আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশে তালেবানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বাড়ছে। এতে দেশটির ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে আফগানিস্তান আবারও দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাত ও রাজনৈতিক বিভাজনের দিকে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাদাখশানে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (এনআরএফ) ও আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্ট (এএফএফ) তালেবানের বিভিন্ন অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। এর বাইরে স্থানীয় কয়েকটি ছোট প্রতিরোধগোষ্ঠীও সক্রিয় হয়েছে। সাবেক তালেবান কমান্ডার জুমা খান ফাতেহের বিদ্রোহও কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।
বাদাখশান আফগানিস্তানের সবচেয়ে দুর্গম ও পাহাড়ি প্রদেশগুলোর একটি। প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাসের এই অঞ্চলে পামির পর্বতমালার বিস্তৃত এলাকা রয়েছে। একই সঙ্গে এখানে ল্যাপিস লাজুলি ও স্বর্ণের গুরুত্বপূর্ণ খনি রয়েছে। দুর্গম পাহাড় ও সীমিত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অঞ্চলটির সড়ক ও উপত্যকাগুলো অর্থনৈতিক ও সামরিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাদাখশানের গুরুত্ব আরও বেশি। উত্তরে তাজিকিস্তান, দক্ষিণ-পূর্বে পাকিস্তান এবং পূর্বে ওয়াখান করিডরের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে আফগানিস্তানের সীমান্ত রয়েছে এই প্রদেশে। ফলে এখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে তা শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে জেবাক শহরের আশপাশে এবং কুরান ওয়া মুনজান জেলায় তালেবানবিরোধী হামলা বেড়েছে। জেবাকের অবস্থান ওয়াখান করিডরের প্রবেশপথের কাছে হওয়ায় এলাকাটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বাদাখশানের রাজধানী ফয়জাবাদের তালেবান মেয়রকে হত্যার দায়ও এনআরএফ স্বীকার করেছে।
তালেবানের জন্য আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদ। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান থেকে সৃষ্ট সন্ত্রাসী হুমকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। দেশটিতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে। বিশেষ করে বাদাখশান ও ওয়াখান করিডর নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্লেষকের মতে, তালেবান এখন আফগানিস্তানের কার্যত শাসক হলেও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্থায়ী—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। তালেবানবিরোধী রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমঝোতার দাবি জানিয়ে আসছে। তালেবান এতে খুব বেশি আগ্রহ দেখায়নি।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ১৯৯০-এর দশকের মতো আফগানিস্তান আবারও সশস্ত্র সংঘাত ও রাজনৈতিক বিভাজনের দিকে ফিরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে বাদাখশানের অবস্থানের কারণে সেখানকার অস্থিরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তায়ও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।