ করেছে। এতে ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশ, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা কমানোর কথা বলা হয়েছে। কোম্পানিটি ভবিষ্যতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে এনডিএ নেওয়ার নীতি থেকেও সরে আসার কথা জানিয়েছে।
নির্বাচনের ফলের পাশাপাশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য আরেকটি চাপ তৈরি করছে পুঁজিবাজার। ফলে একদিকে রাজনৈতিক ও নিয়ন্ত্রক বাধা, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ—দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়তে পারে ডেটা সেন্টার নির্মাণ খাত। তবে এআই প্রযুক্তির কাঙ্ক্ষিত বিস্তার ঘটাতে বড় আকারের কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রয়োজন। সে কারণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে শেষ পর্যন্ত নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ করতেই হবে। বাড়তি বিধিনিষেধ ও অর্থায়নের চাপের মধ্যে তারা কোথায় এবং কীভাবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেÑসেটাই এখন বড় প্রশ্ন।