তরুণদের শুধু সুযোগের সুবিধাভোগী বা মতামতদাতা হিসেবে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলেও জায়গা দিতে হবে। তাদের অংশগ্রহণকে নেতৃত্বে রূপ দিতে হবে এবং পরিবর্তনের দাবি জানানোর পাশাপাশি সেই পরিবর্তন বাস্তবায়নের দায়িত্বও তরুণদের হাতে তুলে দিতে হবে—এমন আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ড. খলিলুর রহমান বলেন, বিশ্ব এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন একের পর এক সংকটকে আর বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যুদ্ধ ও সংঘাত, দারিদ্র্য ও বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুতি এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে। তাই শুধু সংকট দেখা দিলে প্রতিক্রিয়া জানানো যথেষ্ট নয়; সংকট তৈরির পেছনে থাকা ব্যবস্থাগুলোতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
তার বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আস্থা পুনরুদ্ধার। তিনি বলেন, আস্থা চাইলেই ফিরে আসে না, কাজের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়। জাতিসংঘকে মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে নিজেদের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার কঠিন সত্য স্বীকার করে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে।
ড. খলিলুর রহমানের মতে, জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় শক্তি বহুপক্ষীয় সহযোগিতা। তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও মানুষের প্রশ্ন বাড়ছে। বিভিন্ন সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হলে আস্থা আরও দুর্বল হয়। তাই কথার চেয়ে কাজের ফল দেখানোই এখন সবচেয়ে জরুরি।
যুদ্ধ ও সংঘাতের অবসান
শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়টি ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের আহ্বান জানান।
তার বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য হলো, সংঘাতের স্থায়ী সমাধান শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে না। আলোচনার পথ, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের নীতিকে সামনে রেখেই শান্তির পথ খুঁজতে হবে।
তিনি মনে করিয়ে দেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যই ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ভয় থেকে রক্ষা করা। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থাকে আরও দুর্বল করে।
উন্নয়ন যেন কাউকে পেছনে না ফেলে
টেকসই উন্নয়নও তার বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নয়নের গতি এক নয়। কোথাও প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে দ্রুত অগ্রগতি হলেও অনেক দেশ এখনো দারিদ্র্য, খাদ্য নিরাপত্তা, ঋণের চাপ ও উন্নয়ন ঘাটতির সঙ্গে লড়ছে।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, উন্নয়নের সুফল যদি কেবল কিছু দেশ বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বৈশ্বিক বৈষম্য আরও বাড়বে। তাই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এ জন্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার বক্তব্যে উঠে আসে, উন্নয়নকে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে নয়, মানুষের জীবন, মর্যাদা ও সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমেও বিবেচনা করতে হবে।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাস্তব পদক্ষেপ
জলবায়ু পরিবর্তনকে ভবিষ্যতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন ড. খলিলুর রহমান। এর প্রভাব এখনই অনুভূত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুতির মতো সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ও জনগোষ্ঠী।
এ কারণে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির বক্তব্যে জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন, অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহায়তা।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায়সংগত রূপান্তর নিয়ে আলাদা উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও রাখা হয়েছে।
মানবাধিকার সবার জন্য
মানবাধিকারকে জাতিসংঘের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরেন ড. খলিলুর রহমান। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই—তার বক্তব্যে এমন বার্তাই উঠে আসে।
তার মতে, মানবাধিকার রক্ষা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নারী, শিশু, শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকি
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও সতর্কতার পাশাপাশি সম্ভাবনার কথা বলেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি।
যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈষম্য, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আবার সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এই প্রযুক্তি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জলবায়ু মোকাবিলা, অর্থনীতি ও উন্নয়নকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।
তাই প্রশ্নটি শুধু প্রযুক্তি কত দ্রুত এগোচ্ছে তা নয়; কারা এই প্রযুক্তির সুফল পাবে এবং কারা এর সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেবে—এটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেন তিনি।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন ড. খলিলুর রহমান। তার দৃষ্টিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবকেন্দ্রিক এবং সব দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।
তরুণদের দর্শক নয়, নেতৃত্বে আনতে হবে
জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের ভূমিকার কথাও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন ড. খলিলুর রহমান। তার মতে, তরুণদের শুধু কর্মসূচির সুবিধাভোগী বা মতামতদাতা হিসেবে দেখলে চলবে না; সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিবর্তন বাস্তবায়নের নেতৃত্বেও তাদের আনতে হবে।
২১ সেপ্টেম্বর সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি নিয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, তরুণদের অংশগ্রহণ থেকে নেতৃত্বে যেতে হবে এবং পরিবর্তনের দাবি জানানোর পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও নিতে হবে।
তার বক্তব্যে এই ভাবনাই আরও বিস্তৃত হয়ে আসে—তরুণদের জন্য শুধু সুযোগ তৈরি নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলেও তাদের জায়গা দিতে হবে।
জাতিসংঘের সংস্কারও জরুরি
আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্যে। তার মতে, প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের কাজের পদ্ধতি ও কাঠামো নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে হবে।
৮১তম অধিবেশনের শুরুতেই তিনি বলেছিলেন, আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু সংস্কারের কথা বললেই হবে না; বাস্তব ফলাফল দেখাতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোকেও তাদের আর্থিক দায়বদ্ধতা যথাসময়ে পূরণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
তার লক্ষ্য এমন একটি জাতিসংঘ, যা শুধু সংকট নিয়ে আলোচনা করবে না, বরং মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে।
দায়িত্ব শুধু জাতিসংঘের নয়
বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বের কথাও সামনে আনেন ড. খলিলুর রহমান। তার মতে, জাতিসংঘকে কার্যকর করতে হলে শুধু প্রতিষ্ঠানটির ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দুর্বল হলে কোনো দেশ একা যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, দারিদ্র্য, প্রযুক্তিগত বৈষম্য বা বাস্তুচ্যুতির মতো বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।
তাই বিশ্বকে আবারও সহযোগিতার পথে ফেরার আহ্বান জানান তিনি। কঠিন সত্য স্বীকার করতে হবে, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব ফলাফলে পরিণত করতে হবে।
সব মিলিয়ে ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্যে তরুণদের অংশগ্রহণ, শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুশাসন এবং জাতিসংঘের সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
তার বক্তব্যে শেষ পর্যন্ত যে বার্তাটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো—আস্থা ফিরিয়ে আনতে কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এখনো মানুষের জন্য ফল বয়ে আনতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় তরুণদের শুধু সুযোগ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের জায়গাতেও অংশীদার করতে হবে।
৮১তম সাধারণ পরিষদের মূল প্রতিপাদ্যও সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেছে—আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তনকে সঠিকভাবে পরিচালনা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ গড়ে তোলা।
সূত্র: জাতিসংঘের নিজস্ব ওয়েবসাইট