ইসরাইলি দখলকৃত পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করতে একযোগে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপের একাধিক দেশ। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার নেতৃত্বে নেওয়া এই উদ্যোগে আরও নয়টি দেশ সমর্থন জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের দূরত্ব আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা শুধু বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানি বন্ধের উদ্যোগই নেয়নি; বসতি স্থাপন কার্যক্রমে সহায়তা, অর্থায়ন বা মুনাফা করে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার কথা জানিয়েছে। ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেনও বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করার উদ্যোগে যোগ দিয়েছে।
দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে পশ্চিম তীরের কৌশলগত এলাকা ই১-এ নতুন ইসরাইলি বসতি নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও তারা উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
অর্থনৈতিক চাপের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, বসতি থেকে আসা পণ্য ইসরাইল ও যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক বাণিজ্যের তুলনায় খুব বড় অংশ নয়। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। তবে পশ্চিম তীরের পৃথক বসতিগুলোর অর্থনীতিতে খেজুর, ওয়াইন ও প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন পণ্যের আয় এবং ইসরাইলি সরকারি ভর্তুকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইলবিষয়ক সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল সি. কার্টজার বলেন, বসতিগুলোর পণ্য আলাদাভাবে চিহ্নিত করা বা সেগুলোর ওপর বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের আলোচনা বহুদিনের হলেও বাস্তবে খুব কম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তার মতে, এবার গৃহীত পদক্ষেপ বসতি আন্দোলন এবং বসতি সম্প্রসারণকে সমর্থনকারী যেকোনো ইসরাইলি সরকারের ওপর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে ব্যক্তি ও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। উদাহরণ হিসেবে তারা এমন কোনো ইসরাইলি ব্যাংকের কথা বলেছেন, যেটি পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণে ঋণ দেয়, আবার একই সঙ্গে ইসরাইলের অন্যান্য অঞ্চলে সাম্প্রতিক অবস্থান পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে মধ্য স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে।
ব্রিটেনের অবস্থানে বড় পরিবর্তন
ইসরাইলের প্রতি ব্রিটেনের সাম্প্রতিক অবস্থান পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করে চলেছে লন্ডন। কিন্তু গাজা যুদ্ধ ও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ অবস্থান তুলনামূলকভাবে কঠোর হয়েছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড পার্লামেন্টে নিজেকে ‘গর্বিত ব্রিটিশ ইহুদি’ এবং ইসরাইলের সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করলেও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ‘জাতিগত নির্মূল’ হচ্ছে এবং ইসরাইলি সরকার প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় ব্রিটেন নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। তার বক্তব্যে গাজা যুদ্ধের শুরুতে ব্রিটিশ সরকারের নীতিগত অবস্থানের সমালোচনারও প্রতিফলন দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রতি চোখ বন্ধ করে রেখেছে।
মিলিব্যান্ড আরো বলেন, ইসরাইলের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় ব্রিটেন নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। তার বক্তব্যে গাজা যুদ্ধের শুরুতে ব্রিটিশ সরকারের নীতিগত অবস্থানের সমালোচনারও প্রতিফলন দেখা যায়।
ইসরাইলের কঠোর পাল্টা পদক্ষেপ
ইউরোপীয় দেশগুলোর সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরাইল। ব্রিটেনের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট জেনারেল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে ইসরাইল। ১৮৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কনস্যুলেট জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজায় ব্রিটিশ স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।
এ ছাড়া কয়েকজন ব্রিটিশ এমপির ইসরাইলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনীশত্রুতাপূর্ণ’ আচরণের অভিযোগ এনে বলেন, এমন পদক্ষেপের জকে ব্রিটেনের দেওয়া প্রশিক্ষণও বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ থেকেও ব্রিটেনকে বাদ দিয়েছে ইসরাইল।
ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ইসরাইলের প্রতি ‘শত্রুতাপূর্ণ’ আচরণের অভিযোগ এনে বলেন, এমন পদক্ষেপের জবাব দেওয়া ছাড়া তাদের সামনে কোনো পথ ছিল না।
তবে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে একই ধরনের কূটনৈতিক পাল্টা ব্যবস্থা নেয়নি ইসরাইল। এর আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যকে আরো স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরয়ার উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ায় ইসরাইলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের দূরত্ব আরো স্পষ্ট
ইউরোপের এই সমন্বিত পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যকে আরো স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ব্রিটেনের পথ অনুসরণ করবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের মতো দেশের ক্ষেত্রে এমন অবস্থান খুব বেশি বিস্ময়কর নয়। তবে ঐতিহাসিকভাবে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ব্রিটেন একই পথে এগিয়ে যাওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
একই সঙ্গে নয়টি ইউরোপীয় দেশের সমর্থন পাওয়ায় ইসরাইলের পক্ষে প্রতিটি দেশের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এটি শুধু কয়েকটি দেশের বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নয়, বরং ইসরাইলি বসতি নীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর ইউরোপীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সামনে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
তবে সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই এর পুরো অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা যাবে না। নতুন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার জন্য জাতীয় আইন প্রণয়ন এবং ইউরোপীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় বিধি তৈরিতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে কোন পণ্য বা সেবা সরাসরি বসতি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত, তা শনাক্ত ও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করাও জটিল হবে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ড্যানিয়েল লেভির মতে, ব্রিটেন এবার এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি করছে যেখানে কেবল রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, বাস্তব নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজের প্রভাব ও নেতৃত্বের সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করছে। লেবার দলের হাউস অব লর্ডসের সদস্য জন মেন্ডেলসন মনে করেন, ইসরাইল ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ব্রিটিশ নীতি ক্রমেই কৌশলের পরিবর্তে ঘোষণানির্ভর হয়ে পড়ছে। এতে ইসরাইলের ওপর ব্রিটেনের প্রভাব কমে যেতেও পরীক্ষা করছে।
তবে ব্রিটিশ নীতির সমালোচনাও রয়েছে। লেবার দলের হাউস অব লর্ডসের সদস্য জন মেন্ডেলসন মনে করেন, ইসরাইল ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ব্রিটিশ নীতি ক্রমেই কৌশলের পরিবর্তে ঘোষণানির্ভর হয়ে পড়ছে। এতে ইসরাইলের ওপর ব্রিটেনের প্রভাব কমে যেতে পারে এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাও দুর্বল হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
সব মিলিয়ে, পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতিগুলোকে ঘিরে ইউরোপের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ কেবল বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ইউরোপের নীতিগত অবস্থানের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—যার ফলে ইসরাইল ও তার দীর্ঘদিনের পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব আরো বাড়তে পারে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
এআরবি