বিদেশি কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে মার্কিন কর্মীদের চাকরিচ্যুত করার অভিযোগে মাইক্রোসফটসহ আটটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নতুন ও বিচারাধীন স্থায়ী নিয়োগসংক্রান্ত আবেদন অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান দেশটির শ্রমমন্ত্রী কিথ সন্ডারলিং।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানগুলো এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির অপব্যবহার করে আমেরিকান কর্মীদের বদলে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে।
ভ্যান্সের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে মাইক্রোসফট। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটি একই সময়ে প্রায় ছয় হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে এবং ৬ হাজার ৮০০টি এইচ-১বি ভিসার আবেদন করেছে। এর মাধ্যমে মার্কিন কর্মীদের সরিয়ে বিদেশি কর্মী নিয়োগ এবং তাদের মজুরি কমিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স বলেন, ‘আমেরিকার অন্য কোনো কোম্পানি মাইক্রোসফটের চেয়ে বেশি এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করেনি।’
মাইক্রোসফট ছাড়াও অ্যাডোবি, কগনিজেন্ট, ইনফোসিস, টাটা, উইপ্রো, এইচসিএল ও ক্যাপজেমিনির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন ভ্যান্স। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেননি তিনি।
শ্রমমন্ত্রী কিথ সন্ডারলিং বলেন, মাইক্রোসফটসহ আটটি প্রতিষ্ঠানের নতুন বা বিচারাধীন পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন (পার্ম) আবেদন অনুমোদন করবে না সরকার।
তার অভিযোগ, মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘ভিসা তৈরির কারখানায়’ পরিণত হয়েছে। তারা বিদেশি কর্মী দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভাসিয়ে’ দিচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে বিবিসি সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
মাইক্রোসফটের বক্তব্য
মাইক্রোসফটের দাবি, এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির অপব্যবহারের অভিযোগ সঠিক নয়।
কোম্পানিটির এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মাইক্রোসফটের অধিকাংশ কর্মীই আমেরিকান।
মুখপাত্র জানান, গত অর্থবছরে কোম্পানির দাখিল করা এইচ-১বি ভিসার আবেদনের ৮০ শতাংশই ছিল আগে থেকে কর্মরত কর্মীদের জন্য। এগুলো নতুন কর্মী নিয়োগের আবেদন ছিল না। এ ছাড়া এই কর্মসূচির আওতায় নিয়োগ পাওয়া আন্তর্জাতিক কর্মীদের একই পর্যায়ের মার্কিন কর্মীদের সমান পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।
বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করে এমন কোম্পানি এলিসের তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোসফটে এইচ-১বি ভিসাধারী একজন কর্মীর গড় বেতন বছরে ১ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার।
মাইক্রোসফটের মুখপাত্র বলেন, প্রশাসনকে এ বিষয়ে আরো তথ্য দিতে তারা আগ্রহী।
মাইক্রোসফটে বিশ্বজুড়ে দুই লাখের বেশি কর্মী রয়েছেন।
এইচ-১বি ও পার্ম কর্মসূচি কী
এইচ-১বি হলো যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষায়িত দক্ষতার প্রয়োজন হয়—এমন পেশায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের ভিসা কর্মসূচি। কয়েক দশক ধরে প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এই কর্মসূচির আওতায় আন্তর্জাতিক কর্মী নিয়োগ করে আসছে। বছরে এই ভিসার সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮৫ হাজারে সীমাবদ্ধ।
অন্যদিকে, পার্ম কর্মসূচি বিদেশি কর্মীদের স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগকর্তারা কোনো বিদেশি কর্মীর স্থায়ী নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম সনদ পেতে আবেদন করেন। পরবর্তী ধাপে এটি প্রায়ই গ্রিন কার্ড পাওয়ার পথ তৈরি করে। গ্রিন কার্ডধারীরা যুক্তরাষ্ট্রে অনির্দিষ্টকালের জন্য বসবাস ও কাজ করতে পারেন।
গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তর ১০টি ব্যবসায়িক বিভাগে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি পার্ম আবেদন অনুমোদন করেছে।
নাদেলাকে পুরস্কার, ভ্যান্সের সমালোচনা
মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য একটি পদক গ্রহণ করেন। নাদেলাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, তাকে এই পদক দিতে পেরে হোয়াইট হাউস ‘সম্মানিত’ এবং এটি তার যোগ্যতার প্রতিফলন।
নাদেলা ছাড়াও ইলন মাস্ক, জেনসেন হুয়াং, লিসা সু, সের্গেই ব্রিন ও মাইকেল ডেলসহ প্রযুক্তি খাতের আরো কয়েকজন ব্যক্তিত্ব ট্রাম্পের কাছ থেকে পদক পেয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক মধ্যাহ্নভোজ এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেও অংশ নিয়েছিলেন।
তবে একই দিন ভ্যান্সের সমালোচনার কেন্দ্রে ছিল মাইক্রোসফট। তিনি বলেন, ‘মাইক্রোসফটের প্রতি আমাদের বার্তা খুবই সহজ: আপনারা একটি মহান আমেরিকান কোম্পানি। আপনাদের অবশ্যই আমেরিকান কর্মী নিয়োগ করতে হবে। আপনারা আমেরিকান কর্মীদের ছাঁটাই করে তাঁদের জায়গায় বিদেশি চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ করতে পারেন না।’
ভ্যান্সের ব্যাখ্যা, কোনো বিদেশি কর্মীর ভিসার পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি চাকরিচ্যুত হলে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সাধারণত এ ধরনের কর্মীরা নতুন চাকরি খোঁজার জন্য ৬০ দিনের অতিরিক্ত সময় পান। গত মাসে মার্কিন সরকার এই সময়সীমা পুরোপুরি বাতিল করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় সবই এইচ-১বি কর্মসূচির আওতায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে। অ্যামাজন, গুগল, মেটা, অ্যাপল ও এনভিডিয়াও এ কর্মসূচি ব্যবহার করে আসছে। তবে ভ্যান্সের বৃহস্পতিবারের অভিযোগে এসব প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল না।
িএএম