যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনের ফল প্রকাশ আটকে দিতে আবারও আইনি উদ্যোগ নিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। রিপাবলিকান প্রার্থী ও বর্তমান সিনেটর ড্যান এস সুলিভান অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে গেলে নির্বাচনের ফলের অনুমোদন (সার্টিফিকেশন) ঠেকানোর আবেদন জানিয়ে সংশোধিত মামলা করেছে দেশটির বিচার বিভাগ।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারণে এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। এর মাত্র কয়েক দিন আগে বৃহস্পতিবার সংশোধিত মামলাটি করা হলো।
বিচার বিভাগের অভিযোগ, একই নামের আরেক প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে ডেমোক্র্যাটরা। আলাস্কার সিনেট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই অভিযোগ সামনে এসেছে। দেশটির সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সাতটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের একটি এটি। এসব আসনের ফলের ওপর নির্ভর করতে পারে সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার সম্ভাবনা।
আলাস্কায় বর্তমান সিনেটর সুলিভানকে হারিয়ে আসনটি দখলে নিতে লড়ছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলা। সুলিভান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত।
তবে বুধবার প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, পেলটোলার নির্বাচনী প্রচার দলের সদস্যরা ড্যান জে সুলিভান জুনিয়র নামের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে সিনেট নির্বাচনে প্রার্থী হতে উৎসাহিত করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, একই নামের প্রার্থীকে মাঠে নামিয়ে বর্তমান সিনেটর সুলিভানের ভোট ভাগ করে দেওয়া এবং তার পরাজয়ের পথ তৈরি করা।
ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে আইনি পদক্ষেপ নেয়। সুলিভান পুনর্নির্বাচিত হতে না পারলে আলাস্কাকে নির্বাচনের ফল অনুমোদন করতে না দেওয়ার লক্ষ্যেই সংশোধিত মামলাটি করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মামলার অংশ হিসেবে বিচার বিভাগ ৪০টি সমন জারি করেছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে ফৌজদারি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আলাস্কার গভর্নর মাইক ডানলিভি। তবে ড্যান জে সুলিভান জুনিয়রের প্রার্থিতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে মেরি পেলটোলার নির্বাচনী প্রচার শিবির।
বিচার বিভাগের আইনজীবীরা অবশ্য পেলটোলা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ এনেছেন। সংশোধিত মামলায় তারা লিখেছেন, ‘আলাস্কার ভোটারদের বিভ্রান্ত করা এবং পেলটোলাকে নির্বাচিত করার উদ্দেশ্যেই তারা ওই প্রার্থীর সাজানো প্রচার অভিযান পরিচালনা করেছেন।’
তবে নির্বাচনের ফল অনুমোদন আটকে দিতে বিচার বিভাগের এই উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের প্রশ্ন উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর। প্রেসিডেন্ট বা কেন্দ্রীয় সরকারের নয়। গত জুনে আলাস্কার সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, ড্যান জে সুলিভান জুনিয়র মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। একই নামের দুই প্রার্থীকে ঘিরে ভোটারদের বিভ্রান্তি কমাতে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে অঙ্গরাজ্যটির নির্বাচন কর্তৃপক্ষ।
প্রতিপক্ষের ভোট ভাগ করে দিতে একই ধরনের নামের প্রার্থী দাঁড় করানোর কৌশলকে ‘ব্যালট স্ট্যাকিং’ বলা হয়। আলাস্কায় দুই দলের প্রার্থীরাই অতীতে এ কৌশল ব্যবহার করেছেন। সাধারণভাবে এ ধরনের প্রার্থী দাঁড় করানোকে বেআইনি বলে বিবেচনা করা হয় না।
সমালোচকদের প্রশ্ন, সিনেটর সুলিভান হেরে গেলে নির্বাচনের ফল অনুমোদন স্থগিত রাখার যৌক্তিকতা কী? তাদের মতে, চূড়ান্ত ভোটের ফল দেখে ভোটারদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তা নির্ধারণ করা অসম্ভব।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালন করা জাস্টিন লেভিটও এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকারের আইনি এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি বলেন, ‘কোনো ফেডারেল আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এখানে উঠেছে, তা আমি বুঝতে পারছি না। এমন কোনো বিষয় থাকলেই কেবল বিচার বিভাগের এ বিষয়ে তদন্তের এখতিয়ার থাকতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এতে মনে হচ্ছে, তদন্তের মূল উদ্দেশ্যই হলো আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসা।’
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময় কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট কোন দলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা এই নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করছে। বর্তমানে ১০০ সদস্যের সিনেটে ৫৩টি আসন নিয়ে সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকানরা।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে মানুষের অসন্তোষ এবং ট্রাম্পের প্রতি ব্যাপক জনঅনাস্থাকে কাজে লাগিয়ে আসন বাড়ানোর আশা করছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে তিনি ফল মেনে না-ও নিতে পারেন। এর আগে তিনি নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগও তুলেছেন, যার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়াসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের ভোটপ্রক্রিয়া নিয়েও আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে তাঁর প্রশাসনের বিচার বিভাগ।
এএম