বিশ্বের বিভিন্ন সংকটের মধ্যে গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভুলে না যায়—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ এবং বিশ্বে ক্ষমতার পরিবর্তনশীল কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গুতেরেস বলেন, দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের গাজায় যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, বিশ্বের কোনোভাবেই সেদিক থেকে দৃষ্টি সরানো উচিত নয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজায় ইসরাইলের যে অভিযান শুরু হয়েছে, সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর নজিরবিহীন মাত্রায় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের বছরগুলোতে তিনি বহু যুদ্ধ ও সংকট দেখেছেন। তবে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যে মাত্রায় হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তা তার দেখা অন্য যেকোনো পরিস্থিতির তুলনায় ভিন্ন মাত্রার।
ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গেও রাশিয়ার সমালোচনা করেন গুতেরেস। তিনি রাশিয়ার ‘পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন’কে জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর ফলে ইউক্রেন একটি ‘নিষ্ঠুর যুদ্ধের’ মধ্যে পড়েছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধের সম্মুখসারির বাইরে এখনও বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন। এর বেশির ভাগ ঘটনা ইউক্রেনে ঘটলেও সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার কিছু এলাকাতেও বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
গুতেরেস আরো বলেন, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। প্রযুক্তিগত কিংবা অর্থনৈতিক শক্তিও একা স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। শক্তিকে আইনের অধীনে পরিচালিত করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তার ভাষায়, মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ কার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা নির্ধারণের চূড়ান্ত মাধ্যম শক্তি বা বলপ্রয়োগ হতে পারে না। একবিংশ শতাব্দীতে শান্তি বলতে শুধু যুদ্ধ না হওয়াকে বোঝায় না; এর সঙ্গে সংযমের উপস্থিতিও জরুরি।
বিশ্বে ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে বদলে যাচ্ছে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেন, বর্তমানে তিনটি প্রধান উপায়ে বিশ্বে ক্ষমতার বিন্যাস পরিবর্তিত হচ্ছে।
প্রথমত, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে নতুন নতুন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাবকেন্দ্র গড়ে উঠছে। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার একটি বড় অংশ ক্রমেই বেসরকারি করপোরেশন ও ব্যক্তির হাতে চলে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির বিকাশের মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে যন্ত্রের কাছেও ক্ষমতা স্থানান্তরিত হচ্ছে। এর মধ্যে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের উন্নয়নও রয়েছে।
গুতেরেস বলেন, ক্ষমতার এই দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাগুলো এখনও যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, বিশ্বে বিভাজনের রেখাগুলো ক্রমেই আরো প্রশস্ত হচ্ছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সৃষ্ট নানা পরিবর্তন—সবকিছুই এখন একসঙ্গে বিশ্বকে নাড়া দিচ্ছে।
গুতেরেসের মতে, এসব সংকটকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো একই গল্পের বিভিন্ন অধ্যায়। আর সেই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষমতার প্রশ্ন—কার হাতে ক্ষমতা রয়েছে এবং কার কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
সুত্র: আল জাজিরা
এআরবি