২০২৪ সালে উত্তর মিয়ানমারের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয় আরাকান আর্মি (এএ)। এরপর রোহিঙ্গাদের গ্রাম ধ্বংস করে তাদের জমিতে বন্দিশিবির, সামরিক ব্যারাক ও বসতি নির্মাণ করছে তারা। স্যাটেলাইট চিত্র, জাতিসংঘের গবেষণা এবং বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে বুথিডং টাউনশিপের হ্নগেট থে এলাকায় একটি ধানখেতের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রোহিঙ্গা গ্রামবাসীরা চাষাবাদ করতেন। কিন্তু ২০২৬ সালের মধ্যে সেখানে ১২০টি ধূসর ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ভবন নিয়ে গড়ে উঠেছে আরাকান আর্মি পরিচালিত একটি বন্দিশিবির। আশপাশের এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা পরিবারগুলো সেখানে রাখা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া তারা শিবিরে প্রবেশ বা বের হতে পারেন না। আরাকান আর্মি উত্তর রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর এ ধরনের অন্তত ১০টি শিবির নির্মাণ করেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বসবাসরত ১৮ বছর বয়সি মুহাম্মদ আরেস বলেন, ‘আরাকান আর্মি প্রথম আমাদের এলাকায় আসার পর তীব্র লড়াই শুরু হয়। এসব সংঘর্ষে অনেক বেসামরিক মানুষ নিহত হন। শেষ পর্যন্ত তারা আমাদের পুরো গ্রাম পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়... তারা সব বাস্তুচ্যুত মানুষকে একত্র করে জোর করে শিবিরে নিয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘তারা মূলত আমাদের মাতৃভূমিকে জোরপূর্বক শ্রমের শিবির ও সামরিক চৌকির একটি নেটওয়ার্কে পরিণত করেছে।’
‘আমাদের জমিতে তারা বাড়ি বানিয়েছে’
শিবিরটি থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে মায়ু নদীর তীরে ‘ইয়োয়েট নিয়ো তাউং’ গ্রামের সারি । ২০২৪ সালের এপ্রিলে এলাকাটি পুড়িয়ে দেওয়ার পর রোহিঙ্গা কৃষক ও নৌকার মাঝিরা তাদের বাড়িঘর, কৃষিজমি ও ফলের বাগান হারান।
২৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিক বলেন, ‘তারা বড় বড় গাছ ও ফলের বাগান কেটে পুরো এলাকা পরিষ্কার করে ফেলে। গ্রামের আগের কোনো চিহ্নই তারা রাখেনি। আমাদের জমির ওপর তারা বাড়ি বানিয়েছে।’
বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা জানান, তাদের নিজেদের ঘরবাড়ি ভেঙে সেই নির্মাণসামগ্রী দিয়ে বিদ্রোহীদের জন্য নতুন স্থাপনা তৈরি করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এসব স্থাপনার মধ্যে ইয়োয়েট নিয়ো তাউংয়ে ‘এপি ব্যাটালিয়ন’ নামে পরিচিত একটি সামরিক ব্যারাকও রয়েছে। তরুণ রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, সেখানে তাদের জোরপূর্বক নিয়োগ করা হয়েছিল।
সাদিক বলেন, ‘তারা আমাদের রাস্তা পরিষ্কার করতে, পরিখা খুঁড়তে এবং তাদের শিবিরের ভেতরে কঠোর পরিশ্রম করতে বাধ্য করত। কেউ ক্লান্তিতে পড়ে গেলে তাকে রোদে ফেলে রাখা হতো।’
জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে ২৩টি রোহিঙ্গা গ্রামের অন্তত ৮০০ হেক্টর জমি দখল করে সেখানে শিবির, অন্য জনগোষ্ঠীর বসতি অথবা সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। একই সময়ে রোহিঙ্গাদের জমি দখল বা তাদের বাস্তুচ্যুত করার অন্তত ২৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে জাতিসংঘ।
২০২৪ সাল থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের পর মিয়ানমারে থেকে যাওয়া আনুমানিক ৬ লাখ রোহিঙ্গার প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই সময়ে দেশ ছেড়েছে। বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরগুলোতে এখন প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
‘উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বের সমাপ্তি’
মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের এক বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বের এটাই শেষ—এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। রোহিঙ্গারা যত দিন সহ্য করতে পারে, তত দিন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে কারাগারের মতো শিবিরগুলোতে থাকতে পারে। কিন্তু তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে দেওয়া হবে না।’
দ্য গার্ডিয়ানের সংগ্রহ করা সাক্ষ্য এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, জোরপূর্বক শ্রম, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ এবং ‘কর’ আদায়ের মতো ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অতীতে যে কৌশলগুলো ব্যবহার করেছে, আরাকান আর্মিও একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করছে।
৩২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি জানান, তাকে জোর করে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছিল এবং এক মাস আটক রেখে বারবার মারধর করা হয়। আরেক ব্যক্তি জানান, তার ২২ বছর বয়সী মেয়েকে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়, সেখানে তাকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা হয় এবং সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে বাধ্য করা হয়।
হ্নগেট থে শিবিরে আটক অনেকেই ২০২৪ সালের ২ মে হোইয়ার সিরি এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে, ওই ঘটনায় ১৭০ জনের বেশি গ্রামবাসী নিহত বা নিখোঁজ হন। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ জন ছিল শিশু।
আরাকান আর্মি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির দাবি, তারা কেবল সামরিক সদস্য এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের ইনডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজমের প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, যারা রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছিল, তাদের লক্ষ্য ছিল ‘বাস্তব পরিস্থিতি এমনভাবে বদলে ফেলা যাতে তা অপরিবর্তনীয় হয়ে পড়ে’।
তবে রোহিঙ্গাদের জমি ধ্বংসের জন্য আরাকান আর্মিই দায়ী—এমন তথ্য তার সংস্থা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি। তিনি বলেন, মিয়ানমারে এখনো অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের চলমান সংঘাতের সব পক্ষই লক্ষ্যবস্তু করছে বলে মনে হচ্ছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক টম ড্যানেনবম বলেন, জবরদস্তি এবং রোহিঙ্গাদের নিজ এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করার এই সমন্বিত কর্মকাণ্ড জনসংখ্যা স্থানান্তর বা ‘পপুলেশন ট্রান্সফার’-এর যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মিয়ানমারের নির্বাসিত ‘জাতীয় ঐক্য সরকারের’ সম্প্রতি দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া একমাত্র রোহিঙ্গা সদস্য অং কিয়াও মো বলেন, ‘এখন মূল প্রশ্ন আর এটা নয় যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা টিকে থাকতে পারবে কি না। প্রশ্ন হলো—এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে কি না, যা তাদের স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত করা এবং তাদের ভৌত, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অস্তিত্ব মুছে ফেলার প্রক্রিয়াকে অপরিবর্তনীয় করে তুলবে।’
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) জানুয়ারিতে শুনানি শুরু করেছে। আদালত এর আগে বলেছে, ‘বাড়িঘর থেকে পরিকল্পিতভাবে বিতাড়ন এবং বাড়িঘর ধ্বংস’ গণহত্যার একটি উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে আদালতের রায় চলতি মাসে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র: তামিল গার্ডিয়ান
আরএ