কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষ করে ডালাসের আশপাশে। ভালো স্কুল, তুলনামূলক সাশ্রয়ী আবাসন এবং শক্তিশালী মুসলিম সম্প্রদায়ের কারণে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম পরিবারগুলো সেখানে বসতি গড়েছে। ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ এলাকায় গড়ে উঠেছে কয়েক ডজন মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠান। তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের এই বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অঙ্গরাজ্যটিতে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য, সামাজিক বৈরিতা এবং রাজনৈতিক প্রচারণাও জোরালো হয়েছে।
বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
জুনের শুরুর দিকে ভোর হওয়ার আগেই ঘুম থেকে উঠেছিলেন গুলাম কেহার। টেক্সাসের আরভিংয়ে নিজের স্থানীয় মসজিদ ভ্যালি র্যাঞ্চ ইসলামিক সেন্টারে দিনের প্রথম নামাজ আদায় করে কয়েক মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডে দায়িত্ব পালনে যাওয়ার কথা ছিল তার।
এর আগেও তিনি দায়িত্ব পালনে গিয়েছেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। স্ত্রী ও চার সন্তানকে টেক্সাসে রেখে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।
টেক্সাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মুসলিমবিরোধী বক্তব্য তখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং সেগুলোর প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছিল। বিভিন্ন মসজিদের মুসল্লি ও ধর্মীয় নেতারা প্রকাশ্যে নামাজ পড়ার সময় কিংবা পার্কে বসে থাকার সময় তাদের উদ্দেশে করা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছিলেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হিউস্টনের একটি বড় ইসলামিক সেন্টারে সন্ত্রাসী হুমকি দেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কনরো শহরে এক নারী মুসলিম ক্রেতাদের বলেন, তারা ‘এই অঙ্গরাজ্য বা এই দেশে স্বাগত নয়’। ওই মন্তব্যের ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর নারীটি চাকরি হারান। পরে সমর্থকদের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পান তিনি।
ডালাসের উপশহর ম্যাককিনিতেও একটি মসজিদ সম্প্রসারণ নিয়ে উত্তপ্ত সিটি কাউন্সিলের শুনানির সময় এক নারী সাবেক মেয়রের জামার ভেতরে ইসলামবিরোধী বার্তা লেখা কাগজ ঢুকিয়ে দেন।
‘এমন পরিবেশে তাদের একা রেখে যাওয়া কিছুটা উদ্বেগের বিষয় ছিল,’ নিজের পরিবারের প্রসঙ্গে বলেন কেহার। ‘বাইরে যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোই ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিল।’
পরে দায়িত্ব পালনের এলাকায় তার পরিবারকে যত দ্রুত সম্ভব তার সঙ্গে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি।
কেহারের মতো গত কয়েক দশকে টেক্সাসে বসতি গড়া মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে। ডালাসের দক্ষিণে ‘ডিসোটো হাউস অব পিস’-এর মতো প্রতিষ্ঠানও মুসলিম সম্প্রদায়ের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে।
‘আমেরিকান মুসলিমদের জন্য এটাই থাকার সবচেয়ে ভালো জায়গা,’ বলেন তাম্মাম আলওয়ান। ডেট্রয়েট থেকে আরভিংয়ে চলে আসা এই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি প্রার্থনা করেছিলাম—হে আল্লাহ, আমাকে আরভিংয়ে পাঠান।’
কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায় যত বেড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভও তত বেড়েছে।
‘র্যাডিক্যাল ইসলাম’ মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকান রাজনীতির অংশ। জাতীয় পর্যায়েও এই বক্তব্য আরও তীব্র হয়েছে। মুসলিম রাজনীতিকদের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয় এবং মুসলিমদের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে টেক্সাসের রাজনীতিকরা শুধু বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা কিছু মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতাও প্রয়োগ করেছেন।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। পূর্ব প্লানোর ইসলামিক সেন্টার বা এপিকের সদস্যরা ডালাসের পূর্বদিকে প্রায় ৪০০ একর জমিতে মসজিদকেন্দ্রিক একটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রকাশ করলে তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় এপিক সিটি । পরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘দ্য মেডো’ রাখা হয়। প্রকল্পটিতে এক হাজারের বেশি বাড়ি, মসজিদ, স্কুল, দোকান, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদনমূলক স্থাপনা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি নিয়ে ইসলামবিরোধী প্রভাবক অ্যামি মেকেলবার্গ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, টেক্সাসের বারবিকিউ রেস্তোরাঁগুলোকে একটি সমন্বিত ‘দখল’-এর অংশ হিসেবে ‘আরব শপিং প্লাজা’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এপিক সিটি নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘এভাবেই পশ্চিমা বিশ্বের পতন হয়।’
তার প্রচারণা টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপর অ্যাবট প্রস্তাবিত প্রকল্প ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে রাজ্যীয় তদন্ত শুরু করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনও প্রকল্পটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেন।
প্রকল্পটির সমালোচকেরা এটিকে ‘শরিয়াহ-নিয়ন্ত্রিত’ বা মুসলিমদের জন্য আলাদা এলাকা হিসেবে তুলে ধরলেও প্রকল্পের উদ্যোক্তারা বলেছেন, এটি সব ধর্ম ও পটভূমির মানুষের জন্য উন্মুক্ত।
রিপাবলিকান কনভেনশনে শরিয়াহবিরোধী প্রপাগাণ্ডা
মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের বিস্তার টেক্সাসের রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জুনে অনুষ্ঠিত টেক্সাস স্টেট রিপাবলিকান কনভেনশনে ‘Don’t Sharia Our Texas’ বা টেক্সাসকে শরিয়াহমুক্ত রাখার বার্তা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়। একাধিক প্যানেলে মুসলিম ‘আগ্রাসন’ নিয়ে সতর্ক করা হয় এবং শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করাকে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়। গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও সম্মেলনে শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান।
সম্মেলনস্থলে টেক্সাস হাউসের নতুন ‘শরিয়াহ-মুক্ত ককাস’-এর একটি বুথও ছিল। সেখানে অ্যামি মেকেলবার্গের সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রচারণা চালানো হয়।
এক নারীর হাতে থাকা একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমার টেক্সাসকে শরিয়াহ আইনে শাসিত করো না। স্বাধীনতা রক্ষা করো। টেক্সাস রক্ষা করো।’
এরই মধ্যে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের রিপাবলিকান প্রার্থী বো ফ্রেঞ্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি থামব না।’
২০১৫ থেকেই শরিয়াহবিরোধী রাজনীতি
টেক্সাসে মুসলিমদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে আরভিংয়ের তৎকালীন মেয়র বেথ ভ্যান ডুইন শরিয়াহ আইনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসেন। তিনি বর্তমানে কংগ্রেসের সদস্য।
এর দুই বছর পর, ওয়াশিংটনভিত্তিক কট্টর ডানপন্থী থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসি-র উদ্যোগে আনা একাধিক বিলের অংশ হিসেবে টেক্সাসের রিপাবলিকানরা শরিয়াহবিরোধী আইন পাস করেন।
এরপর কিছু সময়ের জন্য কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিতে ইসলাম ইস্যুর গুরুত্ব কমে যায়। অভিবাসন, মহামারি ও লিঙ্গ রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পায়।
কিন্তু পরে কট্টর ডানপন্থীদের একটি অংশ নতুন করে এমন একটি বিতর্কিত ধারণা সামনে আনে—ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, বরং একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ।
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এপিক সিটি নিয়ে নতুন করে প্রচারণা শুরু হয়।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ
রিপাবলিকান রাজনৈতিক পরামর্শক অ্যান্থনি হোমের মতে, ইসলাম নিয়ে রিপাবলিকান ভোটারদের উদ্বেগ মূলত অবৈধ অভিবাসন নিয়ে তাদের ভীতিরই সম্প্রসারণ। গভর্নর অ্যাবটের বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি যা কিছু করেন, তা জনমত জরিপ দ্বারা চালিত।’
এদিকে অ্যাবট মুসলিম যাত্রীদের ধর্মীয় অজুর জন্য ব্যবস্থা রাখা টেক্সাসের বিমানবন্দরগুলোর সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করার হুমকি দেন। মুসলিমদের একটি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত একটি ব্যক্তিগত ওয়াটার পার্ক অনুষ্ঠান বাতিলের নির্দেশও দেন তিনি।
একই সঙ্গে অ্যাবট জাতীয় নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা সিএআইআর-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেন। সংগঠনটি আদালতে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, সিএআইআর-কে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি অন্যান্য ইসলামি প্রতিষ্ঠানকেও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মুসলিম নেতাদের অবস্থান
টেক্সাসের মুসলিম নেতারা কীভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করবেন, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ আন্তঃধর্মীয় যোগাযোগ ও জনসম্পৃক্ততার পক্ষে। আবার কেউ মনে করছেন, শুধু নিজেদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়।
ভ্যালি র্যাঞ্চ মসজিদে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট মুসলিম স্কলার ড. ওমর সুলেইমান বলেন, ‘আমরা সবসময় আমাদের কর্মকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে আশা করেছি, আমাদের কর্মকাণ্ডই স্বাভাবিকভাবে আমাদের পক্ষে কথা বলবে। আমরা সেটা চেষ্টা করেছি, কিন্তু এতে আমাদের কোনো লাভ হয়নি।’
তার মতে, এখন পরিস্থিতির জন্য ‘শক্ত অবস্থান’ প্রয়োজন এবং মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।
‘আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলাকে এসব মানুষের জন্য আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল করে তুলতে হবে,’ বলেন তিনি। ‘আমাদের তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।’
তিনি এমন প্রতিরোধের ভিত্তি হিসেবে মার্কিন সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষার কথা উল্লেখ করেন। তবে কট্টর রক্ষণশীলরা কীভাবে সেই সুরক্ষা সীমিত করা যায়, তার পথ খুঁজছেন।
টেক্সাসে এমন একটি উদ্যোগ হিসেবে কিছু ইসলামি সাংস্কৃতিক চর্চা—যেমন বিবাহ ও অন্যান্য বিষয়ে ধর্মীয় বিধানভিত্তিক সালিশি ব্যবস্থা—নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণে রাজ্য আইন ব্যবহারের কথা আলোচনা হচ্ছে।
সান অ্যান্টোনিওর রিপাবলিকান স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যালান স্কুলক্রাফট বলেন, ‘আমরা প্রথম যে বিষয়গুলো করার চেষ্টা করব, তার একটি হলো—ধর্ম বলতে কী বোঝায়, সেটি সংজ্ঞায়িত করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়। এটি একটি ধর্মের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।’
মুসলিম অধিকারকর্মীদের মতে, পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক প্রচারণা, আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এবং সরকারি পদক্ষেপের মধ্য দিয়েও এর প্রকাশ ঘটছে।
সিএআইআর-এর অস্টিন শাখার শাইমা জায়ান বলেন, ‘আমরা ইসলামোফোবিয়ার ঢেউয়ের সম্মুখীন হচ্ছি। এটি সবচেয়ে ভয়াবহ ঢেউ।’
সব মিলিয়ে, টেক্সাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিস্তারের পাশাপাশি ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক প্রচারণাও নতুন মাত্রা পেয়েছে। মসজিদ ও মুসলিম অধ্যুষিত কমিউনিটি গড়ে ওঠা থেকে শুরু করে শরিয়াহ আইন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক—সবকিছু মিলিয়ে অঙ্গরাজ্যটির মুসলিমদের ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হচ্ছে।