নেপালে গত ২৬ আগস্ট ভোটেকোশি নদীর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে ৭২৩ দশমিক ৩১ বিলিয়ন রুপি প্রয়োজন হবে বলে প্রাথমিক হিসাব করেছে সরকার। এই হিসাব করা হয়েছে ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিশন ও ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির (এনডিআরআরএমএ) নেতৃত্বে গঠিত একটি যৌথ কারিগরি দলের করা র্যাপিড ড্যামেজ অ্যান্ড নিডস অ্যাসেসমেন্টে (আরডিএনএ)।
পুনর্গঠন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ অবকাঠামো খাতে। এ খাতে প্রয়োজন হবে ৪৭৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন রুপি, যা মোট পুনর্গঠন ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ।
এনডিআরআরএমএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ধর্মরাজ উপ্রেতি বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা ও স্থানীয় ইউনিট থেকে সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে।
উপ্রেতি বলেন, ‘এটি একটি প্রাথমিক হিসাব। তবে সড়ক বিভাগ, কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং কৃষি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য নিয়ে আমরা এই হিসাব করেছি। পরিসংখ্যান দপ্তরের বন্যার আগের ও পরের তথ্যও তুলনা করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্যোগের আগে ও পরে পরিস্থিতি দেখতে ড্রোন দিয়ে জরিপ চালানো হয়েছে। এরপর খাতভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের হিসাব করা হয়েছে।’
বন্যায় জ্বালানি ও পরিবহন খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। মোট ৭৫৯ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার পাঁচটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গ্রিডব্যবস্থা পুনরুদ্ধারেই ৩৯০ দশমিক ৬২ বিলিয়ন রুপি প্রয়োজন হবে বলে সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে।
বন্যায় ৬৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির স্রোতে ভেসে গেছে ৩৩টি যান চলাচলযোগ্য সেতু। আরো চারটি সেতু আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ৬৪টি পদচারী সেতুর মধ্যে ৫৩টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবহন নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনে প্রয়োজন হবে ৭৩ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন রুপি।
রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা ও চিতওয়ান জেলায় বাড়িঘর, সরকারি ভবন ও জরুরি সেবার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় ৭ হাজার ৫৭০টি ব্যক্তিগত বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৪৮টি সরকারি ভবন, ১৮টি স্কুল, সাতটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৩০টি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ খাত পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন হবে ১০৩ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন রুপি।
উৎপাদনশীল খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বাণিজ্য, ব্যবসা, ব্যাংক ও কৃষিসহ এ খাত পুনরুদ্ধারে আরও ৫০ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন রুপি প্রয়োজন হবে। বন্যায় ১ হাজার ৮০৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের ১৭টি শাখা এবং প্রায় ৪ হাজার ৮০০টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাঁচ জেলার ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টি স্থানীয় ইউনিটের মধ্যে নুওয়াকোটের বিদুর পৌরসভায় সবচেয়ে বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির সংখ্যা ৩ হাজার ২৬।
দুর্যোগঝুঁকি কমানো ও নদীব্যবস্থাপনার জন্য ৯৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন রুপি প্রয়োজন হবে বলে মূল্যায়নে বলা হয়েছে। কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরাতে প্রয়োজন হবে ৫১৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন রুপি।
সরকার পুনর্গঠন কার্যক্রমকে দুই ধাপে ভাগ করেছে। আগামী ছয় মাসে জরুরি ত্রাণ ও স্বল্পমেয়াদি পুনর্গঠনে ব্যয় হবে ৮ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন রুপি। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনে প্রয়োজন হবে ৭১৪ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন রুপি।
উপ্রেতি বলেন, বর্তমান হিসাবটি হাতে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে করা একটি প্রাথমিক হিসাব। এক মাসের মধ্যে আরও বিস্তারিত পোস্ট-ডিজাস্টার নিডস অ্যাসেসমেন্ট (পিডিএনএ) তৈরি করা হবে। এতে বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞও যুক্ত থাকবেন।
চূড়ান্ত হিসাব বাড়তে পারে বলেও জানান উপ্রেতি। সরকার নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিলে বা অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয় শনাক্ত হলে ব্যয় বাড়বে। পুরো কোনো জনবসতি সরিয়ে নিতে হলে এবং নতুন জমি কিনতে হলে ব্যয় আরো বাড়বে। পরিবারের জিনিসপত্র ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সম্পদের ক্ষতিও হিসাবের মধ্যে নেওয়া হলে ব্যয় বাড়তে পারে। তবে চূড়ান্ত হিসাব খুব বেশি বাড়বে বলে তিনি মনে করেন না।
বন্যায় প্রায় ১৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে ১ হাজার ৩৭০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এখনো ৫ হাজার ১৩০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
বন্যায় রসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিংয়ের ১৯টি স্কুলের ৬ হাজার ৯০১ জন শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধিকাংশ স্কুল পুনর্নির্মাণ করতে হবে। কিছু স্কুল মেরামত করলেই চলবে। আটটি স্কুল পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং আরো আটটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাত্র তিনটি স্কুল অক্ষত রয়েছে।
রসুয়ার চারটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। এগুলো হলো স্যাফ্রুবেশি হেলথ পোস্ট, তিমুরে হেলথ পোস্ট, রাসুওয়াগাধির তিমুরে হেলথ ডেস্ক এবং মাইলুং কমিউনিটি হেলথ ইউনিট। গালছির বৈরেনি হাসপাতাল ও চৌরাউন্ডি বেসিক হেলথ সার্ভিস সেন্টার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নুওয়াকোটের ধুঙ্গে ও বিদুরের দুটি বর্জ্যপানি শোধনাগার ধ্বংস হয়েছে। বন্যায় বিদুর পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার পাইপলাইন ভেসে গেছে। এতে প্রায় ৪ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রিশুলি কলোনি, দেবীঘাট ও বেত্রাবতী পানি সরবরাহ প্রকল্পের ক্ষতিতে আরো ৪৬৫টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ল্যাংটাং জাতীয় উদ্যানের টিমুরে, স্যাফ্রুবেশি, মাইলুং ও বান্দারে ভবন ও কার্যালয় পুরোপুরি বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নুওয়াকোটের কৃষি উন্নয়ন কেন্দ্র এবং তিমুরের প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন অফিসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে রাসুওয়াগাধি, রাসুওয়া-ভোটেকোশি, চিলিমে, ল্যাংটাং খোলা, আপার ত্রিশুলি-১, আপার ত্রিশুলি-২, আপার ত্রিশুলি-৩এ, আপার ত্রিশুলি-৩বি, মাইলুং খোলা, মধ্য ত্রিশুলি গঙ্গা, ত্রিশুলি, দেবীঘাট ও সুপার ত্রিশুলি।
জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প মিলিয়ে মোট ৭৮৩ দশমিক ৩৮৫ মেগাওয়াট স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব প্রকল্পের পাশাপাশি সাবস্টেশন ও সঞ্চালন লাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে মোট ১২ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন রুপি জমা হয়েছে। বন্যার পর ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সহায়তার জন্য নেপাল ও বিদেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সরকারের আহ্বানের পর এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে ওই তহবিল থেকে ১ বিলিয়ন রুপি ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটিকে দিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে এই অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট
এএম