ইউক্রেনের দুই প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মধ্যে রাজধানী কিয়েভের রাস্তায় গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার ভোরে কয়েক ঘণ্টার উত্তেজনার পর এ ঘটনা ঘটে। এতে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা হুরের (এইচইউআর) তিন সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের একজনের অবস্থা গুরুতর।
এই সংঘাত ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভেতরে চলা ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। সংঘর্ষে জড়ায় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা হুর এবং অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা সিকিউরিটি সার্ভিস অব ইউক্রেন (এসবিইউ)।
ঘটনার সূত্রপাত রাশিয়ার নাগরিক স্তেপান কাপলুনভের অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে। কাপলুনভ রাশিয়ার নাগরিক হলেও ইউক্রেনের হয়ে লড়ছেন। তিনি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার একজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার।
বৃহস্পতিবার এসবিইউ কাপলুনভের বিরুদ্ধে রুশ নিরাপত্তা সংস্থার হয়ে হত্যাচক্রান্তের অভিযোগ তোলে। সংস্থাটি জানায়, কাপলুনভ স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে মুক্তির পর স্থানীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাপলুনভ ও অন্যরা বলেন, স্বীকারোক্তিটি জোর করে নেওয়া হয়েছে।
কাপলুনভ বলেন, ১০ দিন আগে তাকে রাস্তায় আটক করা হয়। পরে তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হাতকড়া পরিয়ে চোখ বেঁধে রাখা হয়। পরে আটককারীরা নিজেদের এসবিইউ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। তাকে রুশ গুপ্তচর হিসেবে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
বুধবারের গুলিতে হুরের তিন সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কমান্ডার ওলেক্সি সেরেদিউক। তাদের একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এসবিইউও গুলি চালানোর কথা স্বীকার করেছে। সংস্থাটি জানায়, কাপলুনভের অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালানোর সময় তাদের কর্মকর্তারা বাধার মুখে পড়েন। তখন তারা গুলি চালান।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ভর্ৎসনা করেছেন। বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি ঘটনাটিকে ‘একেবারেই লজ্জাজনক ঘটনা’ বলেন। তিনি ঘটনার তদন্ত করতে অ্যাটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছেন। সংঘর্ষে জড়িত ইউনিটগুলোর কমান্ডারদের ভূমিকাও তদন্ত করা হবে।
জেলেনস্কি বলেন, ‘এখানে ইউক্রেনে গুলি চালানোর অনুমতি আছে শুধু ইউক্রেনকে রক্ষা করতে রুশ দখলদারদের ওপর। অন্য কোনো গুলিবিনিময়কে আমাদের রাষ্ট্র কখনোই এমন কিছু হিসেবে দেখবে না, যা করার অনুমতি কারও আছে।’
ঘটনার ভিডিও এবং কাপলুনভ ও তার আইনজীবী তারাস বোরোভস্কির সাক্ষাৎকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও এর সমর্থকেরা এসবিইউর দেওয়া ঘটনার বিবরণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কাপলুনভ রুশ এজেন্ট—এসবিইউর এই দাবিও তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ কিরিলো বুদানভও জেলেনস্কির সমালোচনার সঙ্গে একমত হয়েছেন। তিনি আগে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ছিলেন। জনপ্রিয় সাবেক কমান্ডো হিসেবে তিনি সংস্থাটির বিশেষ অভিযান ইউনিটগুলোকে শক্তিশালী করেছিলেন।
বুদানভ বলেন, ‘সেনাসদস্যদের বেআইনিভাবে অপহরণ করা বা আমাদের শহরের রাস্তায় গুলি চালানোর অধিকার কারো নেই।’
কাপলুনভ রুশ স্বেচ্ছাসেবক কোরের উপপ্রধান। রাশিয়ার স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গঠিত এই ইউনিটটি ২০২৩ সাল থেকে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ইউক্রেনের হয়ে লড়াই করছে।
গত ২৩ আগস্ট থেকে কাপলুনভ নিখোঁজ ছিলেন। তাকে এসবিইউ আটক করেছে কি না, কর্মকর্তারা সংস্থাটিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি বলে সেরেদিউক জানিয়েছেন।
সেরেদিউক বলেন, কাপলুনভের সহযোগীরা তার অ্যাপার্টমেন্টে নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছিলেন। রাতে এসবিইউর কর্মকর্তারা সেখানে এলে তারা সতর্ক হন।
আইনজীবী বোরোভস্কি ই-মেইলে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, এসবিইউর কর্মকর্তারা কাপলুনভকে সঙ্গে নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে এসেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ‘কথিত তদন্তমূলক কার্যক্রম’ চালানো।
বোরোভস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে দুই সংস্থার কমান্ডারেরা কয়েক ঘণ্টা আলোচনা করেন। তদন্তের কাজ নির্বিঘ্নে শেষ করার বিষয়ে তারা একমত হয়েছিলেন। কিন্তু সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাস্তায় গুলি শুরু হয়। তখন এসবিইউর কর্মকর্তারা হুরের কয়েকজন সদস্যকে আটক করেন।
বোরোভস্কি বলেন, ‘মানুষ তাদের বন্ধুদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।’
কাপলুনভ বলেন, গুলির ঘটনা যখন ঘটে, তখন তিনি অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে ছিলেন। এখন তিনি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সুরক্ষায় আছেন।
বৃহস্পতিবার হুর এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পরিকল্পিতভাবে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
হুরের কমান্ডের অনুমোদন নিয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেরেদিউক বলেন, এসবিইউর বেআইনি কর্মকাণ্ড থেকেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত। এর মধ্যে কাপলুনভকে আটকের ঘটনাও রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
সেরেদিউক বলেন, এসবিইউ বুধবারের ঘটনায় ‘একটি সন্ত্রাসী হামলা ঠেকানো হয়েছে’ বলে দাবি করেছে। সেই দাবির জবাব দিতেই তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারি, কারণ আমরা যুদ্ধে অংশ নেওয়া কর্মকর্তা। কিন্তু এখন আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’
এএম