হিমালয় অঞ্চলকে ক্রমান্বয়ে উত্তপ্ত করে তুলছে জলবায়ু পরিবর্তন, যার ফলে নেপাল ও তিব্বতের মতো এলাকায় মারাত্মক আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক প্রলয়ংকরী বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ বিশ্লেষণে নেমে বিজ্ঞানীরা এমনই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন।
হিমবাহবিদ ও ভূতত্ত্ববিদদের একটি দল গতকাল বৃহস্পতিবার জানান, একটি হিমবাহের তলদেশের বিশাল একটি মূল শিলা ধসে পড়ার কারণেই মূলত এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়। পাহাড়ের উঁচুতে হওয়া সেই ভয়াবহ ভূমিধসের সঙ্গে হিমবাহের একটি বড় বরফখণ্ড মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হাজার হাজার ফুট নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে।
গলে যাচ্ছে জমে থাকা বরফ
জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। এর প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে থাকা 'পারমাফ্রস্ট' বা স্থায়ীভাবে জমে থাকা মাটি, পাথর ও জৈব পদার্থের জমাট স্তর গলতে শুরু করেছে। হাজার বছর ধরে হিমবাহের ভিত্তি হিসেবে কাজ করা এই স্থায়ী বরফের স্তর গলে গিয়ে পাহাড়ি ঢালকে ভঙ্গুর করে তুলছে। ফলে এ ধরনের ভূমিধস ও হিমবাহ ধসের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ছে।
১৯০০ সাল থেকে চীন-নেপাল সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের 'গ্ল্যাসিয়ার ফেইলিউর' বা হিমবাহের বিচ্ছিন্নতার ঘটনা বহুবার ঘটেছে। ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের জ্যেষ্ঠ গবেষক অল্টন সি বায়ার্স বলেন, ‘পারমাফ্রস্ট ছিল হিমালয়ের শিলা, বরফ ও হিমবাহগুলোকে হাজার বছর ধরে একসাথে আটকে রাখার মূল আঠা। কিন্তু উষ্ণায়নের প্রভাবে এটি যে দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে, তার স্পষ্ট প্রমাণ এখন মিলছে।’
বিশাল ধস ও দ্রুতগতির প্লাবন
উত্তর নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের ল্যাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর পাশে প্রায় ১৭ হাজার ফুট উঁচুতে এই দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। সেখান থেকে লাখ লাখ টন পাথর ও বরফ গড়িয়ে পড়ার সময় গুঁড়ো হয়ে কাদা-পানির তোড়ে পরিণত হয় এবং ভয়াবহ গতিতে নিচের উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ে।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ভুবনেশ্বরের সহকারী অধ্যাপক অসিম সাত্তার জানান, পাহাড়ি ঢালগুলো অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার পেছনে বরফ গলে যাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, শত শত মানুষের প্রাণহানি ও ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষের নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যে কেবল জলবায়ু পরিবর্তনই একমাত্র তাৎক্ষণিক কারণ নাও হতে পারে।
নিউক্যাসেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্টুয়ার্ট ডানিং বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু প্রভাবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দ্রুত বরফ গলার মতো স্বল্পমেয়াদি কারণগুলোও একসঙ্গে কাজ করে থাকতে পারে। স্যাটেলাইট ডাটা বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরো সময় লাগবে।’
আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
নেপালের বন্যাপ্রবণ এলাকার বাসিন্দারা সাধারণত 'হিমবাহভিত্তিক হ্রদ বিস্ফোরণ' বা গ্ল্যাসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (জিএলওএফ)-এর ব্যাপারে বেশি পরিচিত। তবে ডেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকসই কর্মসূচির পরিচালক উমেশ কে হারিতাস্য স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, এই বন্যায় কোনো হ্রদের বাঁধ ভাঙেনি। বরং পারমাফ্রস্ট গলে পাহাড়ি মাটি ধসে যাওয়ার মতো নতুন ঝুঁকিগুলো এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক অস্টিন লর্ড জানান, নেপালে বর্তমানে থাকা আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাগুলো মূল হ্রদের পানির স্তর পর্যবেক্ষণ করে সংকেত দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক আকস্মিক কাদা-বরফের তোড় এত দ্রুতগতিতে নেমে এসেছে যে সাধারণ আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা দিয়ে এ ধরনের বিপর্যয় আগে থেকে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
এএম