জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় সাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থি দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে। দলটি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে রাজ্য পার্লামেন্টে ৮৩টি আসনের মধ্যে ৩৯টি পেয়েছে। তবে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কোনো রাজ্যে উগ্র ডানপন্থি দলের সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় ফলাফলটি দেশটির রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এএফডির এই জয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সি উলরিশ জিগমুন্ড। ফল ঘোষণার পর তিনি বলেন, দলটি ‘ইতিহাস সৃষ্টি’ করেছে। তাঁর ভাষায়, এই নির্বাচন রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে জনগণের স্পষ্ট বার্তা। দলটির সহ-সভাপতি অ্যালিস ভাইডেলও ফলাফলকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করে সরকার পরিচালনার জন্য জনগণের কাছ থেকে শক্তিশালী ম্যান্ডেট পাওয়ার দাবি করেছেন।
এএফডির এই সাফল্যের বিপরীতে বড় ধাক্কা খেয়েছে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎসের নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল খ্রিস্টীয় গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন (সিডিইউ)। দলটি মাত্র ১৭ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে সিডিইউ পেয়েছিল ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ ভোট। ফলে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দলটির ভোটের ব্যাপক পতন জার্মানির কেন্দ্রীয় সরকারের জনপ্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সাক্সনি-আনহাল্টে ২০০২ সাল থেকে সিডিইউ নেতৃত্বাধীন সরকার ছিল। এবার এএফডির উত্থান সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যে বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। জার্মানির অর্থনৈতিক দুরবস্থা, অভিবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির প্রতি অসন্তোষ এএফডির ভোট বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি—প্রায় ৭৬ থেকে ৭৮ শতাংশ।
অভিবাসন ইস্যুতে এএফডি কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। দলটি অভিবাসীদের ব্যাপকভাবে বহিষ্কার, আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর কঠোর নীতি এবং শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে নীতিগত পরিবর্তনের পক্ষে। সাক্সনি-আনহাল্টের প্রচারে জিগমুন্ড অভিবাসন ও শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা বলেছেন। এএফডি একই সঙ্গে ইউক্রেনকে জার্মানির সামরিক সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এএফডি কীভাবে সরকার গঠন করবে। ৮৩ আসনের পার্লামেন্টে ৩৯টি আসন পাওয়ায় দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে কয়েকটি আসন দূরে রয়েছে। অন্য প্রধান দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে এএফডির সঙ্গে জোট করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। জার্মান রাজনীতিতে এই নীতিকে ‘ফায়ারওয়াল’ বলা হয়। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েও এএফডির জন্য সরকার গঠন সহজ হবে না।
তবে এবারের ফলাফল জার্মানির প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এএফডি এর আগে কোনো রাজ্য বা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সরকার পরিচালনার অংশ হয়নি। এখন প্রথমবারের মতো একটি রাজ্যে সরকার গঠনের কাছাকাছি পৌঁছেছে দলটি। অন্য দলগুলো জোটে না গেলেও এএফডির ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট প্রমাণ করছে যে পূর্ব জার্মানির একটি বড় অংশের ভোটার প্রচলিত দলগুলোর বাইরে রাজনৈতিক বিকল্প খুঁজছেন।
এ ফলাফল শুধু সাক্সনি-আনহাল্টের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। আগামী দিনে জার্মানির অন্যান্য পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যেও এএফডির প্রভাব বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে দলটির শক্তি ও সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে। ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়েও এএফডি জার্মানির সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হিসেবে উঠে এসেছে বলে বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে।
সাক্সনি-আনহাল্টের ফল তাই একদিকে জার্মানির পূর্বাঞ্চলে রাজনৈতিক মেরুকরণের গভীরতা প্রকাশ করছে, অন্যদিকে চ্যান্সেলর মেরৎসের সরকারের জন্যও বড় রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এএফডিকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে প্রচলিত দলগুলো কী ধরনের জোট গঠন করে এবং শেষ পর্যন্ত জার্মানির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ‘ফায়ারওয়াল’ কতটা কার্যকর থাকে।
সূত্র: রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান