ক্যানসারের চিকিৎসায় শত বছরের ব্যর্থতার পর নতুন আশার আলো দেখিয়েছে মডার্না ও মার্কের যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক এমআরএনএ ক্যানসার টিকা। প্রাথমিক পর্যায়ের নয়, বরং শেষ ধাপের পরীক্ষায় এই প্রথম কোনো থেরাপিউটিক ক্যানসার টিকা সফলতার ইঙ্গিত দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্না ও মার্কের তৈরি টিকাটি ১ হাজারের বেশি রোগীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ের মেলানোমা ক্যানসার অস্ত্রোপচারের পর পুনরায় ফিরে আসা বা শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমিয়েছে। পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে গবেষক ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাফল্য রোগীর ক্যানসারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি ‘পার্সোনালাইজড’ বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক টিকার নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।
ফোনকলেই এলো দীর্ঘ প্রতীক্ষার খবর
গত ১৩ আগস্ট রাতে বন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে একটি লেবানিজ রেস্তোরাঁয় ছিলেন মডার্নার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্টেফান বানসেল। সেখানেই তিনি পান বহুল প্রতীক্ষিত ফোনকলটি—মডার্না ও মার্কের যৌথভাবে তৈরি ক্যানসার টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফল হয়েছে।
বানসেল জানান, খবরটি তাকে ২০২০ সালের শেষ দিকে মডার্নার কোভিড-১৯ টিকার পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে আনন্দের মুহূর্ত খুব বেশি স্থায়ী হয়নি। ফলাফল হাতে আসার পরপরই পরবর্তী করণীয় নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়।
মার্ক রিসার্চ ল্যাবরেটরিজের প্রেসিডেন্ট ডিন লির কাছেও বিষয়টি ছিল একই রকম। তার ভাষায়, এটি শুধু ‘আনন্দের মুহূর্ত’ নয়—বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কাজ শুরু করার সময়।
এক দশকের গবেষণার ফল
মডার্না ও মার্কের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রায় এক দশকের গবেষণা। ২০১৬ সালে ক্যানসারের টিকা তৈরির জন্য আনুষ্ঠানিক অংশীদারত্ব করে দুই প্রতিষ্ঠান। চুক্তির আওতায় মার্ক ২০১৬ সালে ২০ কোটি ডলার এবং ২০২২ সালে আরো ২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। গবেষণার খরচ ও ভবিষ্যৎ মুনাফা দুই প্রতিষ্ঠান ভাগ করে নেওয়ার কথা।
সেই সময় মার্কের ক্যানসার চিকিৎসার ওষুধ কিট্রুডা নতুন ধরনের ইমিউনোথেরাপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। এই ধরনের ওষুধ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্বাভাবিক বাধা সরিয়ে দেয়।
মার্কের গবেষণা বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, কিট্রুডা বিজ্ঞানীদের দেখিয়েছে যে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্যানসার কোষ শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু ক্যানসার কোষও নিজেদের রক্ষার জন্য নানা ধরনের বাধা তৈরি করে। কিট্রুডা সেই বাধা দূর করতে সাহায্য করে।
এরপর গবেষকেরা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার বিভিন্ন উপায় খুঁজতে থাকেন। তবে বহু প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
মডার্নার সাবেক প্রধান মেডিকেল কর্মকর্তা তাল জ্যাকসও ক্যানসারের টিকা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তার ভাষায়, অতীতে তারা বহুবার ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু এমআরএনএ প্রযুক্তি, ক্যানসারের জেনেটিক সিকোয়েন্সিংয়ের খরচ কমে যাওয়া এবং ইমিউনোথেরাপির অগ্রগতি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
কীভাবে কাজ করবে এই টিকা?
নতুন টিকাটির নাম ইন্টিসমেরান অটোজিন । এটি প্রচলিত টিকার মতো কোনো সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য নয়। বরং রোগীর নিজের ক্যানসার কোষে থাকা নির্দিষ্ট জেনেটিক পরিবর্তন শনাক্ত করে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সেই ক্যানসার কোষ আক্রমণ করতে প্রশিক্ষিত করে।
এ ক্ষেত্রে প্রথমে রোগীর টিউমারের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর ওই রোগীর ক্যানসারে থাকা নির্দিষ্ট মিউটেশন বা জেনেটিক পরিবর্তনকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক টিকা তৈরি করা হয়।
আগের ক্যানসার টিকাগুলো সাধারণত একটি বা দুটি নির্দিষ্ট মিউটেশনকে লক্ষ্য করার চেষ্টা করত। কিন্তু নতুন এমআরএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে একসঙ্গে অনেক বেশি মিউটেশনকে লক্ষ্য করা সম্ভব হয়েছে।
এই টিকাটি সর্বোচ্চ ৩৪টি নির্দিষ্ট ক্যানসারের লক্ষ্যবস্তু বা ‘টার্গেট’কে শনাক্ত করার জন্য রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষিত করতে পারে। ফলে কোনো একটি লক্ষ্যবস্তু কাজ না করলেও অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তু ক্যানসার কোষ শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে।
মেলানোমাকেই কেন বেছে নেওয়া হলো?
গবেষকেরা প্রথমে মেলানোমা ক্যানসারকে বেছে নেন। কারণ অন্যান্য অনেক ক্যানসারের তুলনায় মেলানোমায় জেনেটিক মিউটেশনের সংখ্যা বেশি। একই সঙ্গে এই ক্যানসারের বিরুদ্ধে কিট্রুডার কার্যকারিতারও ভালো রেকর্ড রয়েছে।
গবেষণায় এমন রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাদের প্রাথমিক পর্যায়ের মেলানোমা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর হাতে থাকা সময়টি গবেষকদের রোগীর টিউমারের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক টিকা তৈরির সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া তৈরির জন্যও পাওয়া যায় প্রয়োজনীয় সময়।
গবেষকেরা টিকাটিকে কিট্রুডার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। কিট্রুডা শরীরের টি-সেল বা রোগপ্রতিরোধী কোষগুলোকে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে সক্রিয় হতে সহায়তা করে, আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক টিকা ওই টি-সেলগুলোকে নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষ শনাক্ত করার ‘ঠিকানা’ বা লক্ষ্যবস্তু দেয়।
বাজারে এলে শত কোটি ডলারের সম্ভাবনা
টিকাটি সফলভাবে অনুমোদন পেলে মডার্না ও মার্ক—দুই প্রতিষ্ঠানই বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে এর অনুমোদন আগামী বছরই পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মার্কের জন্য এই টিকার সাফল্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চলতি দশকের শেষ দিকে কিট্রুডার পেটেন্ট সুরক্ষা শেষ হওয়ার কথা। অন্যদিকে কোভিড-১৯ টিকার চাহিদা কমে যাওয়ার পর মডার্নার জন্য ক্যানসার টিকা নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
টিকার পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মডার্নার শেয়ারের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে টিকাটি বছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের বিক্রি করতে পারে।
সামনে আরো বড় পরীক্ষা
তবে গবেষকদের সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মেলানোমার মতো যেসব ক্যানসারে জেনেটিক মিউটেশনের সংখ্যা বেশি, সেখানে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর—তা কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। কিন্তু ফুসফুস, কিডনি ও অগ্ন্যাশয়ের মতো তুলনামূলক কম মিউটেশনযুক্ত ক্যানসারে একই পদ্ধতি সফল হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
গবেষকেরা মেলানোমার পরীক্ষার তথ্য আরো বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে টিকাটির কার্যকারিতা বাড়ানোর পথও খুঁজছেন।
মডার্নার সিইও স্টেফান বানসেলের কথাতেও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ইঙ্গিত রয়েছে। তার মতে, বর্তমান সংস্করণটিই ইন্টিসমেরানের শেষ সংস্করণ নয়।
শত বছরের ব্যর্থতার পর এই সাফল্য তাই শুধু একটি নতুন ক্যানসার টিকার সম্ভাবনাই তৈরি করেনি; বরং প্রতিটি রোগীর ক্যানসারের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদা করে তৈরি চিকিৎসার একটি নতুন যুগের সম্ভাবনাও সামনে এনেছে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন
এআরবি