সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ১ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার একটি প্রস্তাব গণভোটে প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির ভোটাররা।
ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোটার এই প্রস্তাবের বিপক্ষে এবং ৪৫ শতাংশ পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এই গণভোটে মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
দেশটির ডানপন্থি দল 'সুইস পিপলস পার্টি' এই প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল, যারা দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসনবিরোধী প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। তবে এই বিভাজনমূলক ভোটটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের মুক্ত চলাচল চুক্তিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। ফলে দেশটির সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ এবং অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দল এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে।
ভোটে ‘না’ জয়ী হওয়াকে স্বাগত জানিয়ে সুইজারল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী বিট জানস বলেন, ‘এটি স্থায়িত্ব, উন্মুক্ততা এবং নির্ভরযোগ্যতার একটি লক্ষণ।’
২০০২ সালে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ছিল ৭৩ লাখ, যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৯১ লাখে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান জনসংখ্যার ২৭ শতাংশই সুইজারল্যান্ডের নাগরিক নন।
পিপলস পার্টির দাবি ছিল জনসংখ্যা সীমিত করলে পরিবহন, আবাসন ও পরিবেশের ওপর চাপ কমবে। তবে তাদের এই যুক্তি সাধারণ ভোটারদের মন গলাতে পারেনি। দলটির পরিবেশ ও জনসেবা রক্ষার দাবির আড়ালে মূলত অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর দোষ চাপানোর একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
ভোটারদের একটি বড় অংশ পর্যটন, হাসপাতাল ও কেয়ার হোমগুলোতে প্রয়োজনীয় শ্রমিকের সংকট তৈরি হওয়ার বিষয়ে শঙ্কিত ছিলেন। অন্যদিকে, সুইস ব্যবসায়িক নেতারা ভয় পাচ্ছিলেন যে এর ফলে ইউরোপের একক বাজারে সুইজারল্যান্ডের প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সুইজারল্যান্ডের উৎপাদিত পণ্যের অর্ধেকেরও বেশি ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বিক্রি হয়। কিন্তু এই বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে হলে ইউরোপের মানুষের মুক্ত চলাচলের প্রতি সুইজারল্যান্ডের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা বাধ্যতামূলক। এই প্রস্তাব পাস হলে সুইজারল্যান্ডকে সেই চুক্তি বাতিল করতে হতো।
ভোটের ফলাফলের পর ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লেইন একে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘সুইস জনগণ তাদের রায় দিয়েছেন। ইইউ এবং সুইজারল্যান্ড গভীর বন্ধন ও শক্তিশালী অংশীদারিত্বের অংশীদার।’
তবে এই সিদ্ধান্তের পরও উচ্চ বাড়িভাড়া, অতিরিক্ত উন্নয়ন, গণপরিবহনে ভিড় এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান খরচের মতো সমস্যাগুলো দূর হয়ে যাচ্ছে না। সুইস পিপলস পার্টির প্রেসিডেন্ট মার্সেল ডেটলিং বলেন, ‘জনগণ সমাধান চায়। এই ভোটের মাধ্যমে একটি সমস্যারও সমাধান হয়নি।’
সুইজারল্যান্ডের প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে সব বড় সিদ্ধান্ত ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে নেওয়া হয়। যেকোনো বিষয়ে দেশব্যাপী ভোট আয়োজনের জন্য প্রচারণাকারীদের মাত্র ১ লাখ স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়।
ভোটের ফলাফলে শহর ও গ্রামীণ এলাকার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান দেখা গেছে। কেবল সুইস নাগরিকরাই এই ভোটে অংশ নিতে পেরেছিলেন। তবে শহর এলাকায়, যেখানে অভিবাসীদের সংখ্যা বেশি, সেখানে প্রস্তাবটি বিপুল ব্যবধানে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। যেমন রাজধানী বার্নে প্রায় ৮৪ শতাংশ ভোটার এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। এছাড়া সেন্ট মরিটজ ও জার্মাট-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকাগুলোতেও ভোটাররা এই প্রস্তাবকে ‘না’ বলে দিয়েছেন।
সুইজারল্যান্ডের বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন 'ইকোনোমিসুইস'-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ রুডলফ মিনশ সতর্ক করেছিলেন যে, ইইউ সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং তাদের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক রাখা সুইজারল্যান্ডের স্বার্থেরই অনুকূল।
তাছাড়া নিয়োগকর্তারাও দক্ষ শ্রমিকের সংকটের বিষয়ে চিন্তিত ছিলেন। সুইজারল্যান্ডের হোটেলগুলোতে কর্মরত কর্মীদের অর্ধেকই অভিবাসী। হাসপাতাল ও কেয়ার হোমগুলোও তাদের ওপর নির্ভরশীল। বিপরীতে, বিরোধীরা পিপলস পার্টির যুক্তিকে অবাস্তব আখ্যা দিয়ে বলেছেন, সুইজারল্যান্ডের ২০ শতাংশ মানুষের বয়স এখন ৬৫ বছরের বেশি। এই বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যার চাহিদা ও তহবিলের জোগান দিতে তরুণ করদাতা ও শ্রমিকের প্রয়োজন, যা সুইজারল্যান্ড নিজে তৈরি করতে পারছে না।
সবশেষে, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলের সংসদ সদস্য জন পুল্ট জানান, এই প্রস্তাব পাস হলে এই অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক বিশ্বে সুইজারল্যান্ড পুরোপুরি একা হয়ে পড়বে, এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় ভয়।
সূত্র: বিবিসি
এএম