চীনে যৌন হয়রানি ও নারীর অধিকার নিয়ে সোচ্চার ‘মি টু’ আন্দোলনের ধরন বদলে গেছে। একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য আলোচনা ও প্রচারণার মাধ্যমে যে আন্দোলন ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল, এখন তা অনেকটাই ব্যক্তিগত ও গোপন পরিসরে চলে গেছে। দেশটিতে অনলাইন সেন্সরশিপ এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সীমাবদ্ধতার কারণে নারীবাদী কর্মীরা নতুন কৌশলে কাজ করছেন।
চীনের মি টু আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত সাংবাদিক সোফিয়া হুয়াং শুয়েচিন শুক্রবার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। পাঁচ বছর আগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মুক্তির পর তিনি এমন একটি পরিবেশে ফিরেছেন, যেখানে তার কারাবন্দি থাকার সময় আন্দোলনের ধরন অনেকটাই বদলে গেছে।
বেইজিংয়ের একসময়কার সক্রিয় মি টু কর্মী জেসমিন এখন নারীবাদী কর্মকাণ্ড আয়োজন করেন শিল্প বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আড়ালে। এসব আয়োজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে প্রচার না করে পরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগের সেই সময় কল্পনা করাও এখন কঠিন, যখন একজন যৌন হয়রানির শিকার নারী প্রকাশ্যে নিজের অভিজ্ঞতা জানালে তা নিয়ে বৃহত্তর সামাজিক আলোচনা শুরু হতে পারত।
চীনের নারীবাদী আন্দোলন এখন ক্রমেই ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। আন্দোলনের কর্মীরা একে প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতা হিসেবেও দেখছেন। যৌন হয়রানি ও যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মি টু আন্দোলনের প্রভাব চীনেও পড়েছিল। কিন্তু বর্তমানে মি টু এবং এর চীনা ভাষার বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ব্যাপকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে কর্মীরা দাবি করছেন।
চীনা নারীবাদী গবেষক ইভা লিউয়ের মতে, নতুন প্রজন্মের অনেক নারীবাদী আগের আন্দোলন সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না। তার মতে, অনলাইনে সেন্সরশিপের কারণে আগের সংগ্রামের তথ্যও অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে চীনা নারীবাদীরা সেন্সরশিপ এড়াতে নতুন নতুন শব্দ ও প্রকাশভঙ্গি ব্যবহার করছেন। তবে এসব নতুন শব্দও দ্রুত সেন্সরশিপের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বেইজিংয়ের জেসমিন জানান, নারীবাদ বা এলজিবিটি বিষয়কে সরাসরি সামনে রেখে কোনো প্রকাশ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা কঠিন। তাই অনেক সময় অনুষ্ঠানকে তুলনামূলক নিরপেক্ষ কোনো বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পরে অনুষ্ঠানের ভেতরে নারী অধিকার বা সামাজিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সোফিয়া হুয়াং শুয়েচিনের সাংবাদিকতা চীনে মি টু আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে ভূমিকা রেখেছিল। ২০২১ সালে চীনের গুয়াংজু শহরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৪ সালে শ্রম অধিকারকর্মী ওয়াং জিয়ানবিংয়ের সঙ্গে তাকে ‘রাষ্ট্রক্ষমতা উৎখাতে উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। একই সময়ে তাকে চার বছরের জন্য ‘রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত’ করার সাজাও দেওয়া হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এর ফলে তার সাংবাদিকতা এবং বিদেশ ভ্রমণের ওপরও বিধিনিষেধ থাকতে পারে।
হুয়াংয়ের মুক্তির পরও তার বর্তমান অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাকে মুক্তির দাবিতে কাজ করা কর্মীরা জানিয়েছেন, মুক্তির পরও তারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি এবং তার অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত নন। সম্ভাব্য কঠোর নজরদারি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
তবে চীনের সরকার নারীর অধিকার পরিস্থিতিতে দেশের ‘ঐতিহাসিক’ অগ্রগতির কথা বলে আসছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত বছর নারীদের স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। সরকার লিঙ্গসমতা আরো জোরদার করা এবং যৌন হয়রানি ও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে সুরক্ষা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে।
আন্দোলনের প্রকাশ্য পরিসর সংকুচিত হলেও মি টু আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে বলে কর্মীরা মনে করেন। তাদের মতে, যৌন হয়রানিকে চীনা সমাজের মূলধারার আলোচনায় নিয়ে আসতে এই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এর ফলে কিছু নীতিগত পরিবর্তন হয়েছে। তবে আদালত পর্যন্ত গিয়ে এসব পরিবর্তনের অগ্রগতি সীমিত হয়ে পড়েছে বলে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য।
চীনা নারীবাদী কর্মী লু পিনের মতে, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মি টু আন্দোলন বিশেষ করে তরুণ নারীদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়েছে। তবে আন্দোলনের কর্মীরা এখন মনে করছেন, আগের মতো প্রকাশ্য ও ব্যাপক অনলাইন আন্দোলনের সুযোগ নেই। ফলে যৌন হয়রানির শিকার নারীদের আইনি সহায়তা ও প্রচারের মাধ্যমে সহযোগিতা করার পাশাপাশি পরিবর্তনের জন্য নতুন ও সতর্ক কৌশল গ্রহণ করতে হচ্ছে।