নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ১১তম দিনে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৬৪ বছর বয়সি এক নারীকে। চন্দ্রিকা শেরেস্তা নামের ওই নারী নুওয়াকোট জেলার বেত্রাবতীর একটি চারতলা বাড়ির ওপরের তলায় আটকে ছিলেন। বাড়িটির নিচের প্রায় সাড়ে তিন তলা কাদা ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়ে গেলেও তিনি কোনোভাবে বেঁচে ছিলেন।
গত ২৬ আগস্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বোটেকোশি নদী অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। ওই সময় চন্দ্রিকা তার পরিবারের আরও চার সদস্যের সঙ্গে নিখোঁজ হন। কয়েক দিন ধরে খোঁজ করেও তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবার ধরে নেয় তিনি মারা গেছেন। এমনকি নিখোঁজ হওয়ার অষ্টম দিনে তার পরিবারের সদস্যরা কুশ ঘাস দিয়ে প্রতীকী মরদেহ তৈরি করে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতাও শুরু করেছিলেন।
কিন্তু ৫ সেপ্টেম্বর ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা বাড়িটির ভেতর থেকে ক্ষীণ একটি শব্দ শুনতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তারা অনুসন্ধান শুরু করেন। ৯ সদস্যের একটি সশস্ত্র পুলিশ দল কাদা ও ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে বাড়িটির ওপরের তলায় চন্দ্রিকাকে অচেতন অবস্থায় খুঁজে পায়। পরে তাকে সেখান থেকে বের করে হেলিকপ্টারে করে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়।
উদ্ধারকারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বন্যার পানির প্রবল স্রোতে পুরো বাড়িটি প্রায় ১০০ মিটার দূরে সরে গিয়েছিল। নিচের তলাগুলো পুরোপুরি কাদা ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে চন্দ্রিকা এত দিন বেঁচে ছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তার উদ্ধারকে উদ্ধারকারী দল এবং স্থানীয় মানুষ ভয়াবহ এই দুর্যোগের মধ্যে এক বিরল আশার ঘটনা হিসেবে দেখছেন।
চন্দ্রিকার উদ্ধারের একই সময়ে নেপালের রাশুয়া জেলায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকেও জীবিত উদ্ধার করা হয় এক চীনা নাগরিককে। লু হাইতাও নামের ওই ব্যক্তি আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে প্রায় ২২৫ মিটার ভেতরে আটকে ছিলেন। নেপালি সেনাবাহিনী ও দক্ষিণ কোরিয়ার দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করা হয়।
একই দুর্যোগে এর আগে আরও কয়েকজনকে সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও নিখোঁজের মধ্যেও উদ্ধারকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে—ধ্বংসস্তূপ ও সুড়ঙ্গের ভেতরে এখনো কেউ জীবিত থাকতে পারেন।
নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় এই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে হাজারো মানুষ হতাহত হয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে নেপালে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৩৩১ থেকে ১ হাজার ৩৪৪ এবং নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার বলে জানানো হয়। চীনের হতাহতদের হিসাব যোগ করলে মোট মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৩৭৫ ছাড়িয়ে যায় এবং নিখোঁজের সংখ্যা সাড়ে ৫ হাজারের বেশি।
চন্দ্রিকার উদ্ধার তাই শুধু একজন মানুষের বেঁচে ফেরার গল্প নয়; এটি ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অন্য নিখোঁজ মানুষদেরও খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে। উদ্ধারকারীরা বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত অনুসন্ধান শেষ না হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো জায়গাকে পুরোপুরি আশাহীন ধরে নেওয়া হচ্ছে না।
সূত্র: এই সময়, দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট, আলজাজিরা ও মালায় মেইল