হোম > বিশ্ব > আমেরিকা

ট্রাম্পের লাগাম কতটা টেনে ধরতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা

আলজাজিরা

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে দলটি। এখন প্রশ্ন, নির্বাচনি প্রচারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে তারা? জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং তার কঠোর অভিবাসন নীতির লাগাম টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা।

তবে আগামী জানুয়ারির আগে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে না দলটি। দায়িত্ব নেওয়ার পরও রিপাবলিকানদের সহযোগিতা ছাড়া তাদের পক্ষে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। সিনেটে কোনো বিল পাস করাতে সাধারণত ৬০ ভোট প্রয়োজন হয়। এর বাইরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো বিলের বিরোধিতা করলে তাতে ভেটো দিতে পারেন।

সোমবার একটি পডকাস্টে তিনি হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আমি সবকিছুতে ভেটো দেব।’

তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের হাতে নতুন কিছু ক্ষমতাও আসছে। সিনেটে বিভিন্ন পদে নিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় প্রভাব রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পাবে তারা। এসব কমিটির মাধ্যমে তদন্ত শুরু করা সম্ভব।

ফলে আগামী দুই বছরে ডেমোক্র্যাটরা বাস্তবে কী করতে পারবে এবং কোন কোন প্রতিশ্রুতি পূরণে তাদের বাধার মুখে পড়তে হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে পারবে কি ডেমোক্র্যাটরা?

মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। জ্বালানি, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও অর্থনীতিবিদ ডিন বাকের মনে করেন, জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি হতে পারে ইরান যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া।

গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলা এই সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইরান। এতে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

বাকেরের মতে, কংগ্রেসের তদন্ত ও তদারকির ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যুদ্ধ বন্ধের চাপ তৈরি করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। এতে ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। পররাষ্ট্রনীতির এই বিষয়ে কিছু রিপাবলিকানও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একমত হতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।

স্বাস্থ্যসেবাও এমন একটি বিষয়, যা সরাসরি মানুষের পকেটে প্রভাব ফেলে। বাকের বলেন, এ ক্ষেত্রেও দুই দলের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন বা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় দেওয়া বর্ধিত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক মার্কিন নাগরিকের স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম বেড়েছে। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা ওই ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইডে কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারে।

বাকেরের মতে, এ লক্ষ্য পূরণের একটি উপায় হতে পারে সরকারের ব্যয়সংক্রান্ত বিলে এসব পদক্ষেপ যুক্ত করা। কারণ, কংগ্রেসকে নিয়মিত সরকারি ব্যয় অনুমোদনের জন্য এ ধরনের বিল পাস করতে হয়। এতে ট্রাম্পের পক্ষে সেগুলো প্রত্যাখ্যান করা কঠিন হতে পারে।

বাকের বলেন, ‘ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে থাকা রিপাবলিকানরা মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া বন্ধ করা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করার পক্ষে থাকতে চাইবেন বলে মনে হয় না। ডেমোক্র্যাটরা এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যাতে ট্রাম্প ওই বিলে ভেটো দিতে না চান।’

ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ানোর আরেকটি কারণ ট্রাম্পের শুল্কনীতি। তবে বেকার মনে করেন, রিপাবলিকানদের বড় ধরনের সমর্থন ছাড়া এ নীতি বাতিল করা কঠিন হবে। কারণ, ট্রাম্প ভেটো দিলে তা অগ্রাহ্য করতে কংগ্রেসে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন হবে। এমনকি শুল্ক প্রত্যাহার করা গেলেও বাজারে পণ্যের দাম কমতে সময় লাগতে পারে।

উদারপন্থি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভের নীতি ও প্রচারবিষয়ক প্রধান অ্যালেক্স জ্যাকেজ বলেন, ‘দাম রকেটের মতো দ্রুত বাড়ে, কিন্তু পালকের মতো ধীরে কমে।’

তবে ট্রাম্পের অনুমোদন ছাড়াও দাম নিয়ন্ত্রণে ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি পথ রয়েছে বলে মনে করেন জ্যাকেজ। কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বিদ্যুতের বিল পর্যন্ত বাড়িয়েছে—এমন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারে তারা।

আলজাজিরাকে জ্যাকেজ বলেন, ‘কমিটির নেতৃত্বের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এবং প্রধান নির্বাহীদের তলব করে কংগ্রেসে হাজির করানোর মাধ্যমে বাস্তব কিছু ফল পাওয়ার অনেক নজির রয়েছে।’

এ ধরনের তদন্তে পণ্যের দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে কোম্পানিগুলোর ওপর তাদের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। এতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

ট্রাম্পকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবে কি ডেমোক্র্যাটরা?

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লরা ব্লেসিং মনে করেন, নতুন তদন্তের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কাজে লাগাবে ডেমোক্র্যাটরা।

আলজাজিরাকে ই-মেইলে তিনি বলেন, ‘সময় ব্যয় এবং সংবাদপত্রের শিরোনামের বিচারে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা যাবে এই ক্ষেত্রেই।’

হোয়াইট হাউসের অনুমতি ছাড়াই কংগ্রেস তদন্ত করতে পারে। এসব তদন্তের মাধ্যমে সরকারের ভেতরে ও বাইরে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা সম্ভব। এতে তার জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ বাড়তে পারে।

আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরুর পর ট্রাম্প পরিবারের সম্পদের উৎস নিয়ে তদন্তের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অনেক ডেমোক্র্যাট। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ প্রায় ২২০ কোটি ডলার বেড়েছে।

গত দুই বছরে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসার পরিধিও বেড়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভবিষ্যৎ বাজারের মতো বিভিন্ন খাতে তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। এসব খাতের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত সমর্থন রয়েছে।

সম্ভাব্য তদন্তের প্রস্তুতি হিসেবে ডেমোক্র্যাট সিনেটররা ইতোমধ্যে বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছেন। এসব চিঠিতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়েছে।

তদন্তের সম্ভাব্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণে অনুদান দেওয়া ব্যক্তিরা সরকারের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন কি না এবং বিচার বিভাগ ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের লক্ষ্যবস্তু করেছে কি না।

তবে তদন্তে সংশ্লিষ্ট সবাই সহযোগিতা করবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা আদালতে সমন চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। এতে তদন্তের গতি ধীর হয়ে যেতে পারে।

ব্লেসিং মনে করেন, ট্রাম্পের পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা সমন পেয়ে হাজির হবেন, এমনটা আশা করা কঠিন। তবে ডেমোক্র্যাটরা সরকারি কর্মকর্তা এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন।

তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া নিশ্চিত নয়। কারণ, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ট্রাম্পের অধীন বিচার বিভাগের।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অভিশংসনের উদ্যোগও নিতে পারেন আইনপ্রণেতারা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে একাধিক অভিযোগে অভিশংসনের প্রস্তাব আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়েই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার অভিযোগ।

রিপাবলিকান প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য থমাস ম্যাসি জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে বিদায়ী কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে হেগসেথের অভিশংসনের বিষয়ে ভোটাভুটি করতে উদ্যোগ নেবেন তিনি।

নিজের প্রথম মেয়াদে দুবার অভিশংসিত হওয়া ট্রাম্প অবশ্য তৃতীয়বার অভিশংসিত হওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এ নিয়ে তিনি ‘একটুও’ উদ্বিগ্ন নন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, তারা এমনটা করলে ডেমোক্রেটিক পার্টি ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ, কোনো কারণ ছাড়াই অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

হেগসেথের পক্ষেও কথা বলেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ‘খুব ভালো কাজ করছেন’।

তবে প্রতিনিধি পরিষদ কোনো কর্মকর্তাকে অভিশংসন করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সিনেটে বিচারপ্রক্রিয়া প্রয়োজন। কোনো নির্বাচিত কর্মকর্তাকে পদ থেকে সরাতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে। অর্থাৎ ট্রাম্প বা হেগসেথের মতো কাউকে সরাতে হলে বিপুলসংখ্যক রিপাবলিকান সিনেটরের সমর্থন প্রয়োজন হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানো হয়নি।

ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে কি ডেমোক্র্যাটরা?

নতুন কংগ্রেসের ১২০তম অধিবেশন শুরু হতে এখনো দুই মাসের কম সময় বাকি। এ সময়ের মধ্যে বিদায়ী কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে নিজের বাকি আইনগত অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারেন ট্রাম্প।

পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি মনে করেন, এই সময়ের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে ট্রাম্পের হাতে।

আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘অপমান ও পরাজয়ের মুখে ট্রাম্প আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন—এমন প্রবণতা তার মধ্যে দেখা গেছে।’

ডেমোক্র্যাটরা চাইলে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্যতামূলক প্রস্তাব আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণার একক ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। এ ছাড়া ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া শুরু করা কোনো সামরিক সংঘাত ৬০ দিনের বেশি চালানোর ক্ষেত্রে আইনপ্রণেতাদের তা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে ট্রাম্প প্রস্তাবিত পদক্ষেপে ভেটো দিতে পারেন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের উদ্যোগ সফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের ক্ষমতা সীমিত করতে ডেমোক্র্যাটদের হাতে আরেকটি শক্তিশালী হাতিয়ার রয়েছে। সেটি হলো সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ।

ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক অভিযানের জন্য আগে থেকে বরাদ্দ করা অর্থ ব্যবহার করতে পারবে। তবে ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

ত্রিতা পারসি বলেন, ‘এতে যুদ্ধ কত দিন চালানো যাবে, তার ওপর সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আ অর্থের প্রয়োজন হলে সেটি সামান্য কোনো অঙ্ক হবে না, যা সহজেই অন্য খাত থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।’

কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় যুদ্ধ পরিচালনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা। বিশেষ করে সামরিক অভিযানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আইন মেনে পরিচালিত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা সম্ভব।

সরকারি নজরদারিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রজেক্ট অন গভর্নমেন্ট ওভারসাইটের নীতি বিশ্লেষক ডেভিড জানোভস্কি বলেন, ‘কঠোর তদারকি নিজে থেকে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে পারবে না। তবে যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য এতটাই বাড়িয়ে দিতে পারে, যা প্রেসিডেন্ট বা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে উঠবে।’

তবে যুদ্ধ বন্ধে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

লরা ব্লেসিং বলেন, সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করার অভিযোগ উঠতে পারে—এমন আশঙ্কায় ডেমোক্র্যাটরা ঐতিহাসিকভাবে সামরিক খাতে অর্থ বরাদ্দ আটকে দিতে অনাগ্রহী।

তবে ত্রিতা পারসির মতে, এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকা রাজনৈতিকভাবে দলটির জন্য টেকসই হবে না। ইরানে মার্কিন সামরিক তৎপরতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে দলটির সমর্থকেরা একে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতি নীরব সমর্থন হিসেবে দেখতে পারেন।

পারসি বলেন, ‘তখন এটি আর শুধু ট্রাম্পের যুদ্ধ থাকবে না। যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা কিছু না করলে তারাও এই যুদ্ধের অংশীদার হয়ে যাবে।’

ট্রাম্পের অভিবাসন অভিযান নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কি ডেমোক্র্যাটরা?

নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি লক্ষ্য হতে পারে ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির লাগাম টানা।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণবহিষ্কার অভিযান পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প। এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে করা এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা বা আইসিই তাদের কার্যক্রমে ‘সীমা ছাড়িয়ে গেছে’।

কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর আইসিই এবং অভিবাসনবিরোধী অভিযানে যুক্ত অন্যান্য সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ল সেন্টারের নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হেইডি অল্টম্যান বলেন, এসব তদন্তে আটককেন্দ্রগুলোর পরিবেশ, নির্যাতনের অভিযোগ এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগে করদাতাদের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

অল্টম্যানের মতে, গত দুই বছরে ট্রাম্প প্রশাসনকে অভিবাসন আইন প্রয়োগের জন্য প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেস চাইলে সেই অর্থের একটি বড় অংশ ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে।

তিনি বলেন, বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ায় আইসিই প্রায় কোনো বাধা ছাড়াই কাজ করতে পারছে। কোন এলাকায় অভিযান চালানো হবে কিংবা কাদের আটক করা হবে, সে বিষয়ে তাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রয়োজনও কমে গেছে।

অল্টম্যান বলেন, ‘অভিযানের গতি কমানো এবং প্রকৃত অর্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও আইন প্রয়োগে নিয়ন্ত্রণ আনতে হলে আগের অধিবেশনে দেওয়া অর্থের বড় অংশ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।’

এ জন্য আইন পাস করতে হবে। তবে ট্রাম্প তাতে ভেটো দিতে পারেন। তা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটদের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন অল্টম্যান।

তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য সবচেয়ে খারাপ হবে হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং বলা যে আমাদের ক্ষমতা সীমিত। বিল পাস করুন, কী হয় দেখুন, প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠান। এরপর তাকে চ্যালেঞ্জ জানান—মার্কিন জনগণের বিপুল সমর্থন রয়েছে, এমন কোনো বিলে স্বাক্ষর না করার সাহস তিনি দেখাতে পারেন কি না।’

সব মিলিয়ে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও ট্রাম্পের নীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সহজ হবে না। তদন্ত, বাজেট নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তারা প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করতে পারবেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের সমর্থন এবং ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা তাদের সামনে বড় বাধা হয়ে থাকবে।

এএম

‘ইসলামপন্থি ও কমিউনিস্টদের দখলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি’

রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিগুলোও ডেমোক্র্যাটদের নতুন দুর্গ

রিপাবলিকানদের ভরাডুবি, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কে নতুন সংকটের আভাস

ডেমোক্র্যাটদের উদীয়মান তারকা জন অসফ, হতে পারবেন কি আগামীর ওবামা

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন মুসলিম প্রার্থীরা

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের জয়জয়কারÑ বিজয়ী ৩৪, ভোট গণনায় এগিয়ে ৩

ইসরাইল নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য, রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ছক ভাঙলেন যেসব প্রার্থী

ক্ষমতার ভিত নড়িয়ে দিলেন মার্কিন ভোটাররা, এখন কী করবেন ট্রাম্প

আবদুল আল-সাইয়েদের চিন্তা-দর্শন ও রাজনৈতিক উত্থান