হোম > বিশ্ব > এশিয়া

নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের গ্রাম, জমি দখলের মহোৎসবে সশস্ত্র গোষ্ঠী

দ্য গার্ডিয়ান

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের গ্রাম ধ্বংস ও জমি দখলের ক্ষেত্রে আরাকান আর্মি (এএ) দেশটির সামরিক বাহিনীর নীতির অনুকরণ করছে এমনটি স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে উত্তর রাখাইনের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এএ-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, বাস্তুচ্যুতি ও ভূমি দখলের অভিযোগ সামনে এসেছে।

রাখাইনের ধানক্ষেতের ওপর হ্নগেট থে এলাকায় অন্তত ১০টি এমন শিবির গড়ে উঠেছে, যেখানে বর্তমানে বহু রোহিঙ্গাকে থাকতে হচ্ছে। অন্যরা পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে অথবা বাংলাদেশে থাকা শরণার্থীশিবিরে পালিয়ে এসেছে। কেউ কেউ আবার বিপজ্জনক নৌযাত্রায় মালয়েশিয়ার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ২০২৪ সাল থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে।

রোহিঙ্গারা পশ্চিম মিয়ানমারের একটি প্রধানত মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। কয়েক দশক ধরে তারা নিপীড়ন ও সংঘাতের শিকার। ২০১৬-১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের পর প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ওই সময়ের হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নের ঘটনা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে সম্ভাব্য গণহত্যা হিসেবে তদন্তাধীন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে।

২০২১ সালে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটিতে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষের সংঘাতের মধ্যে পড়ে গেছে। রোহিঙ্গারা নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, ভূমি দখল, বাস্তুচ্যুতি, জোরপূর্বক শ্রম এবং সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।

জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে ২৩টি রোহিঙ্গা গ্রামের অন্তত ৮০০ হেক্টর জমি দখল করে শিবির, অন্য জনগোষ্ঠীর বসতি অথবা সামরিক অবকাঠামোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এটিকে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে বসবাসকারী ১৮ বছর বয়সী রোহিঙ্গা মুহাম্মদ আরেস বলেন, বুলডোজার দিয়ে তাদের পুরো আবাসিক এলাকা সমতল করে দেওয়া হয়েছে। গাছপালা কেটে ফেলে বসতিগুলোর সব চিহ্ন মুছে দেওয়া হয়। ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার পর সেখানকার ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে আরাকান আর্মি সামরিক শিবির ও চৌকি স্থাপন করেছে বলে তিনি জানান।

বুথিডং এলাকায় আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেখানে সশস্ত্র সংঘাতও কমে আসে। স্বাধীন সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থা অ্যাকলেডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বুথিডংয়ে ১০৩টি যুদ্ধের ঘটনা ঘটলেও ২০২৫ সালে তা কমে ১২টিতে দাঁড়ায়।

ইয়েত ন্যো তাউং গ্রামের ২৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিক বলেন, তাদের কৃষিকাজ বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং জানিয়ে দেওয়া হয় যে জমি আর তাদের নয়। তাদের কৃষিজমি দখল করে নেওয়ার পাশাপাশি রাস্তা পরিষ্কার, পরিখা খনন এবং সামরিক শিবিরে ভারী শ্রম দিতে বাধ্য করা হয়। ক্লান্ত হয়ে কেউ পড়ে গেলে তাকে রোদে ফেলে রাখা হতো বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

দেওয়া স্থানীয়দের ভিডিওতে ইয়েত ন্যো তাউং এলাকার ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা যায়। ভিডিওতে একটি স্কুল, মসজিদ, ফেরিঘাট, দোকান ও বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ দেখানো হয়েছে। ভিডিওর শেষ দিকে একজন নিজের বাড়িও দেখান। সেখানে পোড়া মাটি ও প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্থাপনা দেখা যায়।

রোহিঙ্গাদের দেওয়া একাধিক সাক্ষ্যে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মির জন্য জোরপূর্বক শ্রম দিতে গিয়ে তাদের নিজেদের ঘরবাড়ি ভেঙে সেই নির্মাণসামগ্রী নতুন ভবন তৈরিতে ব্যবহার করতে হয়েছে। ইয়েত ন্যো তাউংয়ে সামরিক ব্যারাক নির্মাণেও এসব সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরাকান আর্মি দাবি করে, তারা রাখাইন রাজ্যের সব জাতিগোষ্ঠীর স্বার্থে লড়াই করছে। তবে রোহিঙ্গাদের জমি ধ্বংস ও দখল এবং তাদের জোরপূর্বক শ্রম ও সামরিক নিয়োগের মাধ্যমে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নীতির অনুকরণ করার অভিযোগ উঠেছে।

মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ-সমর্থিত ইনডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজমের প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান অবশ্য বলেছেন, রোহিঙ্গাদের জমি ধ্বংসের জন্য আরাকান আর্মিকে দায়ী করার বিষয়টি তারা এখনো নিশ্চিত করেননি। তার মতে, মিয়ানমারের ভেতরে থাকা রোহিঙ্গারা চলমান সংঘাতের সব পক্ষের লক্ষ্যবস্তু হয়ে সংঘাতের মাঝখানে আটকা পড়েছে।

মিয়ানমারের নির্বাসিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের সাবেক রোহিঙ্গা সদস্য অং কিয়াও মোয়ে বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য পরিস্থিতি একটি ‘বিপজ্জনক নতুন পর্যায়ে’ প্রবেশ করেছে। তার মতে, প্রশ্নটি এখন শুধু রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে টিকে থাকতে পারবে কি না—তা নয়; বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে কি না, যার ফলে তাদের স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত করা এবং তাদের ভৌত, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক উপস্থিতি মুছে দেওয়া অপরিবর্তনীয় হয়ে উঠবে।

রোহিঙ্গাদের শুধু জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়নি; পুরুষ ও নারী উভয়কেই আরাকান আর্মির জন্য কাজ এবং সামরিক প্রশিক্ষণে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। ৩২ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা জানান, তাকে জোর করে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং আটক অবস্থায় মারধর ও জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা হয়।

আরেক ব্যক্তি জানান, আরাকান আর্মির সদস্যরা তার ২২ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে গিয়ে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করে এবং গৃহস্থালির কাজ ও সামরিক প্রশিক্ষণে বাধ্য করে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আরো কিছু সাক্ষ্যে নিয়মিত ‘কর’ আদায়, জমি ও গবাদিপশু জব্দ এবং চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের কথাও উঠে এসেছে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক টম ড্যানেনবাম বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর জবরদস্তি এবং তাদের দেশের ভেতরে বা দেশের বাইরে বাস্তুচ্যুত করার সম্মিলিত কর্মকাণ্ড ‘জনসংখ্যা স্থানান্তর’ বা পপুলেশন ট্রান্সফারের যুদ্ধাপরাধের আওতায় পড়তে পারে।

২০২৪ সালে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সালামত খান বলেন, আরাকান আর্মির যোদ্ধারা তাদের গ্রাম আক্রমণের পর তাদের চলে যেতে নির্দেশ দেয়। তাদের বলা হয়েছিল, “বাংলাদেশে চলে যাও, তোমাদের বাড়িঘর শেষ হয়ে গেছে, শরণার্থীশিবিরে যাও।”

জাতিসংঘের গবেষণা, সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে গ্রামগুলোর পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে আরাকান আর্মি এসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে ও পরে পরিস্থিতির তুলনা করা হয়েছে। ইয়েত ন্যো তাউংয়ের ছবি ও ভিডিও স্থানীয় স্থাপনা ও ভৌগোলিক চিহ্নের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হয়েছে এবং আগুন লাগার সময় নিশ্চিত করতে নাসার ফায়ার ইনফরমেশন ফর রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট ডেটাও ব্যবহার করা হয়েছে।

ড. সিতি হাসমাহর জানাজা নিয়ে রাজনীতি না করার আহ্বান

দুর্যোগ মোকাবিলায় মালয়েশিয়াকে ৫০টি স্টারলিংক কিট দিল স্পেসএক্স

এআই দিয়ে কণ্ঠ নকল, আইনি সুরক্ষায় জাপানের আদালতের ঐতিহাসিক রায়

স্ত্রীর মৃত্যুর পর একদিন পরই হাসপাতালে ভর্তি মাহাথির মোহাম্মদ

বাংলাদেশের বিমান আটকে দেওয়ার কারণ জানাল পাকিস্তান

মালয়েশিয়া থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু

ড. সিতি হাসমাহ মালয়েশিয়ার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে: আনোয়ার ইব্রাহিম

রাখাইনে মিয়ানমার বিমান বাহিনীর বোমাবর্ষণে নিহত ৪৯

রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলা, নিহত ৩৩

ইসলামের নামে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো যাবে না: আনোয়ার ইব্রাহিম