এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বিমান হামলার পরও ইরানের সামরিক বাহিনী শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। গত দুই দশকেও যে কাজটি তারা করতে পারেনি এবার সেটিই করে দেখিয়েছে তারা। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ দুটি উন্নত যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। এ ঘটনা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সামরিক সক্ষমতা জোড়ালো করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর এ নিয়ে তৃতীয়বার ইরান এফ-৩৫ ভূপাতিত করার দাবি করল। তেহরান এর আগে ২৩ মার্চ এবং ২ এপ্রিলও একই দাবি করেছিল। তবে আগের দুটি দাবিই মার্কিন বাহিনী অস্বীকার করে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি রেজা এলহামি জানান, ইরানি ইউনিটগুলো সফলভাবে শত্রুপক্ষের বেশ কয়েকটি উন্নত যুদ্ধবিমান, ১৬০টিরও বেশি ড্রোন ও কয়েক ডজন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। ভূপাতিত করা ড্রোনের মধ্যে এমকিউ-৯, হার্মিস ও লুকাস মডেলের ড্রোনও রয়েছে।
ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফাগারি শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দেওয়া এক ভাষণে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তার এ দাবি সত্য নয়। মার্কিন বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাটি তার প্রমাণ। যদিও ট্রাম্প বরাবরই দাবি করছেন, ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। ইরানের গণমাধ্যম জানায়, দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর আঘাতে একটি মার্কিন এ-১০ ওয়ার্থগ যুদ্ধবিমান হরমুজ প্রণালিতে বিধ্বস্ত হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, শুক্রবার ইরান একটি মার্কিন এফ-১৫-ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। এতে একজন সেনা সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং আরেকজনের নিখোঁজ রয়েছেন। পাইলটের খোঁজে এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি একটি মার্কিন জেটের ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ করে বলেছে, পাইলটের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।
ইরানের স্থানীয় চ্যানেলের সংবাদে বলা হয়, ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের পাইলটকে খুঁজে বের করতে সামরিক বাহিনী তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে। কেউ যদি যদি শত্রু পাইলটকে জীবিত ধরে সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেয়, তবে তাকে মূল্যবান পুরস্কার দেওয়া হবে।
ইরান যেভাবে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করল
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট অস্ত্রের নাম প্রকাশ না করলেও বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য মাজিদ এডি-০৮ ক্ষেপণাস্ত্র হতে পারে, যা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। ভূপাতিত হওয়া বিমান দুটি সম্ভবত নিচু উচ্চতায় উড়ছিল, যা এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রে জন্য সহজ লক্ষ্যবস্তু।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মার্কিন যুদ্ধবিমানকে আঘাত করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ফুটেজটি প্রচলিত রাডার-ভিত্তিক ট্র্যাকিং নয়, বরং অপটিক্যাল ও ইনফ্রারেড সেন্সরের মাধ্যমে ধারণ করা হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, গত ১৯ মার্চ আমেরিকার সবচেয়ে উন্নত এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটারে আঘাত হানার পেছনেও মাজিদ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। ২০২১ সাল থেকে ব্যবহৃত মাজিদ এডি-০৮ মডেলের ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত নিচ দিয়ে উড়া লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম। এর বিশেষত্ব হলো এটি রাডারের ওপর নির্ভর করে না। পরিবর্তে এটি প্যাসিভ ইনফ্রারেড শনাক্ত সিস্টেম ব্যবহার করে।
নিক্ষেপের সময় মাজিদ সিস্টেম কোনো রাডার সিগন্যাল নির্গত করে না, বরং তাপের উৎসকে অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এটি ৭০০ মিটার থেকে আট কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত এবং সর্বোচ্চ ছয় কিলোমিটার উচ্চতায় হামলা চালাতে পারে। কোনো রাডার সিস্টেম ব্যবহার ছাড়াই এটি ১৫ কিমি দূর থেকে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে। এটি একসঙ্গে আটটি মিসাইল বহন করতে পারে। যেহেতু এটি রাডারের পরিবর্তে তাপ অনুসরণ করে চলে, তাই এফ-৩৫-এর মতো অত্যাধুনিক বিমানের বিপুল তাপ শনাক্ত করে সহজেই হামলা চালাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক হামলায় ইরান তার কৌশলগত কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এনেছে। গত বছরের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর ইরান স্থায়ী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম থেকে সরে এসেছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বেশির ভাগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন টানেল ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মজুত রাখা হয়েছে।