যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের অর্থনীতির সাফল্য নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তার শাসনামলে মার্কিন নাগরিকদের আয় বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি কমেছে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ‘বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সবচেয়ে গতিশীল।’
গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্পের ব্যাপকভিত্তিক ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক আরোপের পর মার্কিন অর্থনীতি যতটা খারাপ অবস্থায় পড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তবে পরিস্থিতি তার চেয়ে ভালো।
তবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, এসব আমদানি শুল্ক এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের প্রভাবে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব ভোগ করতে হচ্ছে অধিকাংশ মার্কিন পরিবারকে।
অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ মার্কিন অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে। তবে এ খাতে বিনিয়োগের গতি থেমে গেলে দেশটির অর্থনীতিও বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।
তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের কাছে দেশটির অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি কেমন? ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কি সত্যিই জি-৭ জোটের অন্য দেশগুলোর তুলনায় দ্রুত এগোচ্ছে?
জি-৭-এর অন্য দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতি বেশ ভালো গতিতেই এগোচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, মার্কিন জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন, যা দিয়ে অর্থনীতিবিদেরা একটি দেশের অর্থনীতির আকার পরিমাপ করেন, বর্তমানে বার্ষিক ২ দশমিক ২ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে, অর্থাৎ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক আগের সময় থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ। এই সময়ে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোর সংগঠন জি-৭-এর অন্য যেকোনো সদস্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির হার বেশি।
এদিকে, দেশটির ভোটারদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও আগ্রহ রয়েছে। কারণ, এই খাতে বিনিয়োগের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি জড়িত। ওপরের চিত্রে মার্কিন অর্থনীতিতে এআই ডেটা সেন্টারগুলোতে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
ট্রাম্পের শুল্ক ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি?
নিচের চিত্রে ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার কীভাবে বেড়েছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অনেক মার্কিন ভোটার সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। কারণ, করোনা মহামারির পর পণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সৃষ্ট ভোগান্তির জন্য তারা বাইডেনকেই দায়ী করেছিলেন।
তবে ২০২২ সালে বাইডেনের শাসনামলে মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে পৌঁছেছিল। বর্তমান হার সেই তুলনায় অনেক কম। অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর যেসব নতুন শুল্ক আরোপ করেছেন, সেগুলো না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার আরো কম থাকত।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায় ইরান যুদ্ধের প্রভাবেও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ৫২ ডলারে পৌঁছায়, যা ছিল রেকর্ড। ডিজেল কৃষিকাজ ও শিল্পকারখানায় বহুল ব্যবহৃত একটি জ্বালানি। ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে গরুর মাংস ও কফির মতো কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে এ সময়ে ডিমের দাম কিছুটা কমেছে।
বাড়ছে পরিবারের আয়, তবে সবাই সমান সুবিধা পাচ্ছে না
এদিকে, ট্রাম্পের শাসনামলেও মার্কিন পরিবারগুলোর গড় আয় বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে হিসাব করলে, ২০২৫ সালে দেশটির মধ্যম আয় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৮৭ হাজার ৪৬০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
তবে ‘ইনস্টিটিউট অন ট্যাক্সেশন অ্যান্ড ইকোনমিক পলিসি’ (আইটিইপি) নামের একটি থিংক ট্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালে মধ্যম আয়ের ২০ শতাংশ পরিবার আগের তুলনায় গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ডলার কম সুবিধা পাচ্ছে। একইভাবে, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবার পাচ্ছে প্রায় ৭৫০ ডলার কম সুবিধা।
অন্যদিকে, প্রধানত ট্রাম্পের কর ছাড়ের নীতির কারণে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষ অন্যান্য পরিস্থিতির তুলনায় গড়ে ১২ হাজার ৫৬০ ডলার বেশি সুবিধা পাচ্ছেন বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
মার্কিন পরিবারগুলোর বিভিন্ন আয়স্তরের ওপর শুল্কের প্রভাব নিয়ে আইটিইপির এই প্রাক্কলন মূলত ট্যাক্স ফাউন্ডেশন নামের আরেকটি থিংক ট্যাংকের হিসাবের সঙ্গে মিলে যায়।
প্রত্যাশার তুলনায় কম কর্মসংস্থান সৃষ্টি
ট্রাম্প বলেছিলেন, তার শুল্কনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থানে ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটবে। তার যুক্তি ছিল, শুল্ক এড়াতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নতুন কারখানা গড়ে তুলবে। এর ফলে দেশে বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে মার্কিন অর্থনীতিতে প্রতি মাসে গড়ে ৩৪ হাজার নতুন চাকরি যুক্ত হয়েছে। অথচ বাইডেনের প্রেসিডেন্সির শেষ বছরে প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ২২ হাজার নতুন চাকরি তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ, বাইডেনের শেষ বছরের তুলনায় ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি অনেকটাই কম।
বাড়ছে সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। এর পেছনে তার উল্লেখযোগ্য কর ছাড়ের নীতিও কিছুটা দায়ী। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে মার্কিন ফেডারেল সরকারের বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, ওই সময়ে কর থেকে সরকারের আয় এবং সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান ছিল ২ ট্রিলিয়ন ডলার। এই ঘাটতির পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ শতাংশের সমান। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজেট ঘাটতির পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এআরবি