হোম > বিশ্ব > আমেরিকা

ইসলামবিদ্বেষ ও ট্রাম্পের কটাক্ষ উপেক্ষা করে নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন আল-সাইয়েদ

আমার দেশ অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইতিহাস গড়েছেন মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বর্ণবাদী মন্তব্য, ইসলামবিদ্বেষী আক্রমণ এবং নানা অপপ্রচারের জবাব দিয়েছেন নির্বাচনে জয়ী হয়ে। তার এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটর নির্বাচিত হলেন ৪২ বছর বয়সী এই চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ও ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন আল-সাইয়েদ। ৯৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে তিনি ৫২ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বুধবার ভোরে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ও ভ্যান্সকে সরাসরি কটাক্ষ করেন তিনি। নির্বাচনের আগে ট্রাম্প তার নাম নিয়ে উপহাস করেছিলেন। এমনকি তাকে ‘জিহাদি’ বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ভ্যান্স তাকে ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।

বিজয়ী ভাষণে এল-সাইয়েদ বলেন, ‘জেডি, হাবিবি (আরবি ভাষায় স্নেহ প্রকাশের শব্দ), বিষয়টি বেশ বিদ্রূপাত্মক। আগামী জানুয়ারিতে সংবিধান অনুযায়ী তোমাকেই আমাকে শপথ পড়াতে হবে। ডোনাল্ড, আমি জানি আমার নাম উচ্চারণ করতে তোমার সমস্যা হয়। তাই জেডি যখন আমাকে শপথ পড়াবে, তখন তুমি আমাকে সিনেটর বলে ডাকতে পারো। মিশিগানে যেন তোমাদের মতো কাউকে আর কখনো দেখতে না হয়।’

নির্বাচনের আগে তার ধর্মীয় পরিচয়, নাম ও মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে নানা ধরনের আক্রমণ চালানো হয়েছিল। বিশেষ করে ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করায় তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

তবে বিজয়ী হওয়ার পর এল-সাইয়েদ বলেন, যেসব অভিভাবক সন্তানদের বোঝাতে হিমশিম খেয়েছেন কেন একজন প্রেসিডেন্ট কারও নাম কিংবা প্রার্থনার ধরন নিয়ে প্রকাশ্যে উপহাস করেন, তারা যেন সন্তানদের বলতে পারেন—শেষ পর্যন্ত অন্যায়ের পক্ষের লোকেরাই হেরেছে।

মিশিগানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা

মিশিগানের ডেট্রয়েট মহানগর এলাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা আল-সাইয়েদের। তার পরিবারের আদি নিবাস মিসরে। অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা বিভিন্ন সময় তুলে ধরেছেন তিনি। তার ভাষায়, অন্য অনেক অভিবাসী পরিবারের মতো তাদের পরিবারেও সন্তানদের পড়াশোনা ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভালো ফল করার প্রত্যাশা ছিল।

শিক্ষাজীবনে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছেন আল-সাইয়েদ। ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। ওই বছর তার ব্যাচের সেরা শিক্ষার্থীও ছিলেন তিনি। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তার বক্তব্যের প্রশংসা করেন। ধর্মীয় বিভাজন পেরিয়ে মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সমতার বার্তা দেওয়ার জন্য এল-সাইয়েদের বক্তব্যকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন ক্লিনটন।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রোডস স্কলার হিসেবে পড়াশোনা করেন তিনি। পাশাপাশি নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন।

রাজনীতিতে আসার আগে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মহামারিবিদ হিসেবে কাজ করেছেন আল-সাইয়েদ। একপর্যায়ে ডেট্রয়েট স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ওয়েন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবসেবা ও ভেটেরানবিষয়ক বিভাগের পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সারাহ জুকাকুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ তিনি। তাদের দুই মেয়ে রয়েছে।

গভর্নর নির্বাচনে হেরে রাজনীতিতে পরিচিতি

২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করেন আল-সাইয়েদ। স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং করপোরেট প্রভাবের বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল তার প্রচারের মূল বিষয়।

তবে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে হেরে যান তিনি। পরে হুইটমারই মিশিগানের গভর্নর নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে পরাজিত হলেও প্রগতিশীল রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পান এল-সাইয়েদ।

স্বাস্থ্যসেবা, ফিলিস্তিন ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অবস্থান

এল-সাইয়েদের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা। তিনি ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ কর্মসূচির সমর্থক। এ ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিকের জন্য সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বাজার ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়েও সরব তিনি।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের কঠোর সমালোচক এল-সাইয়েদ। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন তিনি। একই সঙ্গে ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

ইরান যুদ্ধকে ‘বোকামিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে তিনি অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অযৌক্তিক সামরিক সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।

গাজায় ইসরাইলি সরকারের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, মার্কিন করদাতাদের অর্থ যুদ্ধের পরিবর্তে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুযত্নের মতো খাতে ব্যয় করা উচিত।

বিজয় ভাষণে ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। আল-সাইয়েদ বলেন, ফিলিস্তিনি শিশুরা যেন তাদের পূর্বপুরুষদের ভূমিতে নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে—এমন দাবি করলেই কাউকে বিদ্বেষী বলা যায় না। শান্তি, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সমান অধিকার চাওয়া ঘৃণা নয়, বরং ভালোবাসার প্রকাশ।

এ ছাড়া কানাডার সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ ও শুল্কনীতিরও সমালোচনা করেছেন তিনি। তার মতে, কানাডার সঙ্গে মিশিগানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ট্রাম্পের শুল্কনীতি অঙ্গরাজ্যটির অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

প্রাথমিক নির্বাচনেও বড় চমক

২০২৬ সালে অবসর নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সিনেট নির্বাচনের প্রচার শুরু করেন আল-সাইয়েদ। মিশিগান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য হওয়ায় শুরু থেকেই এ নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

গত আগস্টে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে কংগ্রেস সদস্য হেইলি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে বড় চমক দেখান তিনি। এই জয়কে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। একই সঙ্গে ইসরাইলপন্থী প্রভাবশালী লবি আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (এআইপ্যাক) জন্যও এটি ছিল বড় ধাক্কা। কারণ, সংস্থাটি প্রকাশ্যেই স্টিভেন্সের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

প্রাথমিক নির্বাচনে প্রচার চালাতে ৫ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হয়। এর মধ্যে স্টিভেন্সের পক্ষে এআইপ্যাক অন্তত ৩ কোটি ডলার ব্যয় করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাথমিক নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরো স্টিভেন্স প্রথমে নভেম্বরের নির্বাচনে আল-সাইয়েদকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ভোটের কয়েক দিন আগে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সের প্রতি সমর্থন জানান। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।

ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে অপপ্রচার

নির্বাচনি প্রচারের পুরো সময়ই ইসলামবিদ্বেষী আক্রমণ ও নানা অভিযোগের মুখে পড়তে হয়েছে আল-সাইয়েদকে। উগ্র ডানপন্থী ভাষ্যকাররা তার বক্তব্যে ব্যবহৃত আরবি শব্দ ‘ইনশাআল্লাহ’ নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেন। শব্দটির অর্থ ‘আল্লাহ চাইলে’। এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ধর্মীয় হুমকি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।

ট্রাম্প তার বিরুদ্ধে ইহুদি ও ইসরাইলবিদ্বেষের অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স দাবি করেন, মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি আল-সাইয়েদের সহানুভূতি ও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

অক্টোবরে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ টেলিভিশন বিতর্কেও রজার্স তার সমর্থকদের সঙ্গে হামাসের মতো সংগঠনের সমর্থকদের মিল রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেন। এল-সাইয়েদের রাজনৈতিক অবস্থানকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবেও তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেন আল-সাইয়েদ।

বিজয়ের পর এসব আক্রমণের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বর্ণবাদ, বর্ণবৈষম্য কিংবা গণহত্যার পক্ষে অর্থ ব্যয় করতে চান না তারা। ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে কথা বলাকে বিদ্বেষ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এত দিন তাদের প্রচারে ‘ইনশাআল্লাহ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে জয়ের প্রত্যাশা প্রকাশ করতে। কিন্তু আজ সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়ায় তারা বলতে পারেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ’—অর্থাৎ সব প্রশংসা আল্লাহর।

আল-সাইয়েদের এই জয় শুধু একজন মুসলিমের সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে প্রগতিশীল রাজনীতির শক্তি বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক নীতির বিরোধিতাকে সামনে রেখে তার উত্থান দেশটির প্রচলিত রাজনৈতিক অবস্থানের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সূত্র: আল জাজিরা

এআরবি

ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় ব্রিটিশ মডেল অনুসরণ করতে চায় মার্কিন ডেমোক্র্যাটরা

ইরান যুদ্ধই আমাদের পরাজয়ের কারণ, বললেন জেডি ভ্যান্স

মার্কিন নির্বাচনের পরই চার দেশের জন্য হরমুজ খুলল ইরান

ট্রাম্পের কটাক্ষের জবাব দিলেন বিজয়ী আবদুল আল-সাইয়েদ

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কেমন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক

মার্কিন নির্বাচনে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে যে ৪ ঘটনা

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পুনর্নির্বাচিত মুসলিম নারী লতিফা সাইমন

কংগ্রেস নির্বাচনে বড় ব্যবধানে এগিয়ে আফগান বংশোদ্ভূত আয়েশা ওয়াহাব

ইরান যুদ্ধ নিয়ে এবার প্রশ্ন তুলবে কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটরা

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রেকর্ড গড়লেন যেসব মুসলিম প্রার্থী