যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে শক্তিশালী জনসমর্থনের আভাস দিচ্ছে বিভিন্ন জনমত জরিপ। নির্বাচনি পূর্বাভাসেও দলটির অনুকূলে আসনের সংখ্যা বাড়ছে। তবে বহুল আলোচিত কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরেও দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ আসন রয়েছে, যেগুলোর ফল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এসব আসনে রিপাবলিকানদের অপ্রত্যাশিত জয় ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য অগ্রযাত্রাকে সীমিত করে দিতে পারে।
ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার আভাস থাকলেও রিপাবলিকানরা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলো ধরে রাখতে এবং ডেমোক্র্যাটদের আসন ছিনিয়ে নিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। পাশাপাশি রিপাবলিকান-শাসিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণও ডেমোক্র্যাটদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের একাংশে ভোট হবে। নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে।
সিনেটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
ডেমোক্র্যাট সিনেটর জিন শাহিন অবসরে যাওয়ায় নিউ হ্যাম্পশায়ার আসনটি উন্মুক্ত হয়েছে। এখানে রিপাবলিকান জন সুনুনুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ক্রিস পাপাস। সাবেক সিনেটর সুনুনুর পারিবারিক রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তার বাবা ও ভাই দুজনই অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর ছিলেন। ২০০৮ সালে শাহিনের কাছে হেরে সিনেটের আসন হারিয়েছিলেন তিনি। নির্বাচনী পূর্বাভাসদাতা কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট এই লড়াইকে অনিশ্চিত হিসেবে দেখছে। অঙ্গরাজ্যটিতে ভোটারদের দলভিত্তিক বিভক্ত ভোট দেওয়ার প্রবণতাও ফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কানসাসে সিনেট আসন জয়ের চেষ্টা করছে ডেমোক্র্যাটরা। ১৯৩২ সালের পর অঙ্গরাজ্যটি থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি। এবার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটনের জনপ্রিয়তা এবং রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের বিরুদ্ধে চিকিৎসাসেবা-সংক্রান্ত বিল নিয়ে বিতর্ক লড়াইকে আলোচনায় এনেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মার্শালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ চিকিৎসাকেন্দ্রের বকেয়া বিল আদায়ে ৭০০-এর বেশি রোগীর বিরুদ্ধে মামলা করার কথা উঠে আসে। আদালতে হাজির না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে ৮১ জন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিনা স্মিথ অবসরে যাওয়ায় মিনেসোটা আসন ধরে রাখার লড়াইয়ে নেমেছে দলটি। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও অঙ্গরাজ্যের লেফটেন্যান্ট গভর্নর পেগি ফ্লানাগানের প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক এনএফএল সাইডলাইন প্রতিবেদক মিশেল তাফোয়া। তাফোয়া প্রচারণার জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন এবং গর্ভপাতের কিছু সুযোগ বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে গভর্নর টিম ওয়ালজের প্রশাসনের অধীনে সরকারি সেবায় জালিয়াতির অভিযোগ ফ্লানাগানের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদের যেসব আসনে নজর
ফ্লোরিডার ১৩তম কংগ্রেসনাল জেলা: রিপাবলিকান প্রতিনিধি আনা পলিনা লুনাকে হারাতে চাইছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী লীলা গ্রে। অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে লুনার আসনটি রিপাবলিকানদের জন্য কিছুটা নিরাপদ হয়েছে। তবু সাম্প্রতিক নির্বাচনী পূর্বাভাসে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা আগের তুলনায় কমেছে।
উইসকনসিনের প্রথম কংগ্রেসনাল জেলা: রিপাবলিকান প্রতিনিধি ব্রায়ান স্টেইলের বিরুদ্ধে লড়ছেন নিবন্ধিত নার্স ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মিচেল বারম্যান। দক্ষিণ-পূর্ব উইসকনসিনের এই আসনটি কিছুটা রিপাবলিকান-ঘেঁষা হলেও স্টেইলের আগের নির্বাচনী সাফল্য এবার নিশ্চিত জয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। জাতীয় পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটদের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে আসনটি হাতবদল হতে পারে।
আলাবামার দ্বিতীয় কংগ্রেসনাল জেলা: ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি শোমারি ফিগার্সের জন্য লড়াই কঠিন হয়ে উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টের ভোটাধিকার আইন-সংক্রান্ত রায়ের পর অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এতে তাঁর আসনটি রিপাবলিকানদের জন্য বেশি অনুকূল হয়েছে এবং তার নিজ শহর মোবাইল নতুন সীমানার বাইরে চলে গেছে। রিপাবলিকান প্রার্থী রেট মার্কেসের জন্য নতুন আসনবিন্যাস সুবিধাজনক বলে মনে করা হচ্ছে।
নিউ মেক্সিকোর দ্বিতীয় কংগ্রেসনাল জেলা: ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি গ্যাবে ভাসকেজকে চ্যালেঞ্জ করছেন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও রিপাবলিকান প্রার্থী গ্রেগ কানিংহাম। রিপাবলিকানরা এই আসনে বিজ্ঞাপন ও প্রচারণায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে। দক্ষিণ নিউ মেক্সিকোর আসনটিতে দুই দলের সমর্থন প্রায় সমান। ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প জেলাটিতে অল্প ব্যবধানে জয় পেলেও ভাসকেজ কংগ্রেসের আসনটি ধরে রেখেছিলেন।
টেক্সাসের ৩৪তম কংগ্রেসনাল জেলা: ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ভিসেন্তে গনজালেসের প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্প-সমর্থিত রিপাবলিকান এরিক ফ্লোরেস। সাবেক সেনাসদস্য ও ফেডারেল কৌঁসুলি ফ্লোরেসের সঙ্গে লড়াইয়ে গনজালেসের জন্য নতুন নির্বাচনী সীমানা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টেক্সাসে রিপাবলিকানদের উদ্যোগে সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর আসনটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য আরও কঠিন হয়েছে।
নিউ জার্সির সপ্তম কংগ্রেসনাল জেলা: সাবেক নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার পাইলট ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রেবেকা বেনেটের সামনে রিপাবলিকান প্রতিনিধি টম কিন জুনিয়রকে হারানোর সুযোগ রয়েছে। জেলাটিতে ২০২০ সালে জো বাইডেন এবং ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয় পেয়েছিলেন। তবে কিনের কয়েক মাস কংগ্রেসের কাজে অনুপস্থিত থাকা এবং পরে বিষণ্নতার চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হওয়াও নির্বাচনী আলোচনায় এসেছে।
নেভাডার গভর্নর নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ
নেভাডায় রিপাবলিকান গভর্নর জো লম্বার্ডোর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যারন ফোর্ড। লাস ভেগাসের ক্লার্ক কাউন্টির সাবেক শেরিফ লম্বার্ডো ২০২২ সালে একজন ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটকে হারিয়ে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বর্তমানে অঙ্গরাজ্যের আইনসভার উভয় কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে। ফোর্ড গভর্নর নির্বাচিত হলে দলটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাহী ও আইনসভা—দুই ক্ষেত্রেই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাবে। ফলে এই নির্বাচন শুধু গভর্নর পদে জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন নয়, নেভাডার রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
‘নীল ঢেউ’ কতটা বাস্তব?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে সম্ভাব্য জনসমর্থনকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘ব্লু ওয়েভ’ বা ‘নীল ঢেউ’ বলা হচ্ছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে একটি দলের পক্ষে জনমত থাকা মানেই প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে সেই দল জিতবে—এমন নয়।
স্থানীয় প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, অর্থ সংগ্রহ, ভোটারদের ইস্যুভিত্তিক অবস্থান, নির্বাচনী এলাকার সীমানা এবং ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব পৃথক আসনে ভিন্ন হতে পারে। এ কারণে নিউ হ্যাম্পশায়ার ও কানসাসের সিনেট নির্বাচন থেকে শুরু করে ফ্লোরিডা, উইসকনসিন, আলাবামা, নিউ মেক্সিকো, টেক্সাস ও নিউ জার্সির প্রতিনিধি পরিষদের লড়াই এবং নেভাডার গভর্নর নির্বাচন বিশেষ নজরে রয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেখলেও রিপাবলিকানদের প্রচারণা ও নির্বাচনী এলাকার পুনর্বিন্যাস সেই পথ কঠিন করতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোন দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাবে, তা নির্ভর করবে এসব গুরুত্বপূর্ণ আসনসহ সারা দেশের নির্বাচনী ফলের ওপর।