হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

জার্মানিতে ক্রমেই কোণঠাসা হচ্ছে মুসলিমরা

আমার দেশ অনলাইন

জার্মানির রাজনীতিতে ডানপন্থী উত্থানের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর। একদিকে কট্টর ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) ‘পুনঃঅভিবাসন’ বা রিমিগ্রেশনের নামে অভিবাসীদের দেশছাড়া করার দাবি তুলছে। অন্যদিকে মূলধারার মধ্যপন্থী দলগুলোও নিরাপত্তা ও অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিতে গিয়ে মুসলিম ও মধ্যপ্রাচ্যীয় জনগোষ্ঠীকে ক্রমেই সন্দেহের চোখে দেখছে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের রাজধানী ম্যাগডেবার্গে এএফডির অভূতপূর্ব নির্বাচনি সাফল্য উদ্‌যাপনে দলটির নেত্রী অ্যালিস ওয়াইডেল ও ৩৫ বছর বয়সী শীর্ষ প্রার্থী উলরিশ জিগমুন্ড অংশ নেন। রাজ্য নির্বাচনে এএফডি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে বড় জয় পায়। বিপরীতে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) মাত্র ১৭ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পায়। সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসপিডি) পায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট।

এই ফলাফলকে গত দুই বছর ধরে মধ্যপন্থী দলগুলোর অনুসৃত কৌশলের বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ সময় মূলধারার দলগুলো মনে করেছিল, কট্টর ডানপন্থীদের রাজনৈতিক এজেন্ডার কিছু অংশ নিজেদের নীতিতে গ্রহণ করলে এএফডির জনপ্রিয়তা কমানো সম্ভব হবে। সেই লক্ষ্যেই আশ্রয় আইন কঠোর করা, বহিষ্কার কার্যক্রম জোরদার এবং সিরিয়া ও আফগানিস্তানে প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কিন্তু এই নীতির ফলে জার্মানির প্রায় ৫৫ লাখ মুসলমানের জন্য রাজনৈতিক পরিসর আরো সংকুচিত হয়েছে। এএফডি তাদের বিরুদ্ধে দেশছাড়ার দাবি তুলছে, আর মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো মুসলিম ও মধ্যপ্রাচ্যীয় জনগোষ্ঠীর উপস্থিতিকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে উপস্থাপন করছে।

এই কঠোর অবস্থানের বড় পরিবর্তন দেখা যায় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। সে সময় সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যান্সি ফেজার সোলিঙ্গেনে প্রাণঘাতী ছুরিকাঘাত এবং থুরিঙ্গিয়া ও স্যাক্সনিতে কট্টর ডানপন্থীদের ঐতিহাসিক নির্বাচনি সাফল্যের পর দেশের নয়টি স্থলসীমান্তেই পুলিশি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেন। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্ক সীমান্তে গাড়ি তল্লাশি এবং যাতায়াতকারী ট্রেনে নজরদারি বাড়ানো হয়।

২০২৪ সালে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় মের্ৎসও আরো কঠোর অভিবাসন নীতির দাবি তুলেছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তির আওতায় জাতীয় পর্যায়ে অভিবাসন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশ প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। এখন চ্যান্সেলর হিসেবে সেই কঠোর নীতির অনেকটাই সরকারি নীতিতে পরিণত হয়েছে। এমনকি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত প্রাকৃতিকীকরণের মাধ্যমে জার্মান নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের বসবাসের অধিকার বাতিলের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।

এ ধরনের বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যীয় পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এক দশক আগে আলেপ্পো, দামেস্ক ও বাগদাদ থেকে পালিয়ে আসা পরিবারগুলো এখন দেখছে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অস্থিতিশীল জন্মভূমিতে ফেরত পাঠানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এমনকি তৃতীয় প্রজন্মের তুর্কি ও আরব বংশোদ্ভূত জার্মান নাগরিকদেরও মূলধারার রাজনৈতিক বিতর্কে নিজেদের জার্মান পরিচয় নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।

রাস্তায় বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষ

দীর্ঘদিন ধরে জার্মানির অভিবাসী জনগোষ্ঠী মধ্য-বামপন্থী দলগুলোর সমর্থক ছিল। ১৯৬১ সালের শ্রমিক নিয়োগ চুক্তির মাধ্যমে জার্মানিতে আসা তুর্কি শ্রমিকদের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে আসা আরব জনগোষ্ঠীও সাংবিধানিক সমতার নিশ্চয়তার জন্য এসপিডি ও গ্রিনসের ওপর আস্থা রেখেছিল।

তবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে সেই আস্থায় বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়। ওই সময় এসপিডির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস ঘোষণা করেন, জার্মানিকে বড় পরিসরে বহিষ্কার কার্যক্রম চালাতে হবে। এরপর থেকে মূলধারার রাজনীতিকদের বক্তব্যে অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য দায়ী করার প্রবণতা বেড়েছে। এক্ষেত্রে একীভূতকরণকে সমঅধিকারের নাগরিক চুক্তি হিসেবে না দেখে অনেক সময় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

এর প্রভাব পড়ছে মুসলিম তরুণদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের ওপরও। ফেডারেল সরকারের ‘ডেমোক্রেসি লেবেন’ কর্মসূচির অর্থায়ন পাওয়া কয়েকটি প্রকল্প জানিয়েছে, রক্ষণশীল ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেই তাদের চুক্তি বাতিল এবং কঠোর প্রশাসনিক নিরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

পশ্চিম জার্মানির বিভিন্ন শহরেও সরকারি নজরদারি বাড়ছে। কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে নিয়মিত পুলিশি পরিদর্শন হচ্ছে। জননিরাপত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে কোনো কোনো পৌর কর্তৃপক্ষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অনুমতিও দিচ্ছে না।

এই পরিস্থিতির মানবিক মূল্যও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত জুনে বার্লিনভিত্তিক নাগরিক সংগঠন ‘অ্যালায়েন্স অ্যাগেইনস্ট ইসলামোফোবিয়া অ্যান্ড অ্যান্টি-মুসলিম হেট’ জানায়, ২০২৫ সালে জার্মানিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ৪ হাজার ৯৬টি ঘটনার নথি হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা ৩৩ শতাংশ বেড়েছে।

নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে ২১৪টি ছিল শারীরিক হামলা এবং পাঁচটি ছিল মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনা। নর্থ রাইন-ভেস্টফালিয়া ও বার্লিনের বিভিন্ন মসজিদ কর্তৃপক্ষও হুমকিমূলক চিঠি ও ভাঙচুরের অভিযোগ জানিয়েছে। হিজাব পরা নারীরাও গণপরিবহনে নিয়মিত মৌখিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

জার্মানির মুসলিমদের কেন্দ্রীয় পরিষদের চেয়ারম্যান আবদাসসামাদ এল ইয়াজিদির মতে, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো যখন বর্জনমূলক বক্তব্য গ্রহণ করে, তখন লাখ লাখ নাগরিক নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির জার্মান হিসেবে অনুভব করতে শুরু করেন। তার ভাষায়, গণতান্ত্রিক দলগুলো যখন কট্টর ডানপন্থীদের যুক্তিকে বৈধতা দেয়, তখন সংখ্যালঘু নাগরিকদের কাছে এই বার্তাই যায় যে তাদের সাংবিধানিক অধিকার সবসময়ই শর্তসাপেক্ষ।

ইউরোপে ইসলাম ও আইনবিষয়ক এরলাঙ্গেন সেন্টারের ম্যাথিয়াস রোয়ে মনে করেন, একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখা জার্মানির মৌলিক আইনের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওই অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

আস্থা ফেরানোর পথ কোথায়

জার্মানির মূলধারার নেতাদের যুক্তি, সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও কড়াকড়ি আইন প্রয়োগ জরুরি। তাদের মতে, এতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন জনগণকে আশ্বস্ত করা, সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলা এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।

তবে কট্টর ডানপন্থীদের নীতি অনুকরণ করলেই যে তাদের মোকাবিলা করা যায়, তার প্রমাণ নেই। ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া ও নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, অভিবাসীবিরোধী বক্তব্য গ্রহণ করলে বরং কট্টর ডানপন্থীদের দাবিই বৈধতা পায়। ফলে ভোটাররা অনেক সময় সেই নীতির মূল দাবিদার দলকেই বেছে নেয়।

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে বিস্তৃত নাগরিক সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু লাখ লাখ নাগরিককে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেললে সাংবিধানিক ব্যবস্থা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সামাজিক জোটও দুর্বল হয়ে পড়ে। কোনো গণতন্ত্র যদি তার জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে স্থায়ী নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে সেই গণতন্ত্র নিজের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল করে ফেলে।

মুসলিমদের জন্য বামপন্থী রাজনীতিতেও খুব বেশি আশ্রয় নেই। ডি লিঙ্কে এখনও ক্ষমতার বাইরে, আর গ্রিনসও সাম্প্রতিক সরকারে থাকার সময় তাদের নাগরিক অধিকারকেন্দ্রিক অবস্থানের কিছু জায়গায় আপস করেছে। ফলে প্রান্তিক বিরোধী দলকে শুধু প্রতিরোধের ভোট দেওয়া জার্মানির ডানমুখী রাজনীতি ঠেকাতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এ অবস্থায় জার্মান মুসলিম তরুণদের সামনে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া অথবা নাগরিক জীবন থেকে ক্রমেই সরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সহায়তা হারানো কমিউনিটি সংগঠনগুলোও জনজীবন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে পারে।

তবে পরিস্থিতি বদলের সুযোগ এখনও রয়েছে। ‘ডেমোক্রেসি লেবেন’ কর্মসূচির আওতায় বাতিল হওয়া তরুণদের প্রকল্পগুলোর চুক্তি পুনর্বহাল, নির্বিচারে প্রশাসনিক সন্দেহের অবসান এবং জার্মানির মুসলিমদের কেন্দ্রীয় পরিষদকে সমঅধিকারভিত্তিক নাগরিক অংশীদার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত করার মতো পদক্ষেপ আস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।

ম্যাগডেবার্গে দাঁড়িয়ে উলরিশ জিগমুন্ডকে হয়তো কোনো সরকারে যোগ দিতে হবে না। কারণ মূলধারার রাজনীতিকে জার্মানির লাখ লাখ মুসলিম নাগরিক থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এএফডি ইতোমধ্যে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের ওপর বড় প্রভাব তৈরি করেছে।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

এআরবি

কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রের মতো মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব

একীভূত আয়ারল্যান্ড প্রশ্নে রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মোড়

আয়ারল্যান্ড নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বিক্ষোভের মুখে ট্রাম্প

যুদ্ধ ও গণহত্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না: ক্যাথরিন কনলি

কিয়ার স্টারমারের আসনে লেবার পার্টির প্রার্থী মুসলিম নারী

সুইজারল্যান্ডে ডাচ পর্যটকবাহী বাস দুর্ঘটনায় ৫ জনের মৃত্যু

এক দশকেই বিলুপ্ত হতে পারে মানবজাতি, ‘এআই গডফাদার’ হিন্টনের সতর্কবার্তা

এবারের মতো এত গরম আগে দেখেনি স্পেন, ভাঙল তাপমাত্রার সব রেকর্ড

আগস্ট ছিল সবচেয়ে উষ্ণতম মাস, রেকর্ড ভাঙা তাপে পুড়েছে পৃথিবী

ইরানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান আইএইএর