গাজা থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য আয়ারল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া বহু ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর ভিসা প্রত্যাখ্যানের ঘটনায় দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। পূর্ণ বা আংশিক বৃত্তি পাওয়ার পরও ভিসা না পাওয়ায় নতুন শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এসব শিক্ষার্থী। অন্যদিকে গাজা থেকে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আয়ারল্যান্ডে পৌঁছানো তিন শিক্ষার্থীর শিল্পকর্ম সাম্প্রতিক একটি প্রদর্শনীতে বিশেষভাবে প্রশংসিত হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আয়ারল্যান্ডের আটলান্টিক টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির গলওয়ে ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত ‘ফ্রম ওয়ান ব্রেথ টু দ্য নেক্সট’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে এ বছর স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কাজ প্রদর্শিত হয়। সেখানে গাজা থেকে যুদ্ধের সময় উদ্ধার হয়ে আয়ারল্যান্ডে যাওয়া তিন ফিলিস্তিনি শিল্পীর কাজ দর্শকদের বিশেষভাবে নাড়া দেয়।
একই সময়ে গাজায় থাকা প্রায় ৪০ জন মেধাবী তরুণ-তরুণীর আয়ারল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তারা ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ এবং পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাদের অনেকের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে আরটিই জানিয়েছে, গাজা ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনে প্রত্যাখ্যানের হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ৫৯ জন ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী পূর্ণ বা আংশিক অর্থায়িত বৃত্তি পাওয়ার পর স্টাডি ভিসার আবেদন করেছিলেন; তাদের অন্তত ৩১ জনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল বলে আগস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়।
ভিসা প্রত্যাখ্যানের কারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদদের একাংশের অভিযোগ, যুদ্ধের কারণে গাজার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে যে স্বাভাবিক ব্যাঘাত ঘটেছে, সেটিকে সাধারণ ভিসা আবেদনের মানদণ্ড দিয়ে বিচার করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গাজায় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ধ্বংস, ব্যাংকিং ও ডাকব্যবস্থার বিপর্যয় এবং নথিপত্র সংগ্রহের জটিলতার কারণে এসব শিক্ষার্থীর পক্ষে স্বাভাবিক সময়ের মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করা কঠিন।
এ ঘটনায় আয়ারল্যান্ডে প্রতিবাদও হয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে ডাবলিনে দেশটির বিচার মন্ত্রণালয়ের সামনে প্রায় ২৫০ জন বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারীরা গাজার শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে তাদের পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।
সমালোচকদের মতে, যুদ্ধ ও ধ্বংসের কারণে যেসব শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে, তাদের কাছ থেকে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রমাণ বা ভবিষ্যতে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা চাওয়া বাস্তবতাবিবর্জিত। আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মীরাও সরকারের কাছে প্রত্যাখ্যাত আবেদনগুলো দ্রুত পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে গাজা থেকে আগে আয়ারল্যান্ডে পৌঁছানো শিক্ষার্থীদের সাফল্য বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা পেরিয়ে যেসব শিক্ষার্থী সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তাদের শিল্পকর্ম ও শিক্ষাগত অর্জন দেখিয়েছে—সুযোগ পেলে গাজার তরুণরা উচ্চশিক্ষা ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন। আর সেই বাস্তবতার বিপরীতে নতুন শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছেন আয়ারল্যান্ডের শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী ও মানবাধিকারকর্মীরা।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, ওপেন লেটার ও পিপল বিফোর প্রফিট